
সৌদির বিমানবন্দরগুলো কেন হুতিদের টার্গেট?
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:২৩

হুতি বিদ্রোহীরা ৮ অক্টোবর হামলার কথা জানানোর পর সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ধোঁয়া ও আগুনের শিখা উঠতে দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স
সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হামলার পর রিয়াদ ও ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাত তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটে তেহরানের এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রোববার (১১ অক্টোবর) সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের ওপর হামলা জোরদার করার পর এটিই ছিল তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে জানা প্রথম যোগাযোগ।
সম্প্রতি রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১৪ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার পর এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে, একই সময়ে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীও তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বৃহত্তর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে; এ অবস্থায় তেহরান সম্ভবত আরেকটি সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছে।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি-র জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মুর্তাজাবি আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘তেহরান হুতির মিত্র এবং এই হামলায় তাদের প্রভাব রয়েছে; তবে তাদের সিদ্ধান্তগুলো তেহরান নিয়ন্ত্রণ করে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘রিয়াদের সাথে আলোচনার পথ সুগম করার প্রস্তাব দিয়ে ইরান নিজেকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সমঝোতার ক্ষেত্রে অপরিহার্য পক্ষ হিসেবে তুলে ধরছে।’
তাহলে রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে কী ধরনের আলোচনা চলছে এবং ইরান কেন আলোচনার পথ সুগম করার প্রস্তাব দিচ্ছে?
ইরান ও সৌদি আরব কী নিয়ে আলোচনা করেছে?
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই অঞ্চলে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং তা প্রশমনের প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
আলোচনা-পরবর্তী সময়ে রোববার আরাঘচি এই সংঘাতের সামরিক সমাধান খোঁজার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা এবং সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সংলাপ আয়োজনে তেহরানের সহায়তার প্রস্তাব দেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আরাঘচি বলেছেন যে সামরিক পন্থার ওপর জোর দেওয়া এবং রাজনৈতিক সমাধানকে উপেক্ষা করা পরিস্থিতিকে কেবল আরও জটিলই করে তুলবে।
এছাড়া সোমবার (১২ অক্টোবর) মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মধ্যস্থতা করার বিষয়ে তেহরানের আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, আরব উপদ্বীপের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে ইরান গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
সংঘাত নিরসনে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই চাই না যে দুটি ইসলামি দেশের মধ্যে বৈরিতা ও যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক।’
ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়ে ইরানের অবস্থান কী?
ইরান বারবার ইয়েমেন সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং বলেছে, তারা অব্যাহত সামরিক অভিযানের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানকে সমর্থন করে।
তেহরান হুতিদের সমর্থন করে, যারা ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং দেশটির বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ করছে।
সশস্ত্র এই গোষ্ঠীটি ইরান-ঘনিষ্ঠ ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ; এই অক্ষের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্যদের মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।
এদিকে, ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থনকারী একটি সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
বাঘাই সোমবার বলেছেন, এই সংঘাত ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করছে এবং তিনি আরও সংঘাতের চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতাকে শ্রেয় বলে উল্লেখ করেছেন।
ইয়েমেনের লড়াইয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি কী?
রাজধানী সানাসহ হুতিদের দখলে চলে যাওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বাহিনী গত ৪ অক্টোবর ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হয়েছে।
রিয়াদের সমর্থনে পরিচালিত সরকারি বাহিনী কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি এলাকায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে বিবদমান পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী দাবিগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা কঠিন।
সৌদি বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিয়েছে হুতিরা।
শনিবার ও রোববার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ফিলিস্তিনের নাগরিকরাও রয়েছেন।
ক্রমবর্ধমান সহিংসতা রিয়াদে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত করেছে, যা এই সংঘাতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও বেসামরিক প্রভাবকে তুলে ধরছে।
ইয়েমেন-বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেন আবারও ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ’ পরিস্থিতিতে ফিরে গেছে এবং এই আক্রমণের মূল ধকল সাধারণ মানুষকেই সইতে হচ্ছে।
সৌদি আরব-হুতিদের মধ্যে আলোচনার পথ সুগম করতে ইরান কেন আগ্রহী?
রিয়াদ ও হুথিদের মধ্যে আলোচনার পথ সুগম করার বিষয়ে ইরানের প্রস্তাবটি তেহরানের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার এবং ইয়েমেনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত কোনো আঞ্চলিক সমঝোতা অর্জনের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।
কিং’স কলেজ লন্ডনের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রেগ আল-জাজিরাকে বলেছেন, ‘আমার মনে হয় ইরান ইয়েমেনকে একটি সামরিক দায় থেকে কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত করার চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, তেহরান স্বীকার করে যে সামরিক অভিযান জোরদার করা সত্ত্বেও হুতিদের দখলে যাওয়া এলাকাগুলো, বিশেষ করে তাইজ ও বাব আল-মান্দেব এলাকার পুনরুদ্ধারে সৌদি আরব হিমশিম খাচ্ছে।
ক্রেগ আরও বলেন, ‘আরাঘচির এই প্রস্তাবটি ইরানকে এমন একটি সংকটের সমাধানের অংশ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা, যে সংকট জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে আবার দেশটির ভূমিকাও রয়েছে।’
এদিকে বিশ্লেষক মুর্তাজাবি বলেছেন, ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা হলো পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংঘাতগুলোকে পরস্পরের সাথে যুক্ত করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
তিনি বলেন, ‘এর বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো একপক্ষে ইরান ও তার মিত্র এবং অপরপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক অনাক্রমণ চুক্তি।’
তিনি যুক্তি দেন যে, এ ধরনের চুক্তির জন্য কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো সমঝোতার পরিবর্তে ইয়েমেন ও লেবাননসহ একাধিক রণাঙ্গনে শত্রুতার অবসান ঘটানো প্রয়োজন হবে।
তাছাড়া শিক্ষাবিদ ক্রেগ উল্লেখ করেন, এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘সৌদি দিক’ও রয়েছে। তার ভাষ্য, ‘ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা নিয়ে রিয়াদ ক্রমশ অস্বস্তিবোধ করছে; ইয়েমেনের বিষয়ে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত আগ্রহ তাদের হতাশ করছে এবং তারা আবারও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর নির্ভরশীল হতে অনিচ্ছুক।’
ক্রেগ বলেন, ‘ইরান এমন একটি সুযোগ দেখছে যার মাধ্যমে এটি প্রমাণ করা সম্ভব যে, তেহরানের সাথে সম্পৃক্ততা এমন কিছু অর্জন করতে পারে যা সৌদি আরবের প্রথাগত নিরাপত্তা অংশীদারিত্বগুলো দিতে হিমশিম খেয়েছে।’
বিশ্লেষকরা এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিবেচনার বিষয়গুলোও উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরান উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে রয়েছে; অন্যদিকে, ইরানের সৃষ্ট নানা বাধা সত্ত্বেও উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের জ্বালানি রপ্তানি ধীরে ধীরে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরিয়ে আনছে।
ক্রেগ বলছেন, ‘ইয়েমেন সংকট থেকে রিয়াদকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দেওয়ার ফলে ইরান সম্ভবত ইয়েমেন-কেন্দ্রিক পরিস্থিতির বাইরেও বাড়তি সুবিধা বা দরকষাকষির ক্ষমতা অর্জন করতে পারে—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত আলোচনা, নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ক্ষেত্রে।’
তবে তিনি হুতিদের ওপর ইরানের প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন; কারণ হুতিদের নিজস্ব রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও দাবি-দাওয়া রয়েছে।
আর মোরতাজাবির কাছে এর বৃহত্তর বার্তাটি হলো, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচনা করা সম্ভব নয়।
সূত্র: আল জাজিরা