
দিল্লির আন্দোলনের নেপথ্যে কারা, তা বাংলাদেশের কয়েকজন মন্ত্রীর পোস্টে বোঝা যায়
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:২৯

সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজের এই স্থিরচিত্রে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি হামলার দৃশ্য দেখা যায়। ছবি: রয়টার্স
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রোববারের (১১ অক্টোবর) হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ওই হামলায় একজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন। এর ঠিক আগের দিন আরেকটি হামলায় ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছিলেন।
এসব হামলা গত কয়েক বছরের মধ্যে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ব্যাঘাত এবং এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে চালানো সবচেয়ে প্রাণঘাতী আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীও হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকার বিমানঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
২০২২ সাল থেকে মূলত কার্যকর থাকা জাতিসংঘের মধ্যস্থতা করা যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর ইরান-ঘনিষ্ঠ হুতি ও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ের মধ্যেই যুদ্ধের নতুন ফ্রন্টে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সৌদির কোন বিমানবন্দরগুলোতে হুতিরা আঘাত হেনেছে?
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: গত ছয় দিনে সৌদি রাজধানীর এই বিমানবন্দরটি চারবার হামলার শিকার হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৭ অক্টোবর একজন নিহত ও আটজন আহত হন। পরদিন আরেকটি হামলায় এক বিমান চালক ও আরও দুজন সৌদি নাগরিক নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন।
কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: উপসাগরীয় উপকূলের শিল্প ও বন্দরনগরী দাম্মামের এই বিমানবন্দরেও হামলার দাবি করেছে হুতিরা।
আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৭ অক্টোবর এই বিমানবন্দরের স্থাপনায় এক হামলায় দুজন নিহত ও ২৮ জন আহত হয়েছেন।
কিং আবদুল্লাহ বিন আব্দুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: গত ৬ অক্টোবর সৌদি কর্তৃপক্ষ দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজানের এই বিমানবন্দরে হামলার কথা জানায়, যাতে তিনজন আহত হন।
নাজরান বিমানবন্দর: একই দিনে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, নাজরান বিমানবন্দরেও আঘাত হানা হয়েছে এবং এতেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
ইয়েমেনি বাহিনী কি হুতি-নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরগুলোতেও আঘাত হেনেছে?
উত্তর হলো– হ্যাঁ। রোববার হুতি-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ইয়েমেনের রাজধানী সানার যেসব এলাকা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেসব এলাকায় ‘সৌদি’ বিমান হামলার খবর জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাগুলো সানার আল-থাওরা জেলার বিমানবন্দর সড়ক এলাকা এবং হামদান জেলাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল। তবে এসব হামলায় ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীও ১৩ জুলাই ধারাবাহিক বিমান হামলার অংশ হিসেবে সানা বিমানবন্দরে অন্তত পাঁচটি গোলা নিক্ষেপ করে; এর মধ্যে তিনটি সরাসরি একমাত্র সচল রানওয়েতে আঘাত হানে।
২০১৪ সাল থেকে হুতিরা সানা এবং উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মোচা ও ধুবাবকে কেন্দ্র করে তীব্র লড়াই চলছে; বাব আল-মান্দেব প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে এই শহরগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাহাজ চলাচলের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংকীর্ণ পথটি হরমুজ প্রণালীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠেছে; কারণ হরমুজ প্রণালীতে ইরানি হামলার ফলে তেলবাহী ট্যাঙ্কার পরিচালকদের জন্য খরচ ও ঝুঁকি বেড়ে গেছে।
হুতিরা সৌদি বিমানবন্দরগুলোতে কেন হামলা চালাচ্ছে?
ধারাবাহিক হামলার কারণে সৌদি রাজধানী রিয়াদের আকাশপথ এখন শূন্য। শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্যক্রম স্থগিত রাখার মেয়াদ বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ, যেটি দেশটির দ্বিতীয় ব্যস্ততম বিমানবন্দর।
লুফথানসা ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল করেছে; অন্যদিকে এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম সৌদি রাজধানীগামী ও সেখান থেকে আসা ফ্লাইটগুলোর পরিষেবা স্থগিত রাখার মেয়াদ চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি তাদের নাগরিকদের রিয়াদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
দেশটি যখন সৌদি আরবের দুটি বড় ধরনের জ্বালানি ও বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করছে, ঠিক তখনই এই বিঘ্ন দেখা দিলো।
রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহী ও নীতিনির্ধারকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিতব্য ‘ওয়ার্ল্ড পেট্রোলিয়াম কংগ্রেস’ (ডব্লিউপিসি)-এর আয়োজকরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ীই এর কার্যক্রম চলবে। এছাড়া, এক দশক আগে সৌদি আরবের প্রধান বিনিয়োগ সম্মেলন হিসেবে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে শুরু হওয়া ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’-ও ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে।
সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান ডব্লিউপিসি-কে জানিয়েছেন, দেশটির সহনশীলতা পরীক্ষার মুখে পড়েছিল; তবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন যে, এর জবাবে সৌদি আরবের পদক্ষেপ হবে ‘সমানভাবে জোরালো’।
ইউরোপীয় ইনস্টিটিউট অব পিস-এর উপদেষ্টা ও সংঘাত-বিষয়ক বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, হুতিরা তাদের হামলার পরিধি বাড়িয়ে তেল পাইপলাইন ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে এবং বিমানবন্দরগুলোতেও হামলা অব্যাহত রাখবে। কারণ এ ধরনের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ফলে জোরালো ‘জনপ্রতিক্রিয়া’ সৃষ্টি হয়।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘হুতিরা তাদের কর্মকাণ্ডের মাত্রা ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে এবং তারা সেই সীমারেখা অতিক্রম করেছে... তাদের নিজস্ব কর্মপদ্ধতি ও হিসাব-নিকাশ রয়েছে, আর বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলা না চালিয়ে থেমে থাকাটা সেই হিসাব-নিকাশের মধ্যে পড়ে না।’
এই বিশ্লেষকের মতে, “তারা (হুতি) একটি ‘ম্যাক্সিমালিস্ট’ বা সর্বোচ্চ দাবি-আদায়কারী গোষ্ঠী এবং নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে যা কিছু করা প্রয়োজন, তারা তা-ই করবে, যার মধ্যে রয়েছে– সৌদিদের কাছ থেকে আরও বেশি ছাড় আদায় করা।”
ইয়েমেনি বাহিনী কেন হুতি-নিয়ন্ত্রিত বিমানবন্দরগুলোতে হামলা চালাচ্ছে?
ইয়েমেনের রাজধানীতেই একমাত্র বিমানবন্দরটি অবস্থিত যেখান থেকে হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আসা-যাওয়া করে। আর ইয়েমেনের জনসংখ্যার সিংহভাগই এই এলাকায় বসবাস করে।
হুতি-নিয়ন্ত্রিত সম্প্রচারমাধ্যম লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত হোদেইদাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত বৃহস্পতিবার হামলার কথাও জানিয়েছে, তবে এতে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা উল্লেখ করেনি।
জাতিসংঘে ইয়েমেনের প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, ওই বিমানবন্দরগুলো হুতি প্রতিনিধিদলকে ইরানে আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইয়েমেন সরকারের ভাষ্যমতে, সেখানে ইরানি ফ্লাইটগুলোর অবতরণ ঠেকানোর লক্ষ্যেই বিমানবন্দরগুলোর স্থাপনায় এসব হামলা চালানো হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা