
পলাতক শক্তির কোনো অপতৎপরতা মেনে নেয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রিমু সিদ্দিক, ঢাকা
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৩
বিবাহবিচ্ছেদ। ছবি: সংগৃহীত
বিবাহবিচ্ছেদের পর বছরের পর বছর গড়ায়, কিন্তু অনেক নারীর কাছেই অধরা থেকে যায় কাবিননামায় নির্ধারিত দেনমোহরের অর্থ। অধিকার আদায়ের আশায় মাসের পর মাস আদালতের বারান্দায় ঘুরতে গিয়ে মানসিক ও আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন ভুক্তভোগীরা। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, ডিক্রি কার্যকরে প্রশাসনিক অসহযোগিতা এবং আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে একটি মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগছে ৬ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত।
দুই সন্তানকে নিয়ে গত ছয় বছর ধরে আদালতে ঘুরছেন নাজনীন ও হালিমা। বিচ্ছেদ হলেও দেনমোহরের টাকা পাওয়ার অপেক্ষা শেষ হয়নি তাদের। সময় সংবাদকে নাজনীন বলেন, ‘ছয় বছর ধরে এটার জন্য ঘুরছি। আমার দেনমোহর দিয়ে দিক, এটাই আমার প্রাপ্য। কিন্তু উনি কিছুই করছেন না, শুধু প্রতি মাসে মামলার তারিখ পিছিয়ে দিচ্ছেন।’
আরেক ভুক্তভোগী হালিমা জানান, সন্তানদের নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তায় আছেন এবং প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ না রেখে দ্রুত নিজের প্রাপ্য বুঝে পেতে চান।
শুধু মামলা নিষ্পত্তিই নয়, আদালতের দেয়া আদেশ কার্যকর করা নিয়েও তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন। ২০১৯ সালে বিবাহবিচ্ছেদের পর ২০২৩ সালে মাহফুজা সুলতানা নামে এক নারীর পক্ষে ডিক্রি দেন আদালত। এরপর প্রাক্তনের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হলেও ক্ষমতাধর হওয়ায় তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। ফলে আজ পর্যন্ত রায় কার্যকর হয়নি। দেনমোহরের অর্থ আদায়ে নির্দিষ্ট আইনি সময়সীমা না থাকায় বিচার পাওয়ার পরও অনিশ্চয়তায় থাকতে হয় ভুক্তভোগীদের।
মামলার এমন দীর্ঘসূত্রতার পেছনে পারিবারিক আদালতে দেওয়ানি মামলার চাপ, কাঠামোগত দুর্বলতা ও আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহারকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মাহমুদুল আলম শাহীন জানান, ঢাকার ১৪টি পারিবারিক আদালতে অন্যান্য দেওয়ানি মামলা পরিচালনা করার কারণে জট তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়া মনে করেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখতে হয় বলেই সময় লাগে।
আইনজীবীদের সদিচ্ছার অভাব, ডিক্রি পাওয়ার পর পুলিশের অসহযোগিতা এবং বিবাদীপক্ষের বারবার স্থগিতাদেশ নেয়ার প্রবণতাও এ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সম্প্রতি সংসদে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, দেশে বর্তমানে পারিবারিক আদালতে ৭৪ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
তবে এ পরিস্থিতির অবসরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও আদেশ দিয়েছেন। বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চের চূড়ান্ত রায়ে বলা হয়, স্ত্রীর দাবি করা মাত্রই স্ত্রীকে দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করতে হবে।
৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে উল্লেখ করা হয়, আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্বামী যদি দেনমোহর পরিশোধে গড়িমসি করে এবং স্ত্রীকে আদালতে যেতে বাধ্য করে, তবে বিচারিক আদালত মূল দেনমোহরের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দিতে পারবে। একই সঙ্গে, কোনো অবস্থাতেই দেনমোহরের অংশ কমানো, হ্রাস বা মওকুফ করার কোনো আইনি এখতিয়ার আদালতের নেই বলেও স্পষ্ট করা হয়।
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু নতুন আইন বা রায় নয়, সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বিদ্যমান আইনের কঠোর বাস্তবায়ন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত হাসান বলেন, ‘দেনমোহরের বিষয়টি স্বীকৃত থাকলে আপিল আদালত ওই অংশের ওপর স্থগিতাদেশ না দিয়ে দ্রুত অর্থ আদায়ের পথ সুগম করতে পারেন।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘অনেক জেন্ডার-সংবেদনশীল আইন হয়েছে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। সেখানে নজর দেয়া জরুরি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামর্থ্য অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারণ, প্রয়োজনে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখা এবং সামাজিকভাবে মূল্যবোধের পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সংকট দূর করা সম্ভব।