
বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রকল্প দেখলেন প্রধানমন্ত্রী, বাস্তবায়নে সহায়তার আশ্বাস
প্রতিবেদক, কুমিল্লা
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪

জান্নাতুল তাজমীন। ছবি: সংগৃহীত
মাঝরাতে বাড়ি ফেরার জন্য অটোরিকশায় উঠেছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমীন (১৪)। চলন্ত পথে চালকের ক্ষুধা লেগেছে জেনে নিজের কাছে থাকা ১০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছিল সে–কিনে দিয়েছিল রুটি ও কলা। তবে সেই সরল বিশ্বাস ও মানবিকতার প্রতিদান তাজমীন পেল এক ভয়াবহ পৈশাচিকতায়। ‘শর্টকাট’ রাস্তায় দ্রুত বাড়ি পৌঁছে দেয়ার কথা বলে নির্জন জায়গায় নিয়ে তাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে ও মাথায় পা চেপে ধরে হত্যা করা হয়।
কুমিল্লার লালমাইয়ে সংঘটিত এই চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করে আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে অভিযুক্ত চালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাসাবাদে সুমন নিজের অপরাধ স্বীকার করে নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, গত ৮ অক্টোবর লালমাই উপজেলার জগতপুর চরপাড়া গ্রামের একটি ধানক্ষেতের পাশ থেকে ওই কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দায়েরের পর পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে চট্টগ্রাম থেকে চালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। নিহত তাজমীন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার গ্রামের বাড়ি যশোর জেলায় হলেও বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি জানান, ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে রেসকোর্সের বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমীন। চালক সুমন মিয়া ৫০০ টাকা ভাড়া চাইলে ৩০০ টাকায় যাওয়ার চুক্তি হয়। যাত্রাপথে একটি দোকান থেকে ১০০ টাকা দিয়ে চালককে রুটি ও কলা কিনে আনতে দেয় ওই কিশোরী। এরপর তারা গন্তব্যের দিকে রওনা হয়।
কিছুদূর যাওয়ার পর শর্টকাটে বাসায় পৌঁছে দেয়ার কথা বলে নূরজাহান হোটেলের সামনে দিয়ে ইউটার্ন নিয়ে চাঁদপুর রোডের দিকে চলে যায় চালক সুমন। পরে বিজরা বাজার হয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে হঠাৎ অটোরিকশার ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয় সে। এতে তাজমীন ভয় পেয়ে যায়। জায়গাটি চিনতে না পেরে সে চালককে প্রশ্ন করলে সে জানায়, এটি রেসকোর্স নয়। বিপদ বুঝতে পেরে তাজমীন অটোরিকশা থেকে নেমে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
এ সময় চালক সুমন অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে আটকাতে গেলে তাজমীন চিৎকার শুরু করে। তখন সুমন গামছা দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরে। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয় এবং তাজমীন দুর্বল হয়ে পড়ে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সুমন স্বীকার করেছে, এ সময় সে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করে। পরে তাকে ধানক্ষেতে নিয়ে উপুড় করে মাথায় পা দিয়ে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
হত্যার পর তাজমীনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন ছিনিয়ে নেয় সুমন এবং ব্যাগটি ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। পরে অটোরিকশাটি ঘটনাস্থলেই ফেলে রেখে কাঁচিকাটা মসজিদের সামনের পুকুরে গোসল করে সে। এরপর অন্য একটি ভাড়ায়চালিত অটোরিকশা করে বাখরাবাদ এলাকায় চলে যায়। সেখানে একটি পুকুর পাড়ের জঙ্গলে আইফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যায় সুমন। গ্রেফতারের পর সুমনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাখরাবাদ এলাকার সেই জঙ্গল থেকে তাজমীনের ব্যবহৃত আইফোন ও ধানক্ষেত থেকে ভ্যানিটি ব্যাগটি উদ্ধার করেছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তাজমীন তার বাবাকে নিজের ‘লাইভ লোকেশন’ শেয়ার করেছিল। তবে তার বাবা সেটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পাননি। ভোরের দিকে লোকেশনটি দেখে তিনি ওই এলাকায় খুঁজতে যান। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরের একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাজমীনকে অটোরিকশায় একেবারে শান্ত অবস্থায় বসে থাকতে দেখা গেছে এবং সেখানে এখন পর্যন্ত কেবল চালক সুমনেরই সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান, তাজমীন গত ৪ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ থাকলেও তার পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো জিডি বা অভিযোগ করা হয়নি। চার দিন সে কোথায় বা কার সঙ্গে ছিল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আসামি সুমনের স্বীকারোক্তি থাকলেও ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে এবং উদ্ধার হওয়া আইফোনটির বিষয়ে তথ্য যাচাই করা হবে।