
বাইডেন থেকে ট্রাম্প, ইলন মাস্কের স্টারলিংক দিয়ে চলছে মার্কিন কূটনীতি
আবদুল আজিজ জুয়েল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:২৪

ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই একের পর এক নাটকীয় সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান এই নেতার দ্বিতীয় মেয়াদের অর্ধেক সময় পার হতে চলেছে, আর সামনেই কড়া নাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
একদিকে মস্কোর ওপর কয়েক ধাপ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগসূত্রের পথ সুগম করা হচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা যুদ্ধ থামাতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর দেয়া হচ্ছে নজিরবিহীন চাপ। ট্রাম্পের এই পররাষ্ট্রনীতি বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অথচ একসময় এই যুদ্ধ বজায় রাখতে এবং রুশ আগ্রাসন ঠেকিয়ে রাখতে ইউক্রেনকে শত শত কোটি ডলারের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর পর্যবেক্ষণ বলছে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত নয়। মার্কিন অর্থনীতি সামলানো, দেশের তেলের বাজার দর নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চীন রাশিয়া যৌথ অক্ষ ভাঙার এক সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ এটি।
ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ এবং নজিরবিহীন এক যুদ্ধবিরতির শর্ত মেনে নিতে কিয়েভ ও প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর প্রতিনিয়ত কূটনৈতিক ও নীতিগত চাপ বাড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। জো বাইডেনের আমলে প্রাপ্ত শত শত কোটি ডলারের ভূরাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তার ওপর ভর করে ইউক্রেন এতদিন রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ বজায় রাখলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাইভিং সিটে বসার পর থেকেই সেই সহায়তার পাইপলাইনে বড় ধরনের টান পড়েছে।
ইউক্রেনকে আলোচনায় বসাতে ওয়াশিংটন কেবল মুখের কথায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সামরিক ও প্রযুক্তিগত সাহায্যেও রাশ টেনে ধরেছে। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান স্থগিত করা, সামরিক সহায়তা তহবিল আটকে দেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা ‘স্টারশিল্ড’-এর ব্যবহারে সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপের মতো চরম পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে কিয়েভকে সরাসরি বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলন ও সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, মার্কিন করদাতাদের কষ্টার্জিত শত শত কোটি ডলার কোনো অনির্দিষ্ট বা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ঢালতে তিনি রাজি নন। কিয়েভকে বাস্তবতার নিরিখে চিন্তা করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেছেন, কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও মস্কোর সাথে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।
তবে ট্রাম্পের এই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে চরম উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ইউক্রেন ও তার ন্যাটো মিত্ররা। ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে কোনো চুক্তির বিপক্ষে অবস্থান নিলেও ওয়াশিংটনের অভূতপূর্ব চাপ ইউক্রেনকে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধের খরচ কমিয়ে আনা, মার্কিন বাজারে মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়া এবং এশিয়ায় চীনের আধিপত্য রুখতে কৌশলগত মনোযোগ দেওয়াই এখন ট্রাম্পের বিশ্ব রাজনীতির মূল দাবার চাল।
ইউক্রেনকে যুদ্ধ থামানোর চাপ দেওয়ার পাশাপাশি রাশিয়ার প্রতি নমনীয়তা দেখাচ্ছে ওয়াশিংটন। ইউক্রেনের আপত্তির মুখেও রাশিয়ার তৈরি ডিজেল ও তেলের ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে বাণিজ্যিক যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি টেকসই শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা। আলোচনার একপর্যায়ে উইটকফ পুতিনকে একজন ‘মানবতাবাদী’ হিসেবে প্রশংসা করায় তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে মার্কিন আইনপ্রণেতা এবং যুক্তরাজ্যের মতো মিত্র দেশগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
ওই বৈঠকে সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে সংঘাতের একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে পুতিন আগামী মাসের ১০ তারিখের পর ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছেন। এছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের সহায়তা করতে সার সরবরাহ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ নিরসনে তেহরানের সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগানোর প্রস্তাবও দেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে রাশিয়ার জ্বালানি ও আর্থিক খাতের কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার পর বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দাম যখন অস্থির হয়ে উঠছিল, তখন মার্কিন অর্থ দফতর রাশিয়ার তেল ও ডিজেল সংক্রান্ত বিধিনিষেধ সাময়িকভাবে কিছুটা হালকা করে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ট্রাম্প প্রশাসনের সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের গোলমালের কারণে পুরো বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ এমনিতেই ঝুঁকির মুখে। এই মুহূর্তে রাশিয়ার তেলের ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলে বাজারে অপরিশোধিত তেল ও ডিজেলের তীব্র সংকট তৈরি হতো, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিত।
তাছাড়া ভারতসহ মার্কিন মিত্র দেশগুলোর পক্ষে রাতারাতি রাশিয়ার তেল নেওয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। রাশিয়াকে একতরফাভাবে কোণঠাসা করলে মিত্র দেশগুলোর অর্থনীতি বিপদে পড়ত, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও এসে লাগত।
এই কূটনৈতিক চালের পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির জন্য কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাটা মেয়াদের শেষ দুই বছর টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার দরুন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টিকে নির্বাচনে বড় ধরনের মাশুল গুনতে হতে পারে। আমেরিকার সাধারণ ভোটারদের কাছে ইউক্রেন যুদ্ধের জটিল ভূরাজনীতির চেয়ে নিজ দেশের গ্যাসের দাম, বাজার দর এবং জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই মার্কিন বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বিশ্ববাজারে ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার স্বার্থেই মস্কোর জ্বালানি খাতের কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে তার সাথে সাথে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এক লাফ মারবে, যার মাশুল ট্রাম্প ও তার দলকে গুণতে হবে নির্বাচনের ব্যালট বাক্সে। তাই ইউক্রেনের অসন্তোষ কিংবা আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনা উপেক্ষা করেই ট্রাম্প জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেনের পথ কিছুটা খোলা রাখছেন।
একইসঙ্গে মস্কোকে একেবারে আলোচনার বাইরে ঠেলে না দিয়ে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখা ওয়াশিংটনের কৌশল। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফসহ মার্কিন কূটনীতিকরা মস্কোর সাথে বার্তা আদান প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। উদ্দেশ্য পরিষ্কার রাশিয়াকে কিছুটা সুযোগ দিয়ে আলোচনার টেবিলে রাখা, যেন ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানো যায়।
চীন রাশিয়া জোট ভাঙার চেষ্টা
ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ও সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক লক্ষ্য হলো বেইজিং ও মস্কোর মধ্যকার শক্তিশালী সম্পর্ককে দুর্বল করে দেওয়া। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা বিশ্বের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার নীতির কারণে বাধ্য হয়েই রাশিয়া তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং জ্বালানি রফতানির জন্য চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, সামরিক কৌশলবিদ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে, চীন ও রাশিয়ার এই গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক ঐক্য বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব এবং পশ্চিমা নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
আন্তর্জাতিক নীতি বিষয়ক সাময়িকী ফরেন পলিসি এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ১৯৭০-এর দশকের মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের ঐতিহাসিক 'ত্রিকোণ কূটনীতি'র ঠিক বিপরীত কৌশল ‘রিভার্স নিক্সন ডিপ্লোম্যাসি’ বা বিপরীতমুখী কূটনীতি প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন।
১৯৭১-৭২ সালে শীতল যুদ্ধের তুঙ্গমুহূর্তে নিক্সন চীনের দিকে হাত বাড়িয়ে কমিউনিস্ট ব্লকে ফাটল ধরিয়েছিলেন এবং তৎকালীন শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়নকে কৌশলগতভাবে কোণঠাসা করেছিলেন। ট্রাম্প এখন সেই সমীকরণকে উল্টে দিয়ে রাশিয়ার ওপর থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা শিথিল করছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে, রাশিয়ার অর্থনৈতিক অস্তিত্বের জন্য একমাত্র পথ বেইজিং নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করলে ওয়াশিংটন ও ইউরোপের সাথেও কৌশলগত ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব।
ইউক্রেনে দ্রুত যুদ্ধবিরতির তাগিদ এবং রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর থেকে কড়াকড়ি সাময়িকভাবে শিথিল করার পেছনে এই চীন-বিরোধী কৌশলই বড় ভূমিকা রাখছে। ওয়াশিংটন উপলব্ধি করেছে যে, রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি পিষে ফেললে মস্কো আরও বেশি বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তাই রাশিয়ার তেল ও ডিজেল বাণিজ্যের পথ উন্মুক্ত রেখে এবং সীমিত পর্যায়ে মার্কিন-রুশ কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখে ট্রাম্প প্রশাসন মস্কোকে একটি অর্থনৈতিক বিকল্প দিতে চাইছে। মস্কোকে চীন থেকে কিছুটা হলেও দূরে সরাতে পারলে রাশিয়ার সস্তা জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চীনের একক কর্তৃত্ব খর্ব করা সহজ হবে।
তবে এই ‘রিভার্স নিক্সন ডিপ্লোম্যাসি’ কৌশল বাস্তবায়ন করা ট্রাম্পের জন্য মোটেও সহজ নয়। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭০-এর দশকের চীন-সোভিয়েত বিরোধের মতো তীব্র শত্রুতামূলক ফাটল বর্তমান রাশিয়া ও চীনের মধ্যে নেই। গত কয়েক বছরে পুতিন ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার ব্যক্তিগত ও কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়েছে।
তাছাড়া মার্কিন কংগ্রেসের ভেতর রাশিয়া-বিরোধী কঠোর মনোভাব এবং ন্যাটো মিত্রদের অসন্তোষ ট্রাম্পের এই নমনীয় নীতির সামনে বড় বাধা। রাশিয়াও ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিকে কতটা বিশ্বাস করবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর সংশয় রয়েছে। তবে কৌশলটি কতটা সফল হবে তা সময়ই বলবে, কিন্তু চীন-রাশিয়া অক্ষ দুর্বল করার এই কূটনৈতিক দাবার চাল বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে নতুন এক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প কোনো বাহ্যিক বা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না; বরং এটি তার নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ঘরোয়া রাজনীতির চাহিদারই প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। তার মেয়াদের বাকি দুই বছরে মূল লক্ষ্য হলো প্রথাগত বৈশ্বিক সংঘাত থেকে আমেরিকাকে গুটিয়ে আনা। ইউরোপের দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই নিতে বাধ্য করা এবং মার্কিন সমস্ত সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ মূলত এশিয়ায় চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব মোকাবিলার দিকে পুনর্নির্দেশ করাই ওয়াশিংটনের নতুন কৌশল।
আমেরিকান সাধারণ ভোটারদের কাছে ইউরোপের সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের চেয় নিজ দেশের গ্যাসের দাম, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্প ও তার রণকৌশলবিদরা খুব ভালো করেই জানেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধে শত শত কোটি ডলারের ঢাল অব্যাহত রাখলে এবং রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যে কড়াকড়ি বহাল রাখলে বিশ্ববাজারে তেলের তীব্র সংকট দেখা দেবে। আর তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে, যা মূল্যস্ফীতিকে অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে।
আসন্ন তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা শক্ত করার স্বার্থেই দেশের বাজারে স্বস্তি ফেরানোকে ট্রাম্প প্রশাসন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাই ইউক্রেনকে যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক চাপ দেওয়া, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যের পথ সাময়িক খোলা রাখা কিংবা অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের হিসাব, সবই মূলত একই সুতোয় বাঁধা। অহেতুক সামরিক খরচ কমিয়ে আনা, দেশের বাজারে অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতা এনে নির্বাচনে জয়লাভ করা এবং দীর্ঘমেয়াদে চীন-রাশিয়া অক্ষকে দুর্বল করাই এই মুহূর্তে ট্রাম্পের প্রধান উদ্দেশ্য।
তবে এই হিসাব-নিকাশের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ফল কী হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চালের ওপর ভর করে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব এবং সমগ্র ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেবে, কিংবা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন কী পরিবর্তন আসবে তা সময়ই বলে দেবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিএনএন ও রয়টার্স