
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ইরানে হামলার উপায় খুঁজছেন ট্রাম্প: মার্কিন গণমাধ্যম
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:২৩

ইউক্রেনের সীমান্তের শহর ক্রামাতোরস্কে রাশিয়ার গ্লাইড বোমা হামলায় বিধ্বস্ত একটি বাস। ছবি: সংগৃহীত
ইউক্রেনের সীমান্তের শহর ক্রামাতোরস্কে দুটি বেসামরিক বাসে গ্লাইড বোমা হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১৮ জন। স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাতে এ খবর জানিয়েছে বিবিসি।
দোনেৎস্ক অঞ্চলের প্রধান ভাদিম ফিলাশকিন জানিয়েছেন, আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এই হামলা চালানো হয়। তার অভিযোগ, যত বেশি সম্ভব বেসামরিক মানুষকে হত্যার উদ্দেশ্যে যাত্রীবাহী বাস লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।
হামলার সময় বাস দুটি রাস্তায় চলাচল করছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, বাস স্টপে হামলা চালানো হয়েছে।
স্থানীয় প্রসিকিউটররা ধ্বংসযজ্ঞের একাধিক ছবি প্রকাশ করেছেন। তাতে পুড়ে যাওয়া একটি বাসের ধাতব কাঠামো, ধ্বংসাবশেষ এবং সড়কে পড়ে থাকা কয়েকজন নিহত ব্যক্তিকে দেখা গেছে।
ক্রামাতোরস্ক ও পার্শ্ববর্তী স্লোভিয়ানস্ককে তথাকথিত ‘ফোর্ট্রেস বেল্ট’-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেনের শিল্পাঞ্চল দনবাসের পুরো অংশ দখলের দাবির অংশ হিসেবে রাশিয়া এই এলাকাটি দখলের চেষ্টা করছে।
তবে বৃহস্পতিবারের এই হামলার আগে ইউক্রেনজুড়ে রুশ হামলায় নাটকীয়ভাবে তীব্রতা বেড়েছে এবং বেসামরিক হতাহতের সংখ্যাও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ইউক্রেনে যত বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, তা ২০২৫ সালের পুরো বছরে নিহতের সংখ্যার চেয়েও বেশি।
এর আগে গত বুধবার (৭ অক্টোবর) কিয়েভের পূর্বে প্রিলুকিতে পাঁচতলা একটি আবাসিক ভবন ধ্বংস করে দেওয়া এক হামলায় ২২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ শিশু ছিল। তাদের মধ্যে তিন শিশুর বয়স ছিল মাত্র এক বছর।
সর্বশেষ হামলার বিষয়ে মস্কো এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলার ফলে যাত্রীবোঝাই দুটি বাসেই আগুন ধরে যায়। হামলার পর দোনেৎস্ক অঞ্চলে অবস্থানরত সবাইকে ইউক্রেনের নিরাপদ অঞ্চলে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ফিলাশকিন।
দুটি প্রতিবেশী শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যাত্রী ও চালকদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলার কোনো অধিকার আমাদের নেই।’
রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে প্রধানত রুশভাষী দনবাসকে ‘মুক্তি’ ও ‘সুরক্ষার’ কথা বলে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর যুক্তি দেখিয়ে আসছে। দনবাস গঠিত লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক এই দুই অঞ্চল নিয়ে।
লুহানস্কের অধিকাংশ অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকায় ক্রেমলিন এখন দোনেৎস্কের ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাকি ২০ শতাংশ ভূখণ্ডও দখলের চেষ্টা করছে।
এদিকে রাজধানী কিয়েভেও রাশিয়া নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দিনভর সেখানে সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবারের হামলায় তিনজন নিহত এবং আরও ১৪ জন আহত হয়েছেন। আহত আটজনের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
রুশ হামলার কারণে স্কুলশিক্ষার্থীদের ক্লাস ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে।
ইউক্রেনের অবকাঠামো, বিশেষ করে বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপর রুশ হামলার কারণে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটছে। এমনকি এর প্রভাব পড়ছে পানি সরবরাহেও। বৃহস্পতিবার রাজধানীর স্থানীয় পানি সরবরাহ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে শহরের ডান তীরে পানির চাপ কমে যাচ্ছে।
সর্বশেষ হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি বলেন, ইউক্রেনকে সুরক্ষা দিতে দেশটির অংশীদারদের নতুন প্রতিরক্ষা সহায়তা প্যাকেজের মাধ্যমে ‘সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ’ নিতে হবে।
প্রিলুকির হামলার আগে চলতি সপ্তাহে জেলেনস্কি গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে বড় ধরনের রুশ হামলার প্রস্তুতি চলছে বলে সতর্ক করেছিলেন। এর পর কিয়েভের পরিবারগুলো আশ্রয়ের জন্য মেট্রো স্টেশনগুলোতে যেতে শুরু করে।
বর্তমানে এ ধরনের সতর্কবার্তাই ইউক্রেনীয়দের হাতে থাকা প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান উপায়। বিশ্বজুড়ে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট থাকায় রাশিয়ার ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর সক্ষমতা ইউক্রেনের সীমিত।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই একে অপরের বিরুদ্ধে দূরপাল্লার হামলা জোরদার করেছে। রুশ হামলায় ইউক্রেনের ডেটা সেন্টার ও লজিস্টিক গুদামগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
যুদ্ধের বড় একটি সময়জুড়ে ক্রামাতোরস্ক ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর জন্য লজিস্টিক ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। তবে এখন শহরটির পূর্বদিকে রুশ বাহিনী এগিয়ে আসায় সেখানে প্রায় প্রতিদিনই হামলা হচ্ছে।
বিশেষ করে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কে গ্লাইড বোমা ব্যবহার করে হামলা চালানো হচ্ছে। এসব বোমায় ডানার মতো অংশ সংযুক্ত থাকে, ফলে সেগুলো সরাসরি নিচে পড়ে যাওয়ার পরিবর্তে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ভেসে যেতে পারে। আগস্টের শেষ দিকে একদিনেই ক্রামাতোরস্কে নয়টি পর্যন্ত গ্লাইড বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
ক্রামাতোরস্ক সিটি কাউন্সিল এই হামলাকে ‘বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনীর সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সিটি কাউন্সিল আরও বলেছে, ‘আবারও রুশরা এমন একটি স্থানে হামলা চালিয়েছে, যেখানে একেবারেই কোনো সামরিক লক্ষ্য ছিল না।’
তথ্যসূত্র: বিবিসি