
নেহা বোরা: বিজেপি সমর্থক পরিবারের মেয়ের আন্দোলনের ‘অন্যতম মুখ’ হয়ে ওঠার গল্প
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৬

উত্তর ইয়েমেনের হাজ্জাহ প্রদেশে অপুষ্টিতে ভোগা হাসান রাজেম। ছবি: সংগৃহীত
‘আমার মেয়ে মারা যাচ্ছে, ওকে বাঁচান’– বছরের পর বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘুরেও যখন কোনো সুরাহা হয়নি, তখন শেষমেশ এই আকুতিই জানিয়েছিলেন তাহানির বাবা; যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল নিজের আট বছর বয়সি মেয়েটিকে বাঁচানো। জাতিসংঘ বলছে, ইয়েমেনে পাঁচ বছরের কম বয়সি ২২ লাখেরও বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে; এদের মধ্যে চরম অপুষ্টির শিকার পাঁচ লাখেরও বেশি শিশু।
প্রায় ১২ বছর আগে শুরু হওয়া যুদ্ধের ফলে ২ কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার মুখে পড়েছে এবং তীব্র খাদ্যসংকটের সম্মুখীন হয়েছে ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ। অথচ, এ বছর তাদের সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় ২২০ কোটি ডলারের মধ্যে দেশটি পেয়েছে মাত্র এক-পঞ্চমাংশ।
তাহানির ঘটনাটি আল-জাজিরা অ্যারাবিককে একই ধরনের দুর্দশার শিকার অন্যান্য শিশুদের কাহিনী অনুসন্ধানে এবং এই প্রশ্নটি তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে: ইয়েমেনে পাঠানো শত শত কোটি ডলারের সহায়তা আসলে কোথায় যায় এবং কেন তা শিশুদের চরম ক্ষুধা ও অপুষ্টির শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে না?
আল জাজিরা ইয়েমেনের কোথায় অপুষ্টির প্রকোপ তীব্র এবং কীভাবে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করা হয়, তা তুলে ধরেছে; পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা কেন বলছেন যে এই সহায়তা সমস্যার মূল কারণের পরিবর্তে কেবল উপসর্গগুলোরই চিকিৎসা করছে, তাও প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি বাড়ছে
উত্তর খোঁজার তাগিদে বাস্তুচ্যুতদের ক্যাম্প, পুষ্টি কেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে গিয়েছে আল জাজিরা।
জিয়াদ মোহাম্মদ জালাল, যার বয়স এখনো দুই বছর পূর্ণ হয়নি, তার পরিবার হাজ্জাহ গভর্নরেটের আবস জেলার আল-খাদিশ ক্যাম্পে বসবাস করে। যুদ্ধের কারণে তারা হারাদ জেলা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জিয়াদ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। তার ওজন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে গেছে এবং তার নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন; তাই হাসপাতালই এখন তাদের পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশে পরিণত হয়েছে।
জিয়াদের মতো শিশুরা পুষ্টি কেন্দ্রে পৌঁছায় কেবল তখনই, যখন বাস্তুচ্যুতি ও দারিদ্র্য তাদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আল-জাজিরার মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন বছরে ‘আব্স’ এলাকায় অপুষ্টির ২০০টিরও বেশি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ‘ধালে’ গভর্নরেটে অবস্থিত আল-নাসর হাসপাতালে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা ২৬৯ শিশুকে চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছিল।
ইয়েমেনের জনস্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ‘তীব্র’ অপুষ্টির ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং আল জাজিরা অ্যারাবিকের বিশ্লেষণ করা তথ্য অনুযায়ী, তাইজে শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির ১১,৯৮২টি ঘটনা পাওয়া গেছে; এরপরই রয়েছে এডেন (৭,৩৩৯) ও ধালে (৬,৭১০)।
স্থানীয় এই পরিসংখ্যানগুলো এককভাবে অপুষ্টির ব্যাপকতার কোনো জাতীয় পরিমাপক হিসেবে কাজ করে না; তবে মাঠপর্যায়ের কাজের ক্ষেত্রে এগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরে। আর তা হলো, অপুষ্টির ঘটনাগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয় এবং পুষ্টিসেবা-সংক্রান্ত চাপ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। তাইজে মাঝারি মাত্রার অপুষ্টির ২৪,৫২৯টি ঘটনা ছিল; এরপরই ছিল আবিয়ান (১৫,৩৬৬) ও লাহজ (১১,৮৯৩)।
লক্ষণগুলোর চিকিৎসা, কিন্তু একই পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া
ইয়েমেনের ক্লিনিকগুলোতে রোগের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাগত মূল্যায়নের প্রয়োজন হয় এবং যাদের শারীরিক জটিলতা রয়েছে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হতে পারে।
স্থিতিশীল রোগীদের ক্ষেত্রে অনুমোদিত চিকিৎসা প্রোটোকল অনুযায়ী বহির্বিভাগে চিকিৎসা ও পরবর্তী পর্যবেক্ষণ করা হয়। মাঝারি মাত্রার রোগীদের ক্লিনিকে পর্যবেক্ষণ করা হয়; সেখানে তারা বিশেষ চিকিৎসামূলক খাবার বা পুষ্টির পরিপূরক গ্রহণ করেন এবং নিয়মিতভাবে তাদের ওজন ও শারীরিক বৃদ্ধি পরীক্ষা করা হয়।
মারিবের আল-সুমাইয়া ক্যাম্পে ডা. মুজিবা আল-মানসুরি একটি সরকারি পুষ্টি ক্লিনিক পরিচালনা করেন। আল-জাজিরাকে তিনি জানান, গত এক বছরে এই ক্লিনিকে তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা ৩৩ শিশু, মাঝারি মাত্রার অপুষ্টিতে ভোগা ৮৫ শিশু এবং ৮৪ জন মায়ের চিকিৎসা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতির কারণে খাদ্যাভাব বা অপুষ্টি, অসুস্থতা, সামাজিক পরিস্থিতি এবং খাওয়ানো-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে। মাঝারি মাত্রার ক্ষেত্রে চিকিৎসার জন্য সহায়তা দেয় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি); অন্যদিকে গুরুতর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হয় ইউনিসেফ ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে।
আল-জাজিরার সাথে কথা বলার সময় আল-মানসুরির ক্লিনিকে সময়মতো চিকিৎসার সুবাদে অপুষ্টিজনিত কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তার ক্লিনিকে, মায়েরা বিশেষ পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর পদ্ধতি শেখার পর গুরুতর অপুষ্টিতে ভোগা চারটি শিশু তাদের স্বাভাবিক ক্ষুধা ও ওজন ফিরে পায়। তবে ক্লিনিক থেকে সুস্থ হয়ে ফেরা শিশুটি প্রায়শই আবার সেই একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। একই ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন মায়েরাও।
ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও সংকুচিত সাড়া
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ মানুষের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত পরিষেবার প্রয়োজন এবং মাত্র ৫৯.৩ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র পুরোপুরি সচল রয়েছে।
বরাদ্দকৃত অর্থ কখনোই ঘোষিত চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ‘মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা’ (Humanitarian Response Plan)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রয়োজনীয় ৪.২৭ বিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ২.২৭ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৪ সালে প্রয়োজনীয় ২.৭১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৫১ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় প্রায় ২.১৬ বিলিয়ন ডলারের চাহিদা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২০.৬ শতাংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল অপুষ্টির বিষয় নয়, বরং সব খাতকেই অন্তর্ভুক্ত করে।
পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নের অভাব এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে যখন ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএফএস) তাদের সহায়তাপ্রাপ্ত কেন্দ্রগুলোতে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে রোগীর সংখ্যায় ব্যাপক বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, তহবিলের ঘাটতির কারণে কর্মসূচিগুলোতে রোগ প্রতিরোধের চেয়ে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে এবং সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রয়েছে এমন এলাকার শিশুদের কাছে সেবা পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থতার ঘটনা বেড়েছে। ডব্লিউএফপি’র তহবিল কমে যাওয়ায় এই কর্মসূচির আওতা প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে; ১২২টি জেলা থেকে কমে তা ৬২টিতে নেমে এসেছে। তাই নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। এছাড়া বাজেট বরাদ্দ, থেরাপিউটিক খাবার এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার ঘাটতি রয়েছে বলেও মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
প্রচুর অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও কাটেনি অপুষ্টির সমস্যা
তদন্তের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে আল জাজিরা তাহানির বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে। তারা যখন তার বাবার সাথে পুনরায় যোগাযোগ করে, তখন জানতে পারে যে তাহানি মারা গেছে। তার বাবার ভাষ্যমতে, অনাহারেই মৃত্যু হয়েছিল তাহানির।
তাহানি যখন চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন মানবিক সহায়তা প্রকল্পগুলোর জন্য বিপুল অর্থও বরাদ্দ করা হচ্ছিল। তদন্তে প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, হাজ্জাহ-তে পরিচালিত নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের একটি প্রকল্পের বাজেট ছিল প্রায় ১১ লাখ ডলার; এর মধ্যে প্রকল্পটির লক্ষ্য-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ ৫৩ হাজার ডলার।
একজন সুবিধাভোগী জানান, তিনি মাত্র একবার নগদ সহায়তা পেয়েছেন। ‘রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল’-এর সাথে ডব্লিউএফপি-র প্রায় ৪.৮৬ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পে বেতন ও ভাতার জন্য ২০ লাখ ডলারেরও বেশি এবং গুদামজাতকরণের জন্য প্রায় ১.৮৪ মিলিয়ন ডলার অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মানবিক সহায়তা ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুসা আলায়া যুক্তি দেন যে, প্রশ্নটি কেবল ইয়েমেনে কতটা অর্থ প্রবেশ করেছে তা নয়, বরং সেই অর্থ কী পরিবর্তন এনেছে। তার মতে, সহায়তা কার্যক্রম বিভিন্ন স্বার্থ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের এক জটিল কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। এটি জীবন বাঁচাতে পারে ঠিকই, কিন্তু বেতন, কর্মসংস্থান বা জনসেবা পুনরুদ্ধার কিংবা যুদ্ধ-অর্থনীতির অবসান ঘটাতে পারে না।
সূত্র: আল জাজিরা