
ইউক্রেনকে চাপ, রাশিয়ার প্রতি নমনীয়তা— ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য কী?
আবদুল আজিজ জুয়েল
প্রকাশ: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:১৬

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইলন মাস্ক। ছবি: সংগৃহীত
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর জন্য মার্কিন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবস্থা স্টারলিংকের গতি সীমিত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এবারই প্রথম নয়। এর আগে বাইডেন প্রশাসনও তাদের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে একাধিকবার বিভিন্ন দেশে স্টারলিংক সেবা চালু বা বন্ধ করার নির্দেশ বা অনুরোধ জানিয়েছিল। রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে সংবাদ সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালের জুনে এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ আগ্রাসনের পর ট্রাম্প প্রশাসন ইলন মাস্ককে ইরানে স্টারলিংক ইন্টারনেট সেবা চালু করার অনুরোধ জানায়। ইরানের সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের ইন্টারনেট ও যোগাযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতেই ওই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি ইউক্রেনে স্পেসএক্সের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবায় বিধিনিষেধ আরোপ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মার্কিন সরকারের সঙ্গে মাস্কের সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। মাস্কের মালিকানাধীন এই প্রযুক্তি ব্যবস্থা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, কীভাবে মার্কিন প্রশাসন নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর অভূতপূর্বভাবে নির্ভর করছে। তবে মিত্রদেশ ইউক্রেনের ওপর স্টারলিংক ব্যবহারের সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ ইউরোপীয় নেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তাদের মতে, এই মুহূর্তে নির্ভরযোগ্য বিকল্প না থাকায় ইউরোপের সামরিক সুরক্ষায় নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি জানান, স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ স্টারশিল্ড-এর গতি ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে দেশটির সামরিক ড্রোন পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে। তিনি আরও জানান, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা পেতে ইউক্রেন যে স্টারলিংক ব্যবহার করত, সেটির গতিও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টারশিল্ডের গতি কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশটি হোয়াইট হাউসের ভেতর থেকেই এসেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন গতি কমানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও তারা সরাসরি এই নির্দেশ দিয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেনি।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের জবাবে ট্রাম্পের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করেছে। ট্রাম্প জানান, ইউক্রেনের স্টারলিংক সমস্যা নিয়ে মাস্কের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। তবে তিনি বলেন, 'যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে, তবে আমি তা সমাধান করে দেব।'
ওয়াশিংটনে ইউক্রেনীয় দূতাবাসের মুখপাত্র হ্যালিনা ইউসিপিউক বলেন, ইউক্রেনের মূল অগ্রাধিকার হলো অতি দ্রুত এই সেবার স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা, কারণ এর ওপর তাদের নাগরিকদের জীবন নির্ভর করছে।
স্পেসএক্স এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি। তবে চলতি সপ্তাহের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ইলন মাস্ক লেখেন, ‘স্টারশিল্ড ব্যবস্থাটি মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ও মালিকানাধীন। এর গতি বা ব্যবহারের যেকোনো সীমা নির্ধারণের ক্ষমতা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং চূড়ান্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হাতে।’
ডেমোক্রেটিক দলের মার্কিন আইনপ্রণেতা জেসন ক্রো শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) এই বিধিনিষেধের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তিনি সতর্ক করে জানান, স্পেসএক্সের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘অনির্বাচিত বিলিয়নিয়ার বা কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কী ভালো তা ঠিক করতে পারে না।’
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগের জন্য স্টারলিংক এক প্রকার ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করছে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর মতে, স্পেসএক্সের এই প্রযুক্তির সমকক্ষ এই মুহূর্তে বিশ্ববাজারে আর কিছুই নেই। রেডিও সিগন্যাল জ্যামার বা জ্যামিং প্রতিরোধী এই স্টারশিল্ড গ্রাহকযন্ত্রগুলো ইউক্রেনের ড্রোনে গাইডেন্স সিস্টেম হিসেবে এবং রুশ সীমানার গভীরে ড্রোন পরিচালনায় পাইলটদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তায় একটি বেসরকারি কোম্পানির প্রধান হিসেবে ইলন মাস্কের এই একচ্ছত্র প্রভাব অনেক সময় প্রশ্ন তুলেছে, প্রকৃতপক্ষে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তগুলো কে নিচ্ছেন?
স্যাটেলাইট শিল্পভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘সামিট রিজ গ্রুপ’-এর সভাপতি আরম্যান্ড মিউসি বলেন, ‘মাস্ক একজন ব্যবসায়িক নির্বাহী হওয়ার কথা, যিনি সরকারি চুক্তির আওতায় কাজ করবেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি বড় বড় পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি এমন একজন অস্পষ্ট বা রহস্যময় ব্যক্তি যে আপনি বুঝতে পারবেন না তাঁর সিদ্ধান্তগুলো কি কোনো ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি থেকে আসছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো প্রভাব কাজ করছে।’
এর আগেও মাস্ক ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারে রাশ টেনেছিলেন। রয়টার্সের একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেন যেসব এলাকা রাশিয়ার হাত থেকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছিল, সেসব এলাকায় হঠাৎ স্টারলিংক সেবা বন্ধ করার নির্দেশ দেন মাস্ক। এতে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারাও বেশ অবাক হয়েছিলেন।
মাস্ক প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছিলেন যে ২০২২ সালে ক্রিমিয়ার সেবাস্তোপোল বন্দরে রুশ নৌবহরে হামলা চালাতে ইউক্রেনের করা স্টারলিংক চালুর অনুরোধ তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, কোনো বড় ধরনের যুদ্ধাপরাধ বা যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
সাবেক পাঁচ কর্মকর্তা জানান, নীতি বাস্তবায়নে বাইডেন প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে মাস্কের সহায়তার ওপর নির্ভর করেছে। বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্পেসএক্সের সঙ্গে সমন্বয় করে শত্রুপক্ষের স্টারলিংক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেন এবং মিত্রদের জন্য সেবার আওতা বাড়াতেন।
পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে হওয়া এসব আলোচনায় মূলত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর স্টারলিংক ব্যবহার বন্ধের ওপর জোর দেওয়া হতো। বাইডেন প্রশাসন স্পেসএক্সের সঙ্গে বেশ কিছু গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করে জানিয়েছিল যে হুতি ও হিজবুল্লাহ চোরাই বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে আনা স্টারলিংক টার্মিনাল ব্যবহার করছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতের সময় গোয়েন্দা সূত্রে মার্কিন প্রশাসন জানতে পারে হিজবুল্লাহ স্টারলিংক ব্যবহার করছে। ২০২৪ সালে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সময়ও একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দেয়। দুই ক্ষেত্রেই মার্কিন প্রশাসন স্পেসএক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই টার্মিনালগুলো শনাক্ত ও বন্ধ করার অনুরোধ জানায়। এতে অন্তত্য কিছু টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগে জমা দেওয়া এক নথিতে স্পেসএক্স জানিয়েছিল, তারা মার্কিন সরকারের নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পরপরই বাইডেন প্রশাসন স্পেসএক্সকে ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য স্টারলিংক সেবা প্রসারের চাপ দেয়। এছাড়া ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে হিজাব পরাকে কেন্দ্র করে মাহসা আমিনের মৃত্যুর পর ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে বাইডেন প্রশাসন স্পেসএক্সকে ইরানে ইন্টারনেট চালু করার নির্দেশ দেয়। মার্কিন প্রশাসনের সহায়তায় সেই সময় বেশ কিছু স্টারলিংক টার্মিনাল গোপনে ইরানে পাঠানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে ট্রাম্প প্রশাসনও প্রায় একই পথ অনুসরণ করে। ২০২৫ সালের জুন এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনার পর ট্রাম্প প্রশাসন মাস্ক ও স্পেসএক্সের সঙ্গে ইরানে স্টারলিংক পৌঁছে দেওয়া এবং তা সক্রিয় করার বিষয়ে আলোচনা করে। তবে ঠিক কতগুলো টার্মিনাল সেখানে সক্রিয় করা হয়েছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সরকার ইরানে হাজার হাজার স্টারলিংক টার্মিনাল পাঠিয়েছে।