
ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজ নবায়নে বিআরটিএর নতুন নির্দেশনা
মায়মুনা হায়দার চৌধুরী
প্রকাশ: রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৪৮
আইন আছে, আদালতও আছে। কিন্তু যার মুখে ভাষা নেই, পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েও বিচার পাওয়ার পথ তার জন্য রীতিমতো দুর্ভেদ্য। অভিযোগ দায়ের থেকে শুরু করে আদালতে সাক্ষ্য প্রদান–প্রতিটি ধাপেই বাক্প্রতিবন্ধীদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রতিটি থানা ও আদালতে ‘যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ’ নিয়োগ দেয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি রূপগঞ্জে ১২ বছরের এক বাক্প্রতিবন্ধী শিশু নিজ বাড়ির পাশের মাঠে গিয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়। নির্যাতনের যে ট্রমা, তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা অন্যদের কাছে তুলে ধরা। কথা বলতে না পারায় ছয় মাস ধরে নীরবতার দেয়ালে আটকে আছে শিশুটির বিচার পাওয়ার আকুতি।
ঘটনার পর মামলা করতে গিয়েও তৈরি হয় জটিলতা। কারণ, ঘটে যাওয়া বর্বরতার কথা তুলে ধরার প্রথাগত ভাষা জানা নেই তার।
রূপগঞ্জ উপজেলা প্রতিবন্ধী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি জহিরুল ইসলাম বলেন, “মেয়েটির বাবা নেই, মা-ও প্রতিবন্ধী। মেয়েটি নিজেও ‘মাল্টিপল ডিসঅ্যাবল’ (বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধী)। থানায় যখন অভিযোগ দিই, তখন একে বোঝাতে অনেক সমস্যা হয়েছে। কারণ, সে তো ঠিকমতো সাড়া দিতে পারে না।”
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সহায়তায় মামলা হলেও প্রধান আসামি রনি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজন সাপেক্ষে এনজিও থেকে ইশারা ভাষা (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ) বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেলের প্রধান মো. আকতার হোসেন বলেন, ‘ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সঙ্গে ১১টি এনজিওর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) রয়েছে। কোনো ভিকটিম কী বোঝাতে চাচ্ছে–সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন হলে আমরা তাদের সহায়তা নিই।’
তবে স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় বলে জানান আইনি বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্লাস্টের লিগ্যাল স্পেশালিস্ট আয়েশা আক্তার বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিচার ব্যবস্থার মাঝে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করবেন একজন সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ এক্সপার্ট অথবা তার পরিবারের সদস্যরা, যারা এই ইশারাগুলো বোঝেন। তা না হলে তিনি কী বোঝাতে চাইছেন তা আইনজীবী বুঝতে পারবেন না, আর আইনজীবী না বুঝলে আদালতকেও বোঝানো সম্ভব নয়।’
এমন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন অধিকারকর্মীরা। উইমেন উইথ ডিসঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, ‘এ ধরনের মামলায় ক্যামেরা ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যেখানে ভুক্তভোগী শিশু ও তার স্বজনরা থাকবে এবং আইনজীবীরা দূর থেকে তা পর্যবেক্ষণ করবেন। তা ছাড়া মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই যদি পাঠ্যক্রমে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তবে সাধারণ মানুষও প্রতিবন্ধীদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারবে।’
প্রতিবন্ধী ভুক্তভোগীদের নীরব সাক্ষ্য যাতে আদালতে আইনি ভিত্তি পায়, সে জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, ‘প্রতিটি থানা, আদালত এবং সরকারি লিগ্যাল আইড অফিসে স্থায়ীভাবে ইশারা ভাষা বিশেষজ্ঞের ব্যবস্থা থাকা উচিত। এটিই চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত, যাতে সবাই স্পষ্টভাবে তথ্য আদান-প্রদানের এই সুযোগটি নিতে পারেন।’
বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী নারী বা শিশুর জন্য বিচার পাওয়ার লড়াই কেবল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তা পুরোপুরি নির্ভর করে যোগাযোগের ভাষার ওপর। বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ভাষার এই প্রতিবন্ধকতা দ্রুত দূর করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।