
মাদারীপুরে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, স্বামী আটক
প্রতিবেদক, পটুয়াখালী
প্রকাশ: সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫২

মানুষের জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত ওষুধই হয়ে উঠতে পারে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। পটুয়াখালীতে অধিকাংশ ফার্মেসিতে ওষুধ সংরক্ষণে মানা হচ্ছে না নির্ধারিত তাপমাত্রার নিয়ম। টিনশেড কিংবা বদ্ধ ঘরে অতিরিক্ত গরমের মধ্যেই রাখা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। অনেক দোকানে নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা, এমনকি তাপমাত্রা পরিমাপের যন্ত্রও। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, নির্ধারিত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ না করায় ওষুধের গুণগত মান ও কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এতে অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন রোগীরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় বাইরে প্রখর রোদ, ঘরের ভেতরেও গরমের তীব্রতা। শীতের আবহ শুরু হলেও তাপমাত্রার পারদ এখনো ঊর্ধ্বমুখী। বছরের দীর্ঘ সময়জুড়েই পটুয়াখালীতে তাপমাত্রা থাকছে ৩৩ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। অথচ জেলার অধিকাংশ ওষুধের দোকানে নেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।
অনেক ফার্মেসি চলছে টিনশেড কিংবা সাধারণ ঘরে। দোকানের সাধারণ তাকেই সাজিয়ে রাখা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ। কোথাও সরাসরি তাপের সংস্পর্শে, আবার কোথাও বদ্ধ ঘরে দিনের পর দিন সংরক্ষণ করা হচ্ছে ওষুধ।
অথচ ওষুধের প্যাকেটেই উল্লেখ থাকে সংরক্ষণের নির্দিষ্ট তাপমাত্রা। কোনো কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার নিয়ম আছে। আবার নাপা সিরাপসহ কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু পটুয়াখালীর অধিকাংশ ফার্মেসিতেই এসব নির্দেশনা অনুসরণে নেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী জেলায় ওষুধের দোকান রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫২৩টি। এর মধ্যে মাত্র চার থেকে পাঁচটি দোকানে রয়েছে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। ফলে অধিকাংশ দোকানে কী পরিবেশে ওষুধ সংরক্ষণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
দোকানিরাও স্বীকার করছেন, ওষুধ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। তাদের দাবি, বাড়তি বিদ্যুৎ বিল ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে সব দোকানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
চিকিৎসকদের মতে, নির্ধারিত তাপমাত্রার বাইরে দীর্ঘ সময় ওষুধ সংরক্ষণ করা হলে এর কার্যকর উপাদানের গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে তাপ ও আর্দ্রতার প্রভাবে কিছু ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ওষুধ সেবনের পরও রোগী প্রত্যাশিত ফল নাও পেতে পারেন।
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. জিয়াউল করিম বলেন, ওষুধ একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ওষুধ রাখা হলে এর কার্যকর উপাদানের গুণগত পরিবর্তন হতে পারে। ফলে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। রোগী নিয়ম অনুযায়ী ওষুধ সেবন করলেও প্রত্যাশিত ফল নাও পেতে পারেন। এতে রোগের জটিলতা বাড়তে পারে এবং চিকিৎসার সময় দীর্ঘায়িত হতে পারে। তাই প্রতিটি ফার্মেসিতে ওষুধের ধরন অনুযায়ী সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ওষুধ প্রশাসনকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে এবং নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজি বিভাগের শিক্ষক ডা. অপর্ণা বিশ্বাস ঋতু বলেন, ‘ওষুধের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে সেটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে তার ওপর। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় কিছু ওষুধের রাসায়নিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, ইনসুলিন ও তাপসংবেদনশীল তরল ওষুধের ক্ষেত্রে সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে ওষুধের কার্যকর উপাদান কমে যেতে পারে। তাই ওষুধের প্যাকেটে উল্লেখ করা সংরক্ষণ নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। ফার্মেসিতে তাপমাত্রা পরিমাপের যন্ত্র রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা উপযুক্ত শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরাসরি সূর্যের আলো ও অতিরিক্ত আর্দ্রতা থেকে ওষুধ দূরে রাখতে হবে।’
এদিকে, ওষুধের গুণগত মান ও সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছেন পটুয়াখালীর ওষুধ প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়ক সুমন বিশ্বাস।
ওষুধ কেনার আগে শুধু মেয়াদ যাচাই করলেই হবে না, সেটি কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেদিকেও নজর দেয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের। একই সঙ্গে ফার্মেসিগুলোতে নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।