
আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব পরিধানে নিষেধাজ্ঞা, নেপথ্যে কী?
মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৪০

গত কয়েকদিনে বিমানবন্দরে চার দফা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতি বিদ্রোহীদের প্রাণঘাতী হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই সামরিক হামলা নিয়ে জনসাধারণকে আসন্ন সতর্কবার্তা দেয়া বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটির সরকার। গত কয়েকদিনে বিমানবন্দরে চার দফা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। তবে হামলার আগে জনসাধারণকে কেন কোনো সতর্কবার্তা দেয়া হয়নি, সে বিষয়ে সৌদি সরকার এখনো কিছু জানায়নি।
ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর পরও দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। কিন্তু হামলার আগের সতর্কবার্তাগুলো সহিংসতার চিত্র তুলে ধরত। বিমানবন্দরে হামলার সময় সতর্কবার্তা না থাকায় দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা ঝুঁকির মুখে এবং বিদেশি অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা কতটুকু—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আঞ্চলিক চারজন পশ্চিমা ও আরব কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, সতর্কবার্তা নিষ্ক্রিয় রাখার বিষয়টি দেশটিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখার চেষ্টার প্রতিফলন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সৌদি শিক্ষাবিদ ও মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ আবাসিক ফেলো সুলতান আলামের বলেন, ‘সৌদি সরকার দুই দিকই ধরে রাখতে চাইছে। একদিকে সামরিক অভিযান চালাতে চায়, অন্যদিকে জনগণ ও বাইরের অংশীজনদের আস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।’
সতর্কবার্তা না দেয়ার কারণ জানতে চেয়ে পাঠানো ইমেইলের জবাব দেয়নি সৌদি সিভিল ডিফেন্স, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে এবং আগাম সতর্কবার্তা দেয়। সরকারি মিডিয়া অফিসও জবাব দেয়নি। আঞ্চলিক বিশ্লেষকের মতে, এ পদ্ধতি উল্টো ফল দিতে পারে, কারণ সতর্কবার্তার অনুপস্থিতি দেশটিতে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বরের পর সোমবার (১২ অক্টোবর) সৌদি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ প্রথমবারের মতো সতর্কবার্তা জারি করে। এতে রাজধানী রিয়াদসহ দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরে সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়।
বিমানবন্দরে হামলার কারণেই আবার সতর্কবার্তা জারির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। এ বিষয়ে সৌদি সরকারও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় সব দেশই তেহরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে। তবে জনসাধারণকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে দেশগুলোর সরকারের পদক্ষেপ ছিল ভিন্ন।
কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রায় প্রতিটি হামলার আগে মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। সর্বশেষ জুলাইয়ের হামলাগুলোর সময়ও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে এবং জানালা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল। বাহরাইন ও কুয়েতেও মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বারবার সাইরেন বাজানো হয়েছে।
সৌদি আরব মে মাসে জাতীয় আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার হুমকি সম্পর্কে বার্তা দেয়া শুরু করে। কিন্তু হুতি বিদ্রোহীদের হামলা বাড়তে থাকলেও গত সপ্তাহের হামলার আগে এ ব্যবস্থা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
সিভিল ডিফেন্সের এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত পোস্ট অনুযায়ী, গত সপ্তাহের হামলার আগে সর্বশেষ সতর্কবার্তাটি দেয়া হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর। ওই বার্তায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছিল।
তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, বৃষ্টি ও বন্যার মতো পরিস্থিতিতে সতর্কবার্তা দেয়া অব্যাহত রেখেছে সিভিল ডিফেন্স। সোমবারও এ ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়।
এ ছাড়া হামলা প্রতিহত করার দৃশ্য, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের আঘাতের স্থানসংক্রান্ত ছবি, গুজব কিংবা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করার জন্যও বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। সোমবার দেয়া এক পোস্টেও এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়। গত মার্চে জারি করা সরকারি বিধিমালার আওতায় এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের বিমানবন্দরে হামলার আগে সৌদি আরবের সতর্কবার্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ জানতে দেশটির এক মিত্র পশ্চিমা সরকারের কর্মকর্তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সতর্কবার্তাগুলো জনজীবনে অতিরিক্ত বিঘ্ন সৃষ্টি করছিল। রাতে এসব বার্তার কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অনেক নাগরিক অভিযোগও করেছিলেন।
সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, হামলা নিয়ে জনসাধারণকে তথ্য দেয়া এবং দেশটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত না হওয়ার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছিল রিয়াদ। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের পদক্ষেপ হামলা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, ‘জনসাধারণকে তথ্য জানানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অবস্থান দেশটির বর্তমান সংকটেরই প্রতিফলন। তাদের হুতিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে, কিন্তু এর ফলে সামাজিক জীবনে বিঘ্ন ঘটুক, তা তারা চায় না। জনসাধারণকে দেয়া বার্তায়ও সেই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু হুতিদের হামলা নিয়ে আগাম সতর্কবার্তা না দেয়ায় মানুষের মধ্যে সেই উদ্বেগই তৈরি হচ্ছে, যা এড়াতে চাইছে সৌদি আরব।’