
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাইকা প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৭:০

বিআরটিএর নির্দেশনার পর চাহিদা বেড়েছে নম্বরপ্লেটের। ছবি: সময় সংবাদ
মোটরসাইকেলের সামনে ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত নিয়ম মেনে নম্বরপ্লেট স্থাপনের নির্দেশনা জারির পর রাজধানীসহ দেশজুড়ে বেড়েছে এর বেচাকেনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে বিক্রির প্রচার। তবে বাড়তি চাহিদার সঙ্গে বেড়েছে দাম। আবার নির্দেশনায় নির্ধারিত উপকরণের বাইরে তৈরি প্লেটও বিক্রি হচ্ছে বাজারে। ফলে দাম, মান ও নির্ধারিত নিয়ম মেনে প্লেট তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন মোটরসাইকেল চালকরা।
সরেজমিনে রাজধানীর বংশাল ও কাটাবন এলাকায় দেখা যায়, মোটরসাইকেলের সামনের নম্বরপ্লেট কিনতে বিভিন্ন দোকানে ভিড় করছেন বাইকাররা। কেউ তৈরি করা প্লেট কিনছেন, আবার কেউ মোটরসাইকেলের মডেল অনুযায়ী মাপ দিয়ে তৈরি করিয়ে নিচ্ছেন।
প্লেট তৈরির পাশাপাশি সেটি মোটরসাইকেলে লাগানোর ব্যবস্থাও করছেন বিক্রেতারা। তবে প্লেটের উপকরণ, আকার ও সংযোজনের ধরন অনুযায়ী একেক দোকানে একেক রকম দাম চাওয়া হচ্ছে।
বাজার ঘুরে স্টেইনলেস স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, টিন ও প্লাস্টিকের তৈরি বিভিন্ন ধরনের নম্বরপ্লেটের ব্যবহার দেখা গেছে। মান ও প্রকারভেদে এসব নম্বর প্লেট ১৫০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
তবে বিআরটিএর নির্দেশনায় সামনের নম্বরপ্লেট তৈরিতে স্টেইনলেস স্টিল অথবা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ফলে তুলনামূলক কম দামের প্লাস্টিকের প্লেট কিনে নির্দেশনা পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন অনেক বাইকার।
মোটরসাইকেল চালক সাফিন বলেন, ‘নম্বরপ্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লাগাতে হবে। কিন্তু বাজারে এসে দেখছি, একই ধরনের প্লেটের দাম একেক দোকানে একেক রকম। কোনটি নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি, আর কোনটি শুধু দেখতে ভালো, তা বোঝাও কঠিন। কেনার আগে তাই কয়েকটি দোকানে খোঁজ নিচ্ছি।’
আরেক মোটরসাইকেল চালক তুর্য বলেন, ‘প্লেটের দাম এক বিষয়, আবার মোটরসাইকেলে লাগানোর জন্য আলাদা খরচও আছে। আমার বাইকে সামনে প্লেট বসানোর নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। তাই ক্ল্যাম্প তৈরি করতে হবে। সব মিলিয়ে যে খরচ হচ্ছে, তা আগে ধারণা করিনি।’
বাজারে প্লেটের দাম বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও করছেন ক্রেতারা। তাদের দাবি, আগে যে প্লেট দেড়শ থেকে ২০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম চাওয়া হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। বাধ্যতামূলকভাবে লাগানোর নির্দেশনা আসার পর চাহিদা বেড়েছে, আর সেই সুযোগেই কিছু বিক্রেতা দাম বাড়িয়েছেন।
মোটরসাইকেল চালক সাব্বির বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাগাতেই হবে। এ কারণে সবাই একসঙ্গে কিনতে আসছেন। কয়েকটি দোকানে দাম জিজ্ঞেস করে দেখেছি, মোটামুটি ভালো মানেরগুলো কোথাও ৩০০ টাকা, কোথাও ৫০০ টাকা চাওয়া হচ্ছে। দাম নির্ধারণের কোনো নিয়ম থাকলে ক্রেতাদের জন্য সুবিধা হতো।’
মোটরসাইকেল চালক প্রান্ত বলেন, ‘শুধু প্লেট কিনলেই হচ্ছে না, সেটি ঠিকমতো লাগানোও জরুরি। আবার নির্দেশনায় স্টেইনলেস স্টিল বা অ্যালুমিনিয়ামের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কম দামের প্লেট কিনলে সেটি নিয়মের মধ্যে পড়বে কি না, তা নিশ্চিত হতে পারছি না। পরে আবার পরিবর্তন করতে হলে খরচ দ্বিগুণ হবে।’
বিক্রেতারা বলছেন, নির্দেশনা জারির পর নম্বরপ্লেটের চাহিদা আগের তুলনায় বেড়েছে। আগে অল্পসংখ্যক ক্রেতা প্লেট কিনলেও এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাগানোর জন্য প্রতিদিনই আসছেন অনেক বাইকার। তবে সব প্লেটের উপকরণ ও তৈরির খরচ এক নয়। মোটরসাইকেলের ধরন অনুযায়ী সংযোজনের ব্যবস্থাও আলাদা হওয়ায় দামে পার্থক্য হচ্ছে।
বিক্রেতা জুলহাস বলেন, ‘এখন ক্রেতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। কেউ স্টেইনলেস স্টিলের প্লেট নিচ্ছেন, কেউ অ্যালুমিনিয়ামের। আবার কেউ কম দামের প্লাস্টিকের প্লেট খুঁজছেন। উপকরণ ও কাজের ধরন অনুযায়ী খরচ আলাদা হয়। সব প্লেটের দাম এক রাখা সম্ভব নয়।’
আরেক বিক্রেতা মো. সিয়াম বলেন, ‘অনেক মোটরসাইকেলের সামনে প্লেট লাগানোর ব্যবস্থা নেই। সে ক্ষেত্রে ক্ল্যাম্প বানাতে হয়, যা তৈরি করতে সময় ও খরচ লাগে। কারও বাইকে সহজে লাগানো যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে বাড়তি কাজ করতে হয়। তাই প্লেটের দাম আর লাগানোর খরচ আলাদা করে হিসাব করতে হয়। মানভেদে কোনো কোনো ক্লাম্প ১৫০ থেকে ৪০০ টাকা নেয়া হচ্ছে।
তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, কিছু দোকানে প্লেটের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি সংযোজনের জন্যও বেশি টাকা চাওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে এক বিক্রেতা জানান, ‘কিছু বাইকে প্লেট লাগাতে ঝামেলা হয়, তাই খরচ বাড়ে। তবে কেনার আগেই ক্রেতাকে প্লেটের দাম, ক্ল্যাম্প ও লাগানোর খরচ জানিয়ে দেয়া উচিত। এতে পরে ভুল বোঝাবুঝি হয় না।’
এদিকে, বংশালে দোকানের পাশাপাশি রাস্তার পাশে টেবিল-টুল বসিয়ে বিক্রি হচ্ছে মোটরসাইকেল ও স্কুটারের নম্বরপ্লেট। রাস্তায় টুল বসিয়ে নম্বর প্লেট তৈরি করা আলিফ বলেন, আমি ১৫০ টাকা করে নম্বর প্লেট বিক্রি করছি। শিটের ওপর লেমেনেটিং করা স্টিকার লাগিয়ে দিচ্ছি। বাইকে নম্বরপ্লেট সেট করে দিলে অতিরিক্ত ৩০-৫০ টাকা চেয়ে নিচ্ছি।
দোকানের বাইরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জমে উঠেছে নম্বরপ্লেটের ব্যবসা। বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ২০০ টাকা থেকে শুরু করে এক হাজার টাকা পর্যন্ত দামে নম্বরপ্লেট বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে। কোথাও শুধু প্লেটের দাম, আবার কোথাও তৈরি ও সংযোজনসহ প্যাকেজের কথা বলা হচ্ছে। তবে অনলাইনে অর্ডার দেয়ার ক্ষেত্রে পণ্যের মান ও বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
মোটরসাইকেল চালক ছোটন বলেন, ‘অনলাইনে কম দামে প্লেটের বিজ্ঞাপন দেখেছি। কিন্তু ছবিতে যে উপকরণ দেখানো হচ্ছে, হাতে পাওয়ার পর সেটিই পাব কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আবার অগ্রিম টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই সরাসরি দোকান থেকে দেখে কেনার চেষ্টা করছি।’
অনলাইনে নম্বর প্লেট বিক্রি করা ব্যবসায়ীর সাদমান বলেন, ‘অনেকে বাসায় বসে অর্ডার দিতে চান। আমরা প্লেটের ধরন ও দাম জানিয়ে অর্ডার নিই। তবে ক্রেতাদেরও উচিত বিক্রেতার পরিচয় যাচাই করা এবং কী উপকরণে প্লেট তৈরি হচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া।’
ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই অপরিচিত পেজে অগ্রিম টাকা দেয়ার আগে সতর্ক হতে হবে।
নম্বরপ্লেটের বাড়তি চাহিদাকে ঘিরে যখন বাজারে চলছে বেচাকেনা, তখন এ খাতে ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছেন তরুণ সাদমান সাকিব। এই মোটরসাইকেল চালক বলছেন, বাজারের সিন্ডিকেট ভেঙে কম দামে মানসম্মত নম্বরপ্লেট সরবরাহ করাই তার উদ্যোগের লক্ষ্য।
বিআরটিএর নির্দেশনা প্রকাশের দিন নিজের মোটরসাইকেলের জন্য নম্বরপ্লেট তৈরি করতে খোঁজ নিতে বের হন সাদমান। অনলাইনে নির্ভরযোগ্য সেবা খুঁজে না পাওয়া এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে নম্বরপ্লেট তৈরির নানা সীমাবদ্ধতা তাকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
সাদমান বলেন, নম্বরপ্লেট তৈরির প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন খরচ সম্পর্কে ধারণা নিতে কয়েকজন কামারের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি ভারতে কীভাবে নম্বরপ্লেট তৈরি হয়, সে বিষয়েও খোঁজ নেন। পরে কয়েকজন বন্ধু ও পরিচিতের সঙ্গে আলোচনা করে নম্বরপ্লেট তৈরির কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে শুরুতেই উৎপাদন ও সরবরাহে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে তাকে। সাদমান জানান, প্রথম দিনের অর্ডারের ২০ শতাংশও এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। পণ্যের মান ও নিখুঁতভাবে তৈরির বিষয়টি নিশ্চিত করতে কয়েকটি খুঁটিনাটি নিয়ে কাজ চলছে।
সাদমান জানান, মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেটের পাশাপাশি স্কুটারের প্লেটের জন্যও আগ্রহ দেখাচ্ছেন অনেকে। তবে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় এখনো স্কুটারের প্লেট তৈরির কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তার পরিকল্পনা, সরাসরি বিক্রির পরিবর্তে হোম ডেলিভারির মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেয়া।
সাদমান বলেন, মানুষ কম দামে ভালো মানের পণ্য চাইছেন, বিষয়টি তাকে আনন্দিত করেছে। তবে ক্রেতাদের সরাসরি এসে পণ্য কেনার সুযোগ নেই। হোম ডেলিভারির মাধ্যমেই নম্বরপ্লেট সরবরাহের পরিকল্পনা করেছেন তারা। এ ক্ষেত্রে অর্ধেক অর্ডারে ক্যাশ অন ডেলিভারি (সিওডি) এবং বাকি অর্ধেক অর্ডারে বিকাশের মাধ্যমে অগ্রিম অর্থ নেয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন।
সাদমান আরও জানান, বিআরটিএতে কর্মরত ১৫ থেকে ২০ জন ব্যক্তি তার কাছে নম্বরপ্লেটের অর্ডার দিয়েছেন। ঢাকায় বিআরটিএতে কর্মরত ব্যক্তিরাও তার পরিকল্পনা শুনে আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং চূড়ান্ত পণ্য তৈরি হলে তাদের কাছে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
প্রথমবার পণ্য সরবরাহের দিন সবার আগে বিআরটিএতে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সাদমানের। সেখানে নম্বরপ্লেট দেখানোর পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টও দেবেন তিনি। তার আশা, উদ্যোগটির চূড়ান্ত ফলাফল ক্রেতাদের ভালো লাগবে।
বিআরটিএর জরুরি গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ অনুযায়ী মোটরসাইকেলের পেছনে আরএফআইডি সংযুক্ত রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নম্বরপ্লেট ব্যবহার করতে হয়। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদার করতে এবার মোটরসাইকেলের সামনের দিকেও নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মালিকদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত মান অনুযায়ী ম্যানুয়াল নম্বরপ্লেট লাগাতে হবে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, সামনের নম্বরপ্লেট তৈরিতে স্টেইনলেস স্টিল অথবা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করতে হবে। প্লেটের পটভূমি হবে সাদা, আর বাংলা অক্ষর ও সংখ্যা লিখতে হবে কালো রঙে। নম্বরপ্লেটে কোনো নকশা বা শোভাবর্ধন করা যাবে না। স্কুটারের ক্ষেত্রে প্লেটের দৈর্ঘ্য ২০০ মিলিমিটার ও প্রস্থ ১০০ মিলিমিটার হতে হবে। অন্য মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য ২৮৫ মিলিমিটার ও প্রস্থ ৫০ মিলিমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। উভয় ধরনের প্লেটেই অক্ষর ও সংখ্যার উচ্চতা কমপক্ষে ২০ মিলিমিটার রাখতে হবে।
আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত নিয়ম মেনে সামনের নম্বরপ্লেট স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছে বিআরটিএ। সময়সীমার মধ্যে নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
নির্দেশনা বাস্তবায়নের এই সময়ে বাইকারদের সামনে নতুন খরচের বোঝা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নম্বরপ্লেটের উপকরণ, দাম ও সংযোজন নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তাই নির্ধারিত মান অনুসরণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে দাম ও পণ্যের মান তদারকি এবং ক্রেতাদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়ার দাবি জানাচ্ছেন মোটরসাইকেল চালকরা।