
রমজানে মসজিদে নববীতে ইতিকাফের জন্য স্থায়ী কক্ষ নির্মাণের উদ্যোগ
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৫৯

মানসিক প্রশান্তির জন্য বিশ্রাম নিন, এটিও ইসলামের শিক্ষা
জীবন মানেই নানা রকম চাপ। পড়াশোনা, চাকরি, পরিবার এবং প্রতিদিনের নানা চ্যালেঞ্জ সামলাতে গিয়ে মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন অনেকেই। প্রস্তুতি যত ভালোই থাকুক না কেন, জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ নয়।
এটি শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় নয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় সব বয়সের মানুষের মধ্যেই মানসিক চাপ বাড়ছে। এর ফলে মানসিক সুস্থতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
একজন মুসলিম হিসেবে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই দুশ্চিন্তাপূর্ণ জীবনে প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার কোনো পথ কি ইসলামে রয়েছে? জীবনের ব্যস্ততা, কর্মক্ষেত্রে উন্নতির প্রতিযোগিতা কিংবা ভালো ফলাফল অর্জনের চাপের মধ্যেও কি ধর্মীয় বিশ্বাস ও দৈনন্দিন আমলের মাধ্যমে মানসিক শান্তি পাওয়া সম্ভব?
বাস্তবতা হলো, কোনো ধর্মই জীবনের সব ধরনের চাপ পুরোপুরি দূর করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় না। ইসলামের উদ্দেশ্যও তা নয়। মানসিক চাপ জীবনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার একটি অংশ। অনেক সময় প্রতিকূলতা মানুষকে আরও দৃঢ় হতে, নিজের সক্ষমতা বাড়াতে এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সাহায্য করে।
ধর্ম মানুষকে জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে। আমরা কেন পৃথিবীতে এসেছি, জীবনের উদ্দেশ্য কী এবং কীভাবে জীবন পরিচালনা করা উচিত এসব প্রশ্নের দিকনির্দেশনা দেয় ধর্ম। ইসলাম মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এমন একটি সুশৃঙ্খল ছন্দ তৈরি করে, যা অনুসরণ করলে জীবনে ভারসাম্য ও প্রশান্তি প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়।
ইসলামের সেই জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করে মানসিক চাপ কমানো এবং দৈনন্দিন জীবনে ভারসাম্য আনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় তুলে ধরা হলো।
১. সময়মতো নামাজ আদায় করুন, দিন সাজান নামাজের সময় ধরে
কথাটি খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কারণ, নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু বর্তমান ব্যস্ত জীবনে সময়মতো নামাজ আদায় করাই অনেক মুসলিমের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, নামাজের জন্য সময় বের করতে হয়। আর আজকের পৃথিবীতে সময়কে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মসজিদে অনেক সময় শোনা যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে প্রতিবার মাত্র কয়েক মিনিট লাগে। ইসলাম সহজ, নামাজও সহজ। কিন্তু যাঁরা অবসর জীবন কাটাচ্ছেন কিংবা যাঁদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার বাধ্যবাধকতা নেই, তাঁদের জন্য বিষয়টি সহজ মনে হলেও ব্যস্ত মানুষের বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর কথা ভাবুন, যার সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিংবা এমন একজন কর্মজীবীর কথা, যাঁকে অফিসের কাজ শেষ করতে হবে, সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে হবে, বাজার করতে হবে, গাড়ি মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সভায়ও অংশ নিতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে নামাজের সময় বের করা কঠিন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এ সমস্যার সমাধানে দৈনন্দিন কাজের পরিকল্পনা করার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা যেতে পারে। দিনের অন্যান্য কাজের আগে নামাজের সময়গুলোকে গুরুত্ব দিন। এরপর নামাজের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাকি কাজগুলো সাজিয়ে নিন।
যেমন, আসরের পর সন্তানকে স্কুল থেকে আনা কিংবা মাগরিবের পর বাজার করার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, কাজের চাপে নামাজের সময় পার হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা না করে আগেই নামাজকে পরিকল্পনার অংশ করে নিন।
এভাবে নামাজের সময়কে কেন্দ্র করে দিনের কাজ সাজালে সময় ব্যবস্থাপনা সহজ হবে। একই সঙ্গে তৈরি হবে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের অভ্যাস। এতে একদিকে যেমন ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ বিধান পালন করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে দৈনন্দিন কাজের চাপও আরও গোছানোভাবে সামলানো যাবে।
২. মানসিক প্রশান্তির জন্য বিশ্রাম নিন, এটিও ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম নিয়ে আলোচনা হলে অনেক সময় আমরা কী কী করা উচিত, সেদিকেই বেশি মনোযোগ দিই। যেমন, আরও বেশি দান করা, মসজিদে যাওয়া কিংবা মা-বাবার সঙ্গে আরও ভালো আচরণ করা। কিন্তু জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে মানসিক প্রশান্তির জন্য সময় বের করাও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন ছিল আল্লাহর ইবাদত ও ইসলামের প্রচারে নিবেদিত। তা সত্ত্বেও তিনি বিশ্রাম, বিনোদন এবং আনন্দের জন্য সময় দিয়েছেন। অন্যদেরও বৈধ আনন্দ উপভোগ করতে বাধা দেননি।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে প্রবেশ করে দেখলেন, সেখানে দুজন মেয়ে গান গাইছে এবং দফ বাজাচ্ছে। এ সময় আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা এসে তাদের এভাবে গান গাওয়ার জন্য ভর্ৎসনা করেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তাদের ছেড়ে দিতে বলেন।
একই বর্ণনায় আরও এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি আবিসিনিয়ার লোকদের ঢাল ও বর্শা নিয়ে ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন দেখতে চান কি না। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সম্মতি দিলে তাঁরা দুজন তা দেখতে থাকেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজে চলে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সঙ্গে সেখানে অবস্থান করেন।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বৈধ বিনোদন, আনন্দ উপভোগ এবং অবসরের জন্য সময় রাখারও ইসলামে গুরুত্ব রয়েছে। দান-সদকা করা কিংবা মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনের মতোই মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা ও সামর্থ্যের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি। এ ছাড়া বিভিন্ন হাদিসে শরীরচর্চা, খেলাধুলা এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিও উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
তাই যখন মনে হবে, কাজের চাপ আর সামলানো যাচ্ছে না, তখন অল্প সময়ের জন্য বিরতি নিন। নিজের শরীর ও মনের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিন। বৈধ ও ইতিবাচক কোনো কাজে সময় কাটান, পরিবারের সঙ্গে সময় দিন কিংবা শরীরচর্চা করুন।
মনে রাখতে হবে, বিশ্রাম নেওয়া মানেই দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং দায়িত্ব পালনের শক্তি ও মনোযোগ ফিরে পেতে যথাযথ বিশ্রাম সহায়ক হতে পারে।
আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ একেবারে দূর করে দেওয়া ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। বরং ইসলাম মানুষকে এসব পরিস্থিতির মধ্যেও সঠিকভাবে জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা দেয়।
জীবনে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোন দায়িত্বগুলো আগে পালন করা প্রয়োজন এবং নিজের শরীর ও মনের যত্ন কীভাবে নিতে হবে এসব বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে ইসলাম সাহায্য করে। তাই দৈনন্দিন জীবনে নামাজকে অগ্রাধিকার দিন, কাজের সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা করুন এবং প্রয়োজনীয় বিশ্রামের জন্যও সময় রাখুন। সব দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানোর চেষ্টা না করে সেগুলোকে গুরুত্ব অনুযায়ী সাজিয়ে নিন।
মনে রাখবেন, জীবনের প্রতিটি কাজ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব কাজের গুরুত্ব সমান নয়। ইবাদত, পরিবার, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত সুস্থতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই ব্যস্ত জীবনে প্রশান্তি খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।