
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই এই দেশের সন্তান: প্রধানমন্ত্রী
নাসির উদ্দিন লিটন, ভোলা
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৩

ভোলার নদীপাড়ে সারি সারি জেলে নৌকা। ছবি: সময় সংবাদ
৫৩ হাজার মেট্রিক টন ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা খরচ করল মৎস্য বিভাগ। প্রকল্প শেষে উৎপাদন বাড়ার পরিবর্তে উল্টো কমেছে প্রায় ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। শুধু উৎপাদনই কমেনি, কমেছে ইলিশের আকার ও ওজন।
এদিকে সরকারের অকার্যকর পদক্ষেপ ও অনিয়ন্ত্রিত আহরণের খেসারত দিতে হচ্ছে উপকূলের ইলিশ শিকারি ও ব্যবসায়ীদের। দেনার বোঝা মাথায় নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন কেউ কেউ। উপার্জন কমে যাওয়ায় জীবন-জীবিকার সংকটে দিশেহারা ভোলার দুই লক্ষাধিক জেলে। টানা লোকসান আর জেলেদের দেওয়া দাদন ফেরত না পেয়ে থমকে গেছে ভোলার ইলিশকেন্দ্রিক অর্থনীতি।
উৎপাদন বাড়াতে মা ইলিশ ও জাটকা সুরক্ষা, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানে ‘ইলিশ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পে খরচ প্রায় ২৩০ কোটি টাকা খরচ করা হয়। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ সালে যখন প্রকল্প শুরু হয় তখন ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। লক্ষ্য ছিল প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ৬ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত করা। কিন্তু প্রকল্প শেষে ইলিশ আহরণ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ মেট্রিক টনে। বাড়ার পরিবর্তে উল্টো উৎপাদন কমেছে ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। এ ব্যর্থতার জন্য প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দায়ী করছেন জেলে নেতারা।
ভোলার ইলিশা মাছঘাটের ব্যবসায়ী মো. হালান মাঝি জানান, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য প্রকল্প থেকে গরু দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই গরু দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক দলের নির্ধারিত ব্যক্তিদের মধ্যে। ফলে জেলেরা এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিনের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভেস্তে গেছে। কার্যক্রম ছিল অনেকটা লোকদেখানো। নদী থেকে অবৈধ জাল নির্মূল করতে পারেনি। মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা সংরক্ষণ যথাযথভাবে হয়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুফল থেকে জেলেরা বঞ্চিত হয়েছেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির ভোলা সদর উপজেলা সভাপতি মো. এরশাদ ফরাজী জানান, বরাদ্দের টাকার অপব্যবহার করায় ইলিশের উৎপাদন বাড়ার পরিবর্তে কমেছে। যেসব খাতে বরাদ্দ ব্যয় করা হয়েছে সেগুলো সঠিক ছিল না। অযথা ব্যয়ের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্প।
একসময়ে মেঘনায় জাল ফেললেই ধরা পড়ত ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালি ইলিশ। সেই ইলিশকে ঘিরে লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। মাছ ধরা, বেচাকেনার জন্য আড়ত, বরফকল, পরিবহনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। কিন্তু জাল, ট্রলার, জেলে বাড়লেও কমে গেছে ইলিশ। মৌসুম শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে কপালে ভাঁজ ভোলার শিবপুর মাছঘাটের আড়তদার আরিফুল ইসলামের। ইলিশের ধারাবাহিক মন্দার মাঝে চলতি মৌসুমের চিত্র যেন আরও ভয়াবহ। শুধু আরিফের আড়তেই বিক্রি কমেছে ৪০ শতাংশ। অনেক আড়তে এর পরিমাণ আরও বেশি। জেলার অর্ধশত ঘাটের চিত্র একই। ফলে জাল-নৌকায় আটকে যায় কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ, সংকুচিত হচ্ছে ব্যবসার পরিধি। এ অবস্থায় উপকূলের ইলিশকেন্দ্রিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
আরিফ জানান, বর্ষার মৌসুমে অনেক ইলিশ হতো। এবারের চিত্র ভিন্ন। মা ইলিশ রক্ষায় যখন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তখনও মেঘনা নদীতে ইলিশ শূন্য ছিল।
তিনি আরও জানান, বিগত চার-পাঁচ বছরই ধারাবাহিকভাবে ইলিশের পরিমাণ কমছে। গত বছরের তুলনায় এ মৌসুমে কমেছে প্রায় ৪০ ভাগ ইলিশ।
জেলার সর্ববৃহৎ মাছঘাট চরফ্যাশনের সামরাজ। ১২০টি আড়ত এ ঘাটে, যা জেলার ইলিশকেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র। নদী ও সমুদ্র উভয়ের মাছ ওই ঘাটে বেচাকেনা হয়।
এ ঘাটের ইলিশ ব্যবসায়ী মো. বাবুল জানান, তার আড়তে ২০২৩ সালে ৮ কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন। পরবর্তী বছর ২০২৪-এ তা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটিতে। ২০২৫ সালে ৪ কোটি। ২০২৬ সালে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫০ লাখ টাকার ইলিশ। তার ভাষ্য, ইলিশের অভাবে এখন পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে। ব্যাংক ও মোকামে অনেক দেনা। কীভাবে পরিশোধ করবেন তা অজানা।
সামরাজ ঘাটের ইলিশ চালানি (মোকামে রপ্তানিকারক) আবুল কালাম জানান, ২০২১ সাল থেকে পরবর্তী ৩ বছর ইলিশ রপ্তানির পরিমাণ প্রায় একই ছিল। কিন্তু এর পরবর্তী সময়ে ক্রমেই ইলিশ কমছে। ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালে কমেছে প্রায় ৫০ ভাগ। এতে জেলে ও ব্যবসায়ীদের দেনা দিন দিন বাড়ছে। একই তথ্য দিলেন সামরাজ ঘাটের অন্য আড়তদাররা। ইলিশের অস্তিত্ব রক্ষায় সবাইকে আরও সচেতন হওয়ার দাবি তাদের।
মেঘনায় ইলিশ না পাওয়ায় আয় কমে যায় ভোলা সদর উপজেলার চর আনন্দ গ্রামের সিরাজ মাঝির। সংসার চালানো ও নদীতে নামার খরচ জোগাতে গিয়ে মহাজন ও মুদিদোকানে দেনা হন ১০ লাখ টাকা। পাওনাদারের ভয়ে জন্মভিটা ফেলে রাতের আঁধারে ঘর ছাড়েন তিনি। মেঘনা পাড়ের সিরাজ মাঝি এখন ঢাকার নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন বলে জানা স্বজনরা। সিরাজের রেখে যাওয়া ভিটা এখন পাহারা দিচ্ছেন পাওনাদাররা।
শুধু সিরাজ মাঝি নন, একই গ্রামের মহসিন মীর ১৬ লাখ টাকা দেনা মাথায় নিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মাহমুদ মাঝি ১১ লাখ, কামরুল মাঝি প্রায় ১০ লাখ দেনার চাপে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। জেলেদের দাবি, সাগরে ট্রলিং বোটে নির্বিচারে মাছ মারা, নিষিদ্ধ বেহুন্দি ও চরঘেরা জালের কারণেই ইলিশ হারিয়ে যাচ্ছে।
জেলা মৎস্য অফিসার মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন জানান, প্রকল্পের কার্যক্রম চলাকালে ইলিশ মোটামুটি ছিল। এখন কিছুটা কম। ইলিশ যেন সারা বছর পাওয়া যায় সেই লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন। ইলিশ কমার পেছনে মনুষ্যসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুটি কারণ আছে। এ জন্য মা ইলিশ রক্ষা করে ডিম ছাড়া নিশ্চিত করা ও জাটকা নিধন বন্ধের মাধ্যমে টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। এ ছাড়া ডুবোচরের কারণে যে সমস্যা হচ্ছে সে সমস্যা সমাধান করতে হবে।
যে ইলিশকে ঘিরে ভোলার লাখো মানুষের স্বপ্ন আর জীবিকা, সেই ইলিশই এখন সংকটে ফেলেছে তাদের জীবন। প্রশ্ন উঠছে—বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কেন মিলল না কাঙ্ক্ষিত সুফল? রুপালি ইলিশ রক্ষা আর জেলেদের জীবিকা বাঁচাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ চান সংশ্লিষ্টরা।