
রহমত-আলীখিলের জুটিতে অস্বস্তি নিয়েই দিন শেষ করল বাংলাদেশ
খেলা ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:১৩

এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে একসঙ্গে খেলানো ক্রমেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ মরিনিয়োর জন্য। ছবি: সম্পাদিত
কিলিয়ান এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ঘিরে বড় সমস্যার মুখেই রিয়াল মাদ্রিদ। মাঠে দুজনের বোঝাপড়ার অভাব এবং একই জায়গায় খেলার প্রবণতা দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আর এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করাই সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে হোসে মরিনিয়োর দ্বিতীয় অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বলে মনে করছে দ্য অ্যাথলেটিক।
দুই বছরের কিছু বেশি সময় আগে ফুটবল বিশ্বের শীর্ষে ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। রেকর্ড ১৫তমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর বহু বছরের প্রচেষ্টার অবসান ঘটিয়ে পিএসজি থেকে বিনা ট্রান্সফার ফিতে এমবাপ্পেকে দলে ভেড়ায় তারা।
ইউরোপের সেরা দলটির সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়কে যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে ক্লাবটির সাফল্য অব্যাহত থাকার নিশ্চয়তা হিসেবেই দেখেছিলেন অনেকে।
সে সময় ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন ভিনিসিয়ুস। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি জেতেন ম্যানচেস্টার সিটির রদ্রি, যে সিদ্ধান্তে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। অন্যদিকে, ক্লাবটির ইতিহাসে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হিসেবে যোগ দেওয়া জুড বেলিংহ্যাম প্রথম মৌসুমেই ২৩ গোল করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন।
বিশ্বমানের তারকাদের একত্র করে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের গড়ে তোলা নতুন গ্যালাক্টিকো প্রকল্প নিয়ে ক্লাব, সমর্থক ও সংবাদমাধ্যমের প্রত্যাশা তখন আকাশচুম্বী।
কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত দুই মৌসুমে বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি রিয়াল মাদ্রিদ। একের পর এক দায়িত্ব বদলেছেন চারজন কোচ। এমনকি গত জুনে নির্ধারিত সময়ের আগেই আকস্মিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও ঘোষণা করেছিল ক্লাবটি।
এই সময়ে রেফারিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে বারবার অভিযোগ তুলেছে রিয়াল। তবে পর্দার আড়ালে দলের লড়াকু মানসিকতার অভাব, ২০২৪ সালে টনি ক্রুস ও ২০২৫ সালে লুকা মদরিচের বিদায়ে সৃজনশীল মিডফিল্ডারের ঘাটতি এবং তারকাদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুসের মধ্যে মাঠে কার্যকর জুটি গড়ে না ওঠার বিষয়টিতেই এই দুর্বলতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভালদেবেবাসে (রিয়ালের অনুশীলন মাঠ) নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এমন এক সূত্র দ্য অ্যাথলেটিক-কে বলেন, 'এটি ফুটবল ও ব্যক্তিগত অহংবোধের সমস্যা। তবে সবার আগে এটি ফুটবলীয় সমস্যা।'
রিয়াল মাদ্রিদের কোচিং স্টাফের সাবেক এক সদস্যও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার বিশ্বাস, 'এই দুই খেলোয়াড়ের একজন অর্থাৎ হয় ভিনিসিয়ুস নয়ত এমবাপ্পে চলে না যাওয়া পর্যন্ত সমস্যাটির সমাধান হবে না।'
প্রতিবেদনে যাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে, তাদের সবাই নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেছেন, যাতে ক্লাবের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
আন্তর্জাতিক বিরতির আগে লা লিগায় বার্সেলোনার চেয়ে ছয় পয়েন্ট পিছিয়ে পড়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। সামনে ২৫ অক্টোবর মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকো। এমন পরিস্থিতিতে মরিনিয়োর সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের কারণ এবং সেটি মোকাবিলায় তার কৌশল তুলে ধরেছে দ্য অ্যাথলেটিক।
গত মৌসুমে বিশৃঙ্খলায় জর্জরিত ড্রেসিংরুমের দায়িত্ব নিয়েছেন মরিনিয়ো। সেই পরিস্থিতির চূড়ান্ত রূপ দেখা গিয়েছিল ফেদেরিকো ভালভার্দে ও অরেলিয়া চুয়ামেনির সংঘর্ষে। তিন সপ্তাহের আন্তর্জাতিক বিরতির আগে আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে ২-১ গোলে হারের পর স্পেনের সংবাদমাধ্যমে আবারও রিয়ালের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা নিয়ে গুঞ্জন ছড়ায়।
তবে ভালদেবেবাসে থাকা মরিনিয়ো ও খেলোয়াড়দের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র এসব প্রতিবেদনের সত্যতা অস্বীকার করেছে। তারা স্বীকার করেছে, পরিস্থিতির আরও উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে এবং ফল খারাপ হলে দলের পরিবেশ আবারও নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারে। তবে তাদের দাবি, গত মৌসুমের তুলনায় এবার ড্রেসিংরুমের মনোবল ও খেলোয়াড়দের পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো।
মরিনিয়োর ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেন, 'দলকে আরও ভালোভাবে রক্ষণ সামলাতে হবে এবং আক্রমণে কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। বিরতির সময় মরিনিয়ো এই বিষয়গুলো নিয়েই কাজ করেছেন। দলের দুর্বলতা দূর করতে অভ্যন্তরীণ ও কৌশলগত সমাধান খুঁজেছেন তিনি।'
পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট দুই তারকার ব্যবধান:
আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ডার্বিতে এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস কেউই গোল করতে পারেননি। রিয়াল মাদ্রিদের এ পর্যন্ত খেলা আট ম্যাচে এমবাপ্পের গোল আটটি, সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট। তবে দল যে দুটি ম্যাচে হেরেছে, দুটিতেই গোল পাননি তিনি। রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে অন্য পরাজয়ের ম্যাচটিতে পেনাল্টিও মিস করেছিলেন ফরাসি তারকা।
ভিনিসিয়ুসের পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক। আট ম্যাচে তার গোল মাত্র একটি, সঙ্গে তিনটি অ্যাসিস্ট। ক্লাবের ভেতরে এই পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মরিনিয়োর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা নিশ্চিত করেছেন, স্পেনের সংবাদমাধ্যমে ভিনিসিয়ুসকে একাদশ থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডকে বসিয়ে রাখার কথা কখনোই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেননি কোচ।
চলতি মৌসুমে ভিনিসিয়ুসের গোল করার দক্ষতা কমে যাওয়ায় সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। এর কয়েকটি স্পেনের সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। এমনকি ভিনিসিয়ুসের চিবুকে সাম্প্রতিক কসমেটিক সার্জারির কারণে তার পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ছে কি না, এমন জল্পনাও ছড়ায়। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।
এ বিষয়ে দ্য অ্যাথলেটিক-এর প্রশ্নের জবাব দেয়নি রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা ভিনিসিয়ুসের প্রতিনিধিরা। ২৬ বছর বয়সি ভিনিসিয়ুস গত মৌসুমের শেষ দিকে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভালোভাবে গোল করছিলেন। কিন্তু চলতি মৌসুম শুরুর পর তার পারফরম্যান্সে কিছুটা ভাটা পড়েছে।
মাঠে একই জায়গায় খেলছেন দুজন:
একসঙ্গে খেললে নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে যে দুই তারকাই সমস্যায় পড়ছেন, তা স্পষ্ট। আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ডার্বিতে কেউই নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ছিলেন না। ম্যাচের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাদের হিটম্যাপেও দেখা যায়, দুজনই বারবার মাঠের বাঁ দিকের একই জায়গায় অবস্থান করছেন।
ওই ম্যাচে রিয়াল মাদ্রিদের পাসিং ম্যাপও একই সমস্যার ইঙ্গিত দেয় বলে জানিয়েছে দ্য অ্যাথলেটিক। পাল্টা আক্রমণের সময় দুই ফরোয়ার্ডকে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা কাজে লাগাতে শেখানোর চেষ্টা করছেন মরিনিয়ো।
লেফট উইংয়ের সমস্যা:
২০২৩-২৪ মৌসুম থেকে লা লিগায় ওপেন প্লেতে দুই খেলোয়াড়ের অবস্থান ও বল স্পর্শের মানচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুজনেরই বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণ করার প্রবণতা বেশি। অবশ্য এমবাপ্পে রিয়ালে যোগ দেন এর পরের মৌসুমে।
দুজনের এই একই ধরনের খেলার প্রবণতাই হয়তো ব্যাখ্যা করে কেন কোচিং স্টাফের সাবেক এক সদস্য মনে করেন, সমস্যা সমাধানে তাদের একজনকে ক্লাব ছাড়তে হবে। সাবেক আরেক কোচের স্টাফের সদস্যও একই মত দিয়ে বলেন, 'হয় দলের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে, নয়তো এই দুই খেলোয়াড় নিজেদের বিকশিত করতে পারবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'দলে খেলা তৈরি করার মতো প্রচুর প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুসের রক্ষণাত্মক অবদান দুর্বল হওয়ায় মাত্র আটজন খেলোয়াড়কে দিয়ে রক্ষণ সামলে ভারসাম্য বজায় রাখা অসম্ভব। আবার আক্রমণ সংগঠিত করাও অত্যন্ত কঠিন, যখন দলের সেরা খেলোয়াড়েরা সব সময় দ্রুত আক্রমণ করতে চায় এবং একই জায়গা খোঁজে।'
তবে রক্ষণাত্মক কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিয়াল মাদ্রিদ ৪-৪-২ ফরমেশনে খেলত। এই ব্যবস্থায় এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়তেন এবং রক্ষণে তাদের দুর্বল অবদানও স্পষ্ট হয়ে উঠত।
বর্তমানে মরিনিয়োর দল রক্ষণে আঁটসাঁট ৪-২-৩-১ ফরমেশন ব্যবহার করছে। এতে দুই তারকা ফরোয়ার্ডকে রক্ষণাত্মক পরিশ্রম তুলনামূলক কম করতে হয়। তাদের মূল দায়িত্ব হলো নির্দিষ্ট জায়গা রক্ষা করা এবং দলের কাঠামো ঠিক রাখা।
মরিনিয়োর কৌশল সম্পর্কে অবগত এক সূত্র বলেন, 'মরিনিয়োর পরিকল্পনা হলো কৌশলগত ভারসাম্য খুঁজে বের করা। যাতে দুই খেলোয়াড় রক্ষণে অবদান রাখতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শক্তি ব্যয় করতে না হয়। এতে মাঠের শেষ তৃতীয়াংশে তাদের ক্ষিপ্রতা ও কার্যকারিতা বজায় থাকবে।'
তবে উদ্বেগের কথা, মরিনিয়োর আগে দায়িত্ব পালন করা কার্লো আনচেলত্তি, জাবি আলোনসো ও আলভারো আরবেলোয়া কেউই দুই তারকার কাছ থেকে একসঙ্গে সেরাটা বের করে আনতে পারেননি। আনচেলত্তি এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস, জুড বেলিংহ্যাম ও রদ্রিগোকে নিয়ে তারকায় ঠাসা আক্রমণভাগ বজায় রেখেছিলেন। অন্যদিকে, আলোনসো নিজের প্রকল্পের প্রধান মুখ হিসেবে এমবাপ্পেকে বেছে নেন। তবে ভিনিসিয়ুস ও বেলিংহ্যামের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়।
আরবেলোয়া ভিনিসিয়ুস ও বেলিংহ্যামের আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় এমবাপ্পেকে হারিয়েছিলেন। তবে প্রতিবেদনে মতামত দেওয়া সব সূত্রই একমত যে, মাঠের বাইরে এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুসের সম্পর্ক ভালো।