প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮:২১

প্রিন্সেস ডায়ানা, ক্লিওপেট্রা, এলিজাবেথসহ ইতিহাসের কিংবদন্তীতুল্য সুন্দরীরা শুধু তাদের শারীরিক সৌন্দর্যের কারণেই নয়, মেধা, ক্ষমতা এবং পরিস্থিতির কারণেই ইতিহাসের বুকে নিজেদের চিরস্থায়ী করে গেছেন। তাদের জীবনী নিয়ে আমাদের হয়তো কম-বেশি জানা আছে। এই প্রতিবেদনে আট সুন্দরী নারীর সৌন্দর্যের আড়ালে থাকা জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে জানবো।

প্রিন্সেস ডায়ানা: প্রিন্সেস ডায়ানা হচ্ছেন মানবতার প্রতীক। আচার-আচরণ, মানবতাবোধ আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য তাকে আজও মনে রেখেছে পুরো বিশ্ব। ব্রিটেনের অন্যতম অভিজাত স্পেন্সার পরিবারে ১৯৬১ সালের ১ জুন তার জন্ম হয়। চার বছরের প্রেমের পর ১৯৮১ সালে চার্লস-ডায়ানার আড়ম্বরপূর্ণ বিয়ে অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে চার্লসের হৃদয় সম্পূর্ণভাবে ডায়ানার প্রতি নিবেদিত ছিল না। তার ভালোবাসা অন্য কারো প্রতি কেন্দ্রীভূত ছিল। ১৯৯৬ সালে এই দম্পতি আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করেন, যা ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত রাজকীয় বিবাহের এক নাটকীয় সমাপ্তি ঘটায়। এর পরপরই ১৯৯৭ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ডায়নার। প্রিন্সেস ডায়নার দৈহিক মৃত্যু হলেও তার কর্ম তাকে বিশ্ববাসীর কাছে বাঁচিয়ে রেখেছে। রাজপরিবারে প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই ডায়না উষ্ণতা, সহানুভূতি এবং আধুনিকতার এক সতেজ অনুভূতি নিয়ে এসেছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে মানুষের মন ছুঁয়ে গিয়েছিল। দরিদ্র ও অসহায়দের প্রতি তার দয়া ও আন্তরিকতা দ্রুতই তাকে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা এনে দেয় এবং ব্রিটেনের সীমানা ছাড়িয়েও প্রশংসিত এক আন্তর্জাতিক আইকনে পরিণত করে। দানশীলতার জন্য তার খ্যাতি ছিল আকাশচুম্বি। এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্পর্শে রোগ ছড়ায়—এমন ভ্রান্ত ধারণার সময়ে ডায়ানা কোনো গ্লাভস ছাড়াই তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আলোচনার ঝড় তুলেছিলেন। তিনিই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, এইচআইভি/এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এই রোগ ছড়ায় না।

ট্রয়ের হেলেন: অসাধারণ রূপ-লাবণ্যের অধিকারিণী অনিন্দ্যসুন্দরী হেলেনকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, হেলেন জিউস ও লেডার কন্যা ছিলেন এবং স্পার্টার রাজা মেনেলাউসকে বিয়ে করেছিলেন। ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিস হেলেনকে নিয়ে স্পার্টা থেকে ট্রয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই মেনেলাউস যুদ্ধযাত্রা করে এবং ট্রোজান যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। যুদ্ধে ট্রয় নগরী পুড়ে যায়। জয়লাভ করে গ্রিকরা। কিন্তু যে হেলেনের জন্য এত কিছু তাকে মেনেলাউস কাছে পেয়েছিল কিনা তা আজও অজানা। সর্বনাশা রূপ-লাবণ্যের কারণেই হেলেন দুবার অপহৃত হন। প্রথমবার তাকে অপহরণ করেন গ্রীক বীর থিসিউস। কিন্তু আকাডেমসের (গ্রিকপুরাণে তাকে হারকিউলিসের মতো উপদেবতা বলা হতো) সহায়তায় হেলেনের দুই ভাই ক্যাস্টর ও পলিডিউসিস হেলেনকে উদ্ধার করেন। ট্রোজান ওয়ার বা ট্রয়ের যুদ্ধে এ ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বন করে অন্ধ গ্রিক মহাকবি হোমার একটি বিখ্যাত মহাকাব্য রচনা করেন যার নাম ‘ইলিয়াড’, ট্রয়ের অপর নাম ছিল ইলিয়াড। এছাড়াও ‘ওডিসি’তেও এর কিছু কিছু উল্লেখ আছে।

ক্লিওপেট্রা: ক্লিওপেট্রা সপ্তম থিয়া ফিলোফেটর ছিলেন মিশরের রানী এবং প্রাচীন মিশরের শেষ ফারাও। খ্রিস্টপূর্ব ৬৯ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জনপ্রিয় সংস্কৃতি তাকে কেবল একটি মোহনীয় চেহারায় সীমাবদ্ধ করে রেখেছে, কিন্তু রোমান প্রচারণার বাইরে লেখা প্রাচীন নথিগুলো তার বুদ্ধিমত্তার ওপরই জোর দেয়। তিনি নয়টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন, তার কণ্ঠস্বর ছিল মনোমুগ্ধকর এবং তিনি তার রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য রাজনৈতিক প্রতিভা ব্যবহার করেছিলেন। শুধু সৌন্দর্য নয়, বুদ্ধিমত্তায়ও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রানী সপ্তম ক্লিওপেট্রা যেমন ছিলেন সৌন্দর্যে অতুলনীয়, তেমনি তার জীবন ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। তার বাবা, রাজা দ্বাদশ টলেমি মারা যাওয়ার পর তার দুই সন্তান ত্রয়োদশ টলেমি এবং সপ্তম ক্লিওপেট্রার মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে দেন। তৎকালীন নিয়মানুসারে, ক্লিওপেট্রা তার ভাই ত্রয়োদশ টলেমিকে বিয়ে করেন এবং একসাথে মিশর শাসন করতে থাকেন। বিয়ের পর ক্লিওপেট্রা ও তার ভাইয়ের মধ্যকার সম্পর্ক সুখকর ছিল না। তাছাড়া তখনকার মিশরের অবস্থা ছিল বিশৃঙ্খল। টলেমি ষড়যন্ত্র করে ক্লিওপেট্রাকে মিশর থেকে বিতাড়িত করে একাই রাজ্য শাসন করতে থাকেন। ধারণা করা হয়, ক্লিওপেট্রা তখন তৎকালীন সিরিয়ায় পালিয়ে যান নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য। তিনি সিরিয়ায় গিয়ে সৈন্য যোগাড় করতে থাকেন, যাতে হারানো সিংহাসন পুনরুদ্ধার করা যায়। রোমান সাম্রাজ্যের রাজা জুলিয়াস সিজার ভাই-বোনদের বিবাদ মিটমাট করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অসন্তুষ্ট ত্রয়োদশ টলেমি ও তার উপদেষ্টা পোথিনোস সিজার ও ক্লিওপেট্রার বিরুদ্ধে বাহিনী গঠন করেছিল। শক্তিবৃদ্ধির পরে ৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের প্রথম দিকে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং স্বল্প সময়কাল পরেই ত্রয়োদশ টলেমি নীল নদের যুদ্ধে মারা যান। স্বৈরশাসক সিজার ক্লিওপেট্রা ও তার ছোট ভাই চতুর্দশ টলেমিকে মিশরের সহ-শাসক ঘোষণা করেছিল। ক্লিওপেট্রা নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সিজারের সাথে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। রোমের উদ্দেশ্যে আলেকজান্দ্রিয়া ত্যাগ করার আগে সিজারিয়ন নামে তাদের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। সিজারের মৃত্যুর পর ক্লিওপেট্রা রাজা অ্যান্টনিকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলেন। ক্লিওপেট্রার এই কৌশলটিও কাজে লেগেছিল, অ্যান্টনি তার প্রেমে পাগল হয়ে তার সাথে আলেক্সান্দ্রিয়ায় অনেকটা সময় কাটান। ক্লিওপেট্রা এবং রাজা অ্যান্টনির এই সম্পর্ক রোমানদের পছন্দ ছিল না। তারা অ্যান্টনির শত্রুদের সাথে মিলে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দেয়। এই যুদ্ধের মধ্যেই একটি গুজব ছড়ানো হয় যে, ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেছেন। প্রেয়সীর মৃত্যুর খবর শুনে রাজা অ্যান্টনি ভেঙে পড়েন, এবং তলোয়ারের আঘাতে নিজের জীবন শেষ করে দেন। তাছাড়া তখন যুদ্ধের অবস্থাও বেশ নাজুক ছিল। রাজা অ্যান্টনির পরাজয় ছিল নিশ্চিত। রাজার মৃত্যুর পর যুদ্ধে বিজয়ী হন রোমান সাম্রাজ্যের আরেক অধিপতি অক্টাভিয়ান। অক্টাভিয়ান মিশর দখল করে নেন। এদিকে ক্লিওপেট্রা শোকে পাথর পড়েন। একে অ্যান্টনির মৃত্যু, আরেকদিকে পরাজয়ের লজ্জা। তখন তিনি বিভিন্ন উপায়ে আত্মহত্যা করতে চাইলেও পারেননি, কারণ অক্টাভিয়ানের সৈন্যরা তাকে পাহারায় রেখেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সালে বন্দি ক্লিওপেট্রা বিষাক্ত মিশরীয় গোখরা সাপের কামড়ে আত্মহত্যা করেন। অনেকের মতে, ক্লিওপেট্রা আত্মহত্যা করেননি, বরং খুন হয়েছিলেন।

রানী প্রথম এলিজাবেথ: রানি প্রথম এলিজাবেথ ছিলেন একজন সফল শাসক। ইংল্যান্ডের মানুষ তার সময়েই সবচেয়ে সুখের সময় কাটিয়েছে। তবে বিতর্ক কখনোই পিছু ছাড়েনি রানির। সারাজীবন ছিলেন একজন কুমারী। বিয়ে তো দূরের কথা কোনো পুরুষের সঙ্গে কখনো মেশেননি তিনি। যে কারণে তিনি নারী কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। ইংল্যান্ডের গ্রিনউইচে ১৫৩৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের জন্ম। রাজা হেনরি অষ্টম এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান বোলেনের কন্যা ছিলেন তিনি। তার যখন মাত্র দুই বছর বয়স তখন তার মা অ্যান বোলেনকে শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড দেন তার বাবা রাজা হেনরি অষ্টম। এরপর তিনি পালিত হয়েছেন সেবিকাদের কাছে। কিছুদিন সৎ মায়ের কাছেও পালিত হয়েছেন। বিয়ে করতে রাজী না থাকায় রানী নারী নয়, পুরুষ-এই মিথ ছড়িয়ে পড়েছিল চারিদিকে। রানি এলিজাবেথ ছিলেন প্রখর মেধাবী। বিভিন্ন বিষয়ে তিনি ঘরে শিক্ষা নিতে থাকেন। সব বিষয়েই পারদর্শী হয়ে ওঠেন তিনি। সংগীত থেকে শুরু করে নানা ভাষার বিষয়েই বেশ আগ্রহ ছিল তার। মেধাবীর পাশাপাশি তিনি তেমনি রূপবতী ছিলেন। রাজ্য পরিচালনা করতে গিয়ে বন্ধুর পাশাপাশি প্রচুর শত্রুও তৈরি হয়েছিল তার। স্পেনের তৎকালীন শাসকের বড় ছেলের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার কারণে এলিজাবেথকে স্পেনের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। রানি প্রথম এলিজাবেথ মানুষ হিসেবে ছিলেন খুবই সাদাসিধে। নাটক, নাচ খুব ভালোবাসতেন। পড়ালেখার পাশাপাশি ফ্যাশনে বেশ সচেতন ছিলেন। তিনি গহনা এবং চমৎকার পোশাক পছন্দ করতেন এবং তার পোশাকগুলো প্রায়শই সোনা এবং রৌপ্য দিয়ে তৈরি ছিল। তিনি মেকআপের সাহায্যে একটি আকর্ষণীয়ভাবে ফ্যাকাশে চেহারা অর্জন করেছিলেন। তার এই আকর্ষণীয় চেহারা এবং রূপচর্চা নিয়েও আছে নানান বিতর্ক।

শি শি: প্রাচীন চীনের চার সুন্দরীর অন্যতম শি শি। বলা হয়, তিনি বসন্ত ও শরৎকালের শেষের দিকে একটি ছোট ইউয়ে গ্রামে (বর্তমান ঝুজি-তে) বাস করতেন। হুয়ান শা নদীর তীরে রেশম ধোয়ার জন্য পরিচিত একজন স্থানীয় সুন্দরী ছিলেন তিনি। তাকে ইউয়ে মন্ত্রী ফান লি আবিষ্কার করেন এবং পরে ইউয়ে রাজা গোজিয়ান একটি যৌন গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে তাকে উ রাজা ফুচাইয়ের কাছে উপপত্নী হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই ঘটনাই ৪৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে উ-এর পতনে অবদান রাখে। মিথ আছে যে, শি শির সৌন্দর্যের ঝলকে পুকুরের মাছরাও সাঁতার কাটা থামিয়ে পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। শি শি’র সৌন্দর্যে ফুচাই এতোটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে রাষ্ট্রীয় বিষয় থেকে তার মনোযোগ সরে যায়। ধীরে ধীরে তিনি তার রাজনৈতিক দায়িত্ব উপেক্ষা করতে শুরু করেন এবং শি শির সাথে অবসর সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। তিনি প্রায়ই তাকে রথে করে শহরের কোলাহলে নিয়ে যেতেন, যেখানে তিনি তার চারপাশের লোকদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দরী নারীর হৃদয় জয় করার বিষয়ে বড়াই করতেন। শি শির পরামর্শে প্রভাবিত হয়ে তিনি তার বিশ্বস্ত উপদেষ্টা, সম্মানিত সেনাপতি উ জিক্সুকে হত্যা করার গুরুতর সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়াও, ফুচাই সুঝৌ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার (৯.৩ মাইল) পশ্চিমে লিংইয়ান পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত একটি রাজকীয় উদ্যানের মধ্যে গুয়ানওয়া প্রাসাদ (সুন্দরী নারীদের প্রাসাদ) নির্মাণ করেন। এই ঘটনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে উ রাজ্যের ক্ষমতা ও প্রভাব হ্রাস পেতে শুরু করে। রাজা গৌজিয়ান উ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উ সেনাবাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়। উ জিক্সুর পরামর্শ অমান্য করার অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে রাজা ফুচাই আত্মহত্যা করেন। এরপর শি শি’র মৃত্যু নিয়েও নানা মিথ ছড়িয়ে পড়ে। তিনি যেভাবেই মারা যান না কেন, দুই সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে তাকে তার আত্মত্যাগ এবং আনুগত্য, সাহস ও নিঃস্বার্থতার আদর্শের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়।

মমতাজ মহল: আগ্রার একটি অভিজাত পার্সিয়ান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মমতাজ মহল। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে শাহজাদা খুররমের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। খুররম পরবর্তীতে শাহজাহান নামধারণ করে সিংহাসনে আরোহন করেন। মমতাজ মহল ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের তৃতীয় স্ত্রী। মমতাজ মহল ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর। সাম্রাজ্যের নানাপ্রান্তে ভ্রমণের সময় তিনি সম্রাটের সঙ্গে থাকতেন। সম্রাট তার রাজকীয় সিলমোহর ‘মোহর উজাহ’ তার কাছে গচ্ছিত রাখতেন। ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের বিবেচনায় তিনি ছিলেন তার খালা এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নুরজাহান বেগমের প্রতিচ্ছবি। সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল তার এই প্রভাব-প্রতিপত্তিকে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করতেন। তৎকালে স্থাপত্যশিল্পের সঙ্গে মোগল নারীদের সম্পৃক্ততা ছিল খুবই সাধারণ বিষয়। মমতাজ মহল আগ্রায় যমুনা নদীর তীরে একটি বাগান তৈরিতে অবদান রাখেন। সম্রাটের সঙ্গে মমতাজ মহলের দাম্পত্য জীবন ছিল ১৯ বছরের। এর ভেতর তিনি ১৪ বার গর্ভধারণ করেন। এদের মধ্যে সাতজনই জন্মের সময় বা শৈশবে মারা যায়। বার বার গর্ভধারণের ফলে সম্রাজ্ঞী দুর্বল হয়ে পড়েন। তারপরও সামরিক অভিযানসহ যে কোনো সফরে তিনি সম্রাটের সঙ্গেই থাকতেন। ১৬৩১ সালে সম্রাট শাহজাহান দক্ষিণাত্যের একটি মরুভূমিতে অভিযানে বের হন। গর্ভবতী সম্রাজ্ঞীও সাথে ছিলেন। সফরে ১৪তম সন্তান জন্ম দেয়ার সময় তার মৃত্যু হয়। প্রথমে মমতাজ মহলকে বুরহানপুরের একটি বাগানে দাফন করা হয়। তাপ্তি নদীর তীরবর্তী এই বাগান নির্মাণ করেছিলেন মোগল শাহজাদা দানিয়েল। ১৬৩১ সালের ডিসেম্বর মাসেই শাহজাদা শাহ সুজার নেতৃত্বে মমতাজ মহলের লাশ আগ্রায় নিয়ে আসা হয়। প্রথমে একটি ছোট ভবনের ভেতর তাকে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীকে সেখানে নির্মাণ করা হয় তাজমহল। তাজমহল নির্মাণ করতে সময় লেগেছিল ২২ বছর। ১৬৬৬ মৃত্যু আগ পর্যন্ত সম্রাট শাহজাহান মমতাজ মহলের ভালোবাসা বুকে নিয়েই বেঁচে ছিলেন।

রানী নেফারতিতি: মিশরীয় পুরাণ বা সভ্যতা সম্পর্কে যাদের জানা আছে, তাদের কাছে বেশ পরিচিত একটি নাম নেফারতিতি। নেফারনেফারুয়াতেন নেফারতিতি সবার কাছে মিশরের রানী এবং ফারাও আখেনাতেনের রাজকীয় বধূ হিসেবেই সুপরিচিত। তার বিখ্যাত চুনাপাথরের আবক্ষ মূর্তিই সারা বিশ্বে তাকে এই পরিচিতি এনে দিয়েছে। প্রাচীন মিশরে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিবর্তনে তার প্রভাব সৌন্দর্যের ঊর্ধ্বে ছিল। নেফারতিতি ও তার স্বামী ধর্মীয় এক বিপ্লবের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তৎকালীন মিশরীয়দের মতো একাধিক দেব-দেবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পরিবর্তে তারা একক দেবতা ‘আতেন’ বা ‘সূর্য চাকতি’র (সান ডিস্ক) পূজা করতেন। স্বামীর সঙ্গে তিনি প্রাচীন মিশরীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিত্তশালী সময়ে রাজত্ব করতেন বলে জানা যায়। ঐতিহাসিকদের একদলের মতে, স্বামীর মৃত্যুর পরে তিনি নেফারনেফারুয়াতেন নামে রাজত্ব করেছিলেন। তার পরবর্তী রাজাই তুতানখামুন ছিল কিনা, তা নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। মিশরের নারী ফারাও নেফারতিতির সাম্রাজ্য আমার্না শহরের পতন ঘটিয়ে বিস্তৃতি লাভ করে ঐতিহ্যবাহী শহর থেবসে। বহু উপাধিতে ভূষিত করা হয় নেফারতিতিকে। উর্বরতার রানী, প্রশংসনীয় এবং মহান সৌন্দর্যের দেবী, প্রেমময়, দুই হাতের অধিকারী দেবী, প্রধান রাজার প্রিয়তমা স্ত্রী, মিশরের ঊর্ধ্ব ও নিম্নভূমির রক্ষাকর্ত্রী- এমন আরও অসংখ্য নাম রয়েছে তার। তার একটি আবক্ষ মূর্তি তাকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। বার্লিনের ন্যুয়েস জাদুঘরে সংরক্ষিত মূর্তিটি প্রাচীন মিশরের আসল একটি ভাস্কর্যের প্রতিলিপি। প্রকৃত ভাস্কর্যের ভাস্কর ছিলেন মিশরের অধিবাসী থুতমোস, ১৯১২ সালে তার কারখানায় খুঁজে পাওয়া যায় নেফারতিতির মূর্তিটির অস্তিত্ব। প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য বাদেও মিশরীয়দের ভাস্কর্যে মুখের প্রভাব বোঝাতে এখনো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ানো হয় এই মূর্তিটির কথা।

সিমনিতা ভেসপুচি: উত্তর ইতালীর সেরা সুন্দরী বলে মনে করা হতো সিমনিতা ভেসপুচিই। এই সৌন্দর্যের কারণেই সান্দ্রো বত্তিচেল্লিসহ ফ্লোরেন্সের অনেক চিত্রশিল্পীরই চিত্রের মডেল হয়েছিলেন এ তরুণী। রেনেসাঁ যুগের ফ্লোরেন্সে ‘সুন্দরী সিমনিতা’ তিনি নামে পরিচিত ছিলেন। ২২ বছর বয়সে যক্ষ্মার কারণে তার মর্মান্তিক অকালমৃত্যু ইতালীয় শিল্পে আদর্শ সৌন্দর্যের এক চিরন্তন প্রতীক হিসেবে তার অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। ১৪৮০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বত্তিচেল্লির অঙ্কিত ‘দ্য বার্থ অফ ভেনাস’ চিত্রকর্মে মাঝখানে ভেনাসরূপে দাঁড়ানো নারীই হচ্ছেন ভেসপুচি। তিনি সেখানে ভেনাসের মডেল হিসেবে ছিলেন। আজকের দিনে কোনো জনপ্রিয় মডেলের দেখা পেলে সমলিঙ্গের সবাই যেমন তার মতো হতে চায়, ভেসপুচির বেলাতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তৎকালীন ইতালীয় নারীরা ফ্যাশনের জন্য তার অন্ধ অনুকরণেই অভ্যস্ত ছিলেন।