
‘খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে সৌদি আরবে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমি মুসলিম হয়ে ফিরলাম’
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৯

শায়েখ আহমাদুল্লাহ
মানুষ মাত্রই ভুল করে। কখনো শয়তানের প্ররোচনায়, কখনো নফসের তাড়নায় আমরা এমন কিছু কাজে জড়িয়ে পড়ি, যা আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির কারণ হয়। কিন্তু একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, ভুল হয়ে গেলে সে হতাশ হয়ে পড়ে থাকে না; বরং অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক দ্বীনদার ও নিয়মিত ইবাদতকারী মুসলমানের জীবনেও তাওবার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল অবহেলিত। তা হলো সালাতুত তাওবাহ বা তাওবার নামাজ। অথচ গুনাহ হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি।
সুনানে ইবনে মাজাহতে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক আদমসন্তানই ভুল করে, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তাওবা করে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫১) তাওবার অর্থ ফিরে আসা। অর্থাৎ, গুনাহ থেকে ফিরে আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে সমর্পণ করা।
তাওবার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
তাওবা কেবল মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলার নাম নয়। এর সঙ্গে অন্তরের অনুশোচনা এবং বাস্তব জীবনে পরিবর্তন আনার বিষয়টিও জড়িত।
প্রথমত, অন্তর থেকে অনুশোচনা করা। কোনো গুনাহ হয়ে গেলে নিজের ভুল উপলব্ধি করা, আল্লাহর অবাধ্যতার জন্য লজ্জিত হওয়া এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। মুখে ইস্তিগফার করা, নিজের অপরাধ স্বীকার করে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা কামনা করা।
তৃতীয়ত, জীবনে পরিবর্তন আনা। যে গুনাহে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তা ছেড়ে দেওয়া এবং পুনরায় সেই পাপে জড়িয়ে পড়ার কারণ, পরিবেশ ও উপায় থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা।
সালাতুত তাওবাহ কী এবং কীভাবে আদায় করবেন?
কোনো গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো সালাতুত তাওবাহ। এর পদ্ধতি সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কোনো বান্দা গুনাহ করার পর উত্তমরূপে পবিত্রতা অর্জন করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।
হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এ হাদিসটি সুনানে আবু দাউদ, জামে তিরমিজি ও অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে এসেছে। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৪০৬)
সালাতুত তাওবাহ আদায়ের পদ্ধতি হলো: গুনাহ হয়ে গেলে প্রথমে অনুতপ্ত হতে হবে এবং গুনাহটি ছেড়ে দিতে হবে। এরপর উত্তমরূপে অজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে হবে। নামাজ শেষে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ভবিষ্যতে ওই গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
এ নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ সূরা বা আলাদা কিরাআত আবশ্যক নয়। সাধারণ নফল নামাজের মতোই তা আদায় করা যায়। নির্জনে, লোকদেখানো মনোভাব থেকে দূরে থেকে একাগ্রতার সঙ্গে ইবাদত করা উত্তম। তবে চোখে পানি না এলেও তাওবা আন্তরিক হতে পারে; কান্না তাওবা কবুলের শর্ত নয়।
খাঁটি তাওবা কবুল হওয়ার চারটি শর্ত
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের খাঁটি তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা আত-তাহরিমের ৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো।’
খাঁটি তাওবার জন্য কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
এক. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া। যে পাপে লিপ্ত ছিলেন, তা থেকে অবিলম্বে ফিরে আসতে হবে। গুনাহ চালিয়ে গিয়ে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়।
দুই. অনুশোচনা করা। নিজের ভুলের জন্য অন্তরে সত্যিকারের কষ্ট ও লজ্জা অনুভব করতে হবে। আল্লাহর অবাধ্যতার জন্য অনুতপ্ত হওয়াই তাওবার প্রাণ।
তিন. পুনরায় গুনাহ না করার সংকল্প করা। ভবিষ্যতে ওই পাপে ফিরে না যাওয়ার আন্তরিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে পরে দুর্বলতার কারণে আবার ভুল হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে নতুন করে তাওবা করতে হবে।
চার. মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। গুনাহটি যদি অন্য কোনো মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, যেমন কারও অর্থ আত্মসাৎ করা বা কারও সম্পদ নষ্ট করা, তাহলে তার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্ষমা চাইতে হবে এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে।
তাওবা ও ইস্তিগফারের অসাধারণ ফজিলত
আন্তরিক তাওবা মানুষের জীবনে পরিবর্তনের দ্বার খুলে দেয়। আল্লাহর রহমতে গুনাহ মাফ হয়, অন্তর পরিশুদ্ধ হয় এবং বান্দা নতুনভাবে তাঁর আনুগত্যের পথে চলার সুযোগ পায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি হাদিসে জানিয়েছেন, কোনো বান্দা তাওবা করলে আল্লাহ তার তাওবায় অত্যন্ত আনন্দিত হন। মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া বাহন ও জীবনধারণের উপকরণ ফিরে পেয়ে কোনো ব্যক্তি যেমন আনন্দিত হয়, আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৭)
তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর রহমত, বরকত ও কল্যাণ লাভের কথাও পবিত্র কুরআনে এসেছে। সূরা হুদে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে এবং তাঁর দিকে ফিরে আসতে বলা হয়েছে; এর সঙ্গে উত্তম জীবনোপকরণের প্রতিশ্রুতিও উল্লেখ করা হয়েছে। (সূরা হুদ, আয়াত: ৩)
তবে তাওবা করলেই দুনিয়ার সব বিপদ সঙ্গে সঙ্গে দূর হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। বরং মুমিনের কর্তব্য হলো, বিপদে-আপদে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা, ইস্তিগফার করা এবং তাঁর ওপর ভরসা রেখে বৈধ উপায়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা।
বারবার গুনাহ হয়ে গেলে কি তাওবা করবেন না?
কেউ হয়তো একটি গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, আন্তরিকভাবে তাওবাও করলেন। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সেই ভুলে জড়িয়ে পড়লেন। তখন অনেকের মনে হতাশা আসে, কেউ কেউ লজ্জায় আর তাওবা করতেও চান না।
এটি শয়তানের অন্যতম বড় ফাঁদ। সে প্রথমে মানুষকে গুনাহে প্ররোচিত করে, পরে সেই গুনাহের কারণে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করতে চায়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা চাইতেন। সহিহ বুখারিতে তাঁর দৈনিক একশবার ইস্তিগফার করার কথা বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৭)
তাই গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে আবার তাওবা করতে হবে। তবে তাওবাকে হালকা করে নেওয়া যাবে না। প্রতিবার তাওবার সঙ্গে গুনাহ ছাড়ার বাস্তব চেষ্টা, আত্মসংযম এবং গুনাহের পথ বন্ধ করার উদ্যোগ থাকতে হবে।
কখন পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা?
মানুষের জীবনে তাওবার সুযোগ সীমাহীন নয়। মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়ে যাওয়ার সময় পর্যন্ত ব্যক্তিগত তাওবার সুযোগ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বান্দার প্রাণ কণ্ঠনালিতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আল্লাহ তার তাওবা কবুল করেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৩৭)
অর্থাৎ, মৃত্যুর চূড়ান্ত মুহূর্ত উপস্থিত হওয়ার আগে আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না।
আমাদের জীবনে ভুল হবে, গুনাহও হতে পারে। কিন্তু গুনাহের চেয়ে বড় বিপদ হলো, গুনাহের পর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়া এবং তার কাছে ফিরে আসার পথ বন্ধ করে দেওয়া।
তাই নিয়মিত ইস্তিগফারের পাশাপাশি গুনাহ হয়ে গেলে অজু করে দুই রাকাত সালাতুত তাওবাহ আদায় করা, আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং জীবন সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।
আজই নিজের ভুলগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। গুনাহকে ছোট মনে করবেন না, আবার নিজের গুনাহকে আল্লাহর রহমতের চেয়েও বড় ভাববেন না। তাওবার দরজা খোলা থাকা অবস্থায় সেই সুযোগ গ্রহণ করুন।