
বিমানে সিজেপির পুরুষ নেতাদের আটক করতে কেন নারী পুলিশ?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৫

আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) নয়াদিল্লির বিক্ষোভ থেকে শত শত তরুণ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
আজ শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লি পুলিশ যখন যন্তর মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করা হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করছিল, তখন মধ্যপ্রদেশের অনেক দূরের ইন্দোর শহরে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরের দিকে গভীর নজর রাখছিলেন কীর্তি লাল।
তিনি দেখছিলেন, ছাত্র সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির নেতাদের কীভাবে আটক করা হচ্ছে। সংগঠনটির নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে যে উড়োজাহাজে করে রাজধানীতে আনা হয়েছিল, সেই বিমানের ভেতর থেকেই তাঁদের আটক করে দিল্লি পুলিশ।
বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই বিক্ষোভকারীদের কীভাবে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সাংবাদিকদের কীভাবে আটক করা হচ্ছিল, তাও দেখছিলেন তিনি। শিক্ষার্থীরা যাতে একত্র হতে না পারেন, সে জন্য দিল্লিকে কীভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, সেটিও তার নজরে আসে।
৬৯ বছর বয়সি লাল দ্য স্ক্রোলডটইন বলেন, ‘নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের আন্দোলন দমনে দিল্লি পুলিশের অভিযানের সমালোচনা করেন লাল। বিতর্কিত ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন জ্ঞানেশ কুমার। এই প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে।
লালের মতে, পুলিশের এসব পদক্ষেপ নরেন্দ্র মোদি সরকারের তরুণ ভারতীয়দের বিক্ষোভ নিয়ে ভীতিরই প্রতিফলন। তিনি বলেন, ‘এই সরকার সেই কাজগুলোই করছে, যেগুলোর জন্য তারা আগের সরকারগুলোর সমালোচনা করেছিল। বরং তারা আরও খারাপ কাজ করছে।’
এসআইআর প্রক্রিয়ায় লালের নিজের অভিজ্ঞতা অবশ্য মসৃণ ছিল। তবে ব্যাপকসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিরোধিতা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
লাল বলেন, ‘স্পষ্টতই কারসাজি করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ থাকার কথা, কিন্তু মনে হচ্ছে তাদের ঝোঁক একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে।’ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভ প্রয়োজন। যারা রাস্তায় নেমেছেন, তারা সঠিক কাজ করছেন। তারা জবাব চাইছেন।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লিতে আয়োজিত বিক্ষোভ দমনে নজিরবিহীন পুলিশি তৎপরতা নিয়ে খবর রাখছিলেন, এমন আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে স্ক্রল। মধ্য দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসানো হয়েছিল, ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং ৪৫টি মেট্রো স্টেশনে ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়েছিল।
কলকাতাভিত্তিক লিঙ্গ অধিকারকর্মী প্রিয়দর্শিনী চিত্রাঙ্গদা পুলিশের এই পদক্ষেপকে ‘মতপ্রকাশের ভিন্নমত দমনে পুলিশি তৎপরতার অত্যন্ত গুরুতর বৃদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য এটি ‘গভীর উদ্বেগজনক’।
তিনি বলেন, ‘যন্তর মন্তর থাকার কারণই হলো, গণতন্ত্রে এমন জায়গা প্রয়োজন, যেখানে নাগরিকেরা একত্র হতে পারেন এবং ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত নিরাপত্তার স্বার্থে রাষ্ট্র কোনো বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু সমাবেশ করা কার্যত অসম্ভব করে তোলার সঙ্গে সেটির কোনো মিল নেই।’
বিক্ষোভের প্রতি সহানুভূতিশীল এমন কয়েকজনও এসআইআর প্রক্রিয়ায় নিজেদের ভোটাধিকার ধরে রাখতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। ৩৪ বছর বয়সি শিবানী ত্রিপাঠি মধ্যপ্রদেশের জবলপুর শহরে ভোটার তালিকা থেকে নিজের ও তার মা-বাবার নাম বাদ পড়তে দেখেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমার মা-বাবা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভোট দিয়ে আসছেন, কিন্তু তাঁদের নাম উধাও হয়ে গিয়েছিল।’ তিনি জানান, তাকে তার বাবা-মার নাম ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল করতে দেড় মাস সময় ব্যয় করতে হয়েছে।
ত্রিপাঠি বলেন, তিনি এমন অনেক প্রকৃত ভোটারের কথা জানেন, যারা এখনো তালিকায় নিজেদের নাম ফেরত পেতে লড়াই করছেন। তার মতে, ভারতজুড়ে চলমান বিক্ষোভ এবং ভোটারদের ক্ষোভ ‘ন্যায্য’। তিনি বলেন, ‘সরকার কেবল জনমতকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। এটা একনায়কতন্ত্র।’
পুনের তরুণী সায়ালিও একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি নিজ শহরের একটি বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, বিক্ষোভকারীদের তুলনায় পুলিশ কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি। এরপর পুলিশ তাঁদের টেনেহিঁচড়ে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘এটা একটি অঘোষিত জরুরি অবস্থা। দিল্লির পরিস্থিতি আমাকে ভীত করছে।’
ক্যান্টনমেন্ট থানার বাইরে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ৩৭ বছর বয়সি মুশাররফ শেখ বলেন, ‘দিল্লিতে বিক্ষোভের কয়েক ঘণ্টা আগে ইউটিউব তারকা ধ্রুব রাঠিকে আটক করার ঘটনাই অনেক কিছু বলে দেয়। এটি গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছু প্রকাশ করে।’ শেখ বলেন, ‘আজ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশ যে আচরণ করেছে, তা উদ্বেগজনক।’
আসামের গুয়াহাটির ২৭ বছর বয়সি নার্জি মাউসুম এস বলেন, বিক্ষোভ বানচাল করতে পুলিশের পদক্ষেপ ‘উদ্বেগজনক’। তার প্রশ্ন, ‘বিক্ষোভ ঠেকাতে রাষ্ট্র যদি কার্যত রাজধানীর কিছু এলাকায় প্রবেশের সুযোগ বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে আমরা আসলে কার অসুবিধা ঠেকানোর চেষ্টা করছি, জনগণের, নাকি সরকারের?’
মাউসুম বলেন, বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ ক্রমেই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হওয়াটা গভীর উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে নাগরিকেরা রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হলেই আটক, ব্যারিকেড, নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ এবং জনসাধারণের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়গুলো প্রায় প্রত্যাশিত হয়ে উঠেছে।’
তবে শিলচরের আইনজীবী এবং ভারতীয় জনতা পার্টির সাবেক সদস্য ধর্মেন্দ্র দেব দাবি করেন, ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জিম্মি করে রাখার সুযোগ বিক্ষোভকারীদের দেওয়া যায় না।’
তিনি বলেন, বিক্ষোভ করার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার হলেও ‘জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া’ রাষ্ট্রের সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দেবের দাবি, ‘কোনো বিক্ষোভই কাউকে আইনসম্মত বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি দেয় না কিংবা অত্যাবশ্যকীয় জনসেবায় বিঘ্ন ঘটানোর অধিকার দেয় না।’
গুয়াহাটিভিত্তিক অভিনেত্রী ও শিক্ষাবিদ মৈত্রী দাসের মতে, পুলিশের কঠোর বিধিনিষেধ সত্ত্বেও দিল্লিতে এত মানুষের বিক্ষোভে অংশ নেওয়াটা ‘সময় বদলে যাওয়ার লক্ষণ’। ৩২ বছর বয়সি মৈত্রী বলেন, বিক্ষোভগুলো ইতিমধ্যে প্রভাব ফেলেছে। পুলিশের দমন-পীড়নও সেই প্রভাবেরই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের মধ্যে এই প্রথম আমি সবচেয়ে বেশি আশাবাদী বোধ করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু অধিকারকর্মী ও রাজনীতিকেরা নন, সাধারণ নাগরিকেরাও রাস্তায় নেমে আসছেন এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করছেন।’
ইন্দোরের ৬৯ বছর বয়সি কীর্তি লালও হয়তো শিগগিরই তাদের একজন হতে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি কখনো কোনো বিক্ষোভে অংশ নেননি। ইন্দোরে গত জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও তিনি যোগ দেননি। দেশজুড়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য শিক্ষার্থীরা ওই মন্ত্রীকে দায়ী করেছিলেন।
লাল বলেন, ‘আমি তাদের নৈতিকভাবে সমর্থন করেছিলাম। ধর্মেন্দ্র প্রধানকে জবাব দিতে হতো এবং তার পদত্যাগ করা উচিত ছিল।’ তবে এবার ইন্দোরে কোনো বিক্ষোভের আয়োজন করা হলে তাতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন লাল।
দিল্লিতে পুলিশের দমন-পীড়ন দেখার পরও কি তিনি বিক্ষোভে যোগ দিতে ভয় পাবেন না? লাল দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘বিক্ষোভে যোগ দিতে গিয়ে যদি আমি ভয় পেয়ে যাই, তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র নয়।’
এদিকে দিল্লিতে ফিরে দেখা যায়, অনেক বিক্ষোভকারী সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও সমর্থন পাচ্ছেন। দক্ষিণ দিল্লিতে বিকেলের দিকে আরও আটকের আশঙ্কায় সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন বিক্ষোভকারীরা। এমন সময় দিল্লি পরিবহন নিগমের একটি বাস গতি কমিয়ে তাঁদের পাশে এসে থামে।
বাসচালক তাদের বাসে উঠে পড়ার প্রস্তাব দেন। বিক্ষোভকারী ও সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা বাসে উঠতে শুরু করলে চালক একের পর এক গালিগালাজ করতে থাকেন। বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে তিনি কোনো ভাড়া নিতেও অস্বীকৃতি জানান। এতে উচ্ছ্বসিত বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
চালক বলেন, ‘এই সরকারের বিদায় হওয়া প্রয়োজন।’
তথ্যসূত্র: দ্য স্ক্রোলডটইন