
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে পতন, দেশে ভরি কত?
বাণিজ্য ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ৬:৫৭

‘ডিজিটাল ডিসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ শীর্ষক সেমিনারে কথা বলছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান। ছবি: সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়াতে ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে এবং শিগগিরই সেটি জনসাধারণের মতামতের জন্য কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে আইপিওর ক্ষেত্রে নিরীক্ষা ও আর্থিক তথ্য যাচাই জোরদার, ডাইরেক্ট লিস্টিং বিধিমালা সহজ করা, ডেরিভেটিভস বাজার চালু এবং ওপেন-অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডের বিকাশে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিসেপশন অ্যান্ড স্ক্যাম অ্যালার্ট’ শীর্ষক সেমিনারে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান এসব কথা বলেন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বাজারসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করে এমন নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে বাজারের বাস্তব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, প্রস্তাবিত আইপিও নীতিমালায় কোম্পানির নিরীক্ষা ও আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে, যাতে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, বিদ্যমান নিয়মে পুঞ্জীভূত লোকসানের বিষয়ে যে কঠোর শর্ত রয়েছে, তা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিমেন্ট ও ইস্পাত কারখানা এবং হোটেলের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগনির্ভর প্রকল্পে ব্যবসার শুরুর দিকে লোকসান হতে পারে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তালিকাভুক্তির শর্তে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এছাড়া আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে আগের ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেয়া হচ্ছে।
বাজারের মূলধন ও গভীরতা বাড়াতে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং বড় কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির আওতায় আনার বিষয়ে কাজ চলছে। যেসব কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার অথবা মোট সম্পদের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি, তাদের সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে অতীতে সংঘটিত অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধে আইপিও ও ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানি বাছাই এবং যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগপণ্য চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরে মাসুদ খান বলেন, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) আগামী ছয় মাসের মধ্যে ডেরিভেটিভস বাজার চালুর লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলেছে। পরবর্তী সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেও এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন এবং রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রিটস) চালুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এসব বিনিয়োগপণ্য চালু হলে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে এবং পুঁজিবাজারের পরিধি সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উন্নয়নে ওপেন-অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডকে ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। এ খাতে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মিউচুয়াল ফান্ড এজেন্ট তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেটের (বিআইসিএম) মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন দিয়ে এসব এজেন্ট তৈরি করা হবে। পাশাপাশি লাইসেন্সপ্রাপ্ত আর্থিক পরামর্শক তৈরির জন্যও নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
ভারতের মিউচুয়াল ফান্ড খাতের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্টদের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছে মিউচুয়াল ফান্ডের সেবা পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের পেশাদার ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে বিশেষ তহবিলের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং এর আকার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আগামী ৩০ নভেম্বর এ তহবিলের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তহবিলের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি এর আকার সম্প্রসারণেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক সমাধানের ব্যাপারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পুঁজিবাজারকে প্রভাবিত করছে উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেন, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ ও পুনঃতফসিল করা ঋণের চাপ ঋণের ব্যয় বাড়াচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদের হার দ্রুত কমানো কঠিন হচ্ছে, যা পুঁজিবাজারের বিকাশেও প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহের মতো বিষয়গুলোর প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়ে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধ এবং আর্থিক তথ্য যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। দ্রুত ধনী হওয়ার লোভ এবং ক্ষতির আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা বিনিয়োগকারীদের ফাঁদে ফেলছে। কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে শুধু মুনাফার অঙ্কের ওপর নির্ভর না করে পরিচালন কার্যক্রম থেকে সৃষ্ট নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুনাফা একটি ধারণা, কিন্তু নগদ অর্থই বাস্তবতা।’ কোনো কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা বুঝতে তার ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্ট বিশ্লেষণ করা জরুরি। বিনিয়োগকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব ও যাচাইহীন পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যকর করতে শেখার মানসিকতা গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।
পুঁজিবাজারের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল, বস্তুনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবারই দায়িত্ব রয়েছে। গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য বা ঘটনার খণ্ডিত অংশ তুলে না ধরে প্রকৃত তথ্য ও যথাযথ প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করতে হবে।
তিনি বলেন, বাজারসংশ্লিষ্ট কোনো বক্তব্যের নেতিবাচক অংশটুকু আলাদাভাবে প্রকাশ না করে বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরা জরুরি। সংবাদ যেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত বক্তব্য প্রতিফলিত করে, তা নিশ্চিত করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
মাসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও বিনিয়োগকারী; সব পক্ষকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা, সঠিক তথ্যপ্রবাহ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা সুদৃঢ় করা সম্ভব।
ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসইসির কমিশনার তানবীর হাবিব রহমান, নাহিদ মাহতাব, মো. নাফিজ আল তারিক, হোসেন সাদাত এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ পিএলসির চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম।