
বিশ্ববাজারে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম
আব্দুল্লাহ আল মামুন রুবেল
প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫৮

জমিতে সার দিচ্ছেন কৃষক। ছবি: সময় সংবাদ
মাঠজুড়ে সবুজ ফসল। কোথাও চারা রোপণ, কোথাও পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। ভালো ফলনের আশায় মাঠে শ্রম দিচ্ছেন তারা। কিন্তু এই সবুজের আড়ালেই জমছে দুশ্চিন্তা; ফসল ঘরে তুলে উৎপাদনের খরচ উঠবে তো? সার, বীজ ও কীটনাশকের বাড়তি দামের সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি এবং সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় খুলনার কৃষকদের জন্য সেই হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না ফসলের বিক্রয়মূল্য। প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া নিয়েও রয়েছে সংকট। ফলে ভালো ফলন হলেও মৌসুম শেষে প্রত্যাশিত লাভের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না তারা।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষক শেখ আশরাফ আলী বলেন, ‘জমি চাষ থেকে শুরু করে বীজ, সার ও কীটনাশক; সবকিছুতেই আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগছে। এত খরচ করে ফসল ফলানোর পর ভালো দাম না পেলে হাতে আর কিছুই থাকে না।’
জমি প্রস্তুত থেকে বীজ বোনা, চারা রোপণ কিংবা সার-কীটনাশক প্রয়োগ-প্রতিটি ধাপেই এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষককে। এর সঙ্গে প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ার অভিযোগ তাদের উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। সময়মতো পরিচর্যা করতে না পারলে ফলন নিয়ে শঙ্কা থাকে। আবার বাড়তি খরচ করে পরিচর্যা করলেও ফসল বিক্রির সময় সেই টাকা উঠে আসবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
একই উপজেলার আরেক কৃষক গৌতম মন্ডল বলেন, ‘গত বছরও দিনমজুর হিসেবে একজন শ্রমিককে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দিলেই হতো, এখন ৮০০ টাকা প্রয়োজন হয়। চারদিন ধরে সার কিনতে গেলে ডিলারের কাছে সার পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে লাভের কিছুই থাকবে না।’
সেচের খরচও কৃষকের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুম শেষে ফসল বাঁচাতে সেচ দিতে হচ্ছে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেই খরচও যোগ হচ্ছে উৎপাদন ব্যয়ে। জমির ফসল ধরে রাখতে সেচ চালু রাখার প্রয়োজন হলেও বাড়তি ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন ব্যয় যে হারে বাড়ছে, ফসলের দাম সেভাবে বাড়ছে না। এতে মৌসুম শেষে লাভের অংশ কমে যাচ্ছে। অনেকের জন্য উৎপাদনের খরচ তুলে হিসাব মেলানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষিকাজে টিকে থাকা আরও কঠিন হবে বলে আশঙ্কা তাদের।
উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের এই ব্যবধান কমাতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বাজার তদারকি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. নূরুন্নবী বলেন, ‘উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষক যাতে ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, সে জন্য বাজার তদারকিতে সরকারকে গুরুত্ব বাড়াতে হবে।’
এই সংকটের মধ্যে কৃষকদের জন্য আশা দেখাচ্ছে সরকারের নতুন উদ্যোগ ‘কৃষক কার্ড’। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার প্রায় এক হাজার ৬০০ কৃষককে এই কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে অন্তত ১০ ধরনের সুবিধা দেয়ার কথা জানিয়েছে অধিদফতর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের খুলনার উপপরিচালক নজরুল ইসলাম বলেন, কৃষক কার্ডের সুবিধা উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং কৃষকের লাভ বাড়াতে সহায়তা করবে। পর্যায়ক্রমে জেলার সব কৃষককে এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে।
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে বটিয়াঘাটায় কার্যক্রম শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে জেলার অন্য কৃষকদের কাছেও এই সুবিধা পৌঁছে দেয়ার কথা জানিয়েছে অধিদফতর।
তবে কৃষকের সংকট কাটাতে কার্ডের সুবিধা মাঠপর্যায়ে পৌঁছানোর পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় সারপ্রাপ্তি এবং ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, উৎপাদনের খরচ কমলেও বিক্রির সময় প্রত্যাশিত দাম না পেলে কৃষকের লাভের অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। সবুজ মাঠের সম্ভাবনাকে কৃষকের আর্থিক স্বস্তিতে রূপ দিতে এখন এই দুই দিকেই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।