
নগরকান্দায় সুদের টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব, একই পরিবারের ৫ জনকে কুপিয়ে জখম
প্রতিবেদক, ফরিদপুর
প্রকাশ: রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:২০

মৃত্যুর আগে হাসপাতালে সময় সংবাদের সঙ্গে কথা বলেন নার্স বীথি। ছবি: সময় সংবাদ
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এখানেই সিজারের সময় নার্স বীথি আক্তারের পেটে গজ রেখেই সেলাই করে দেন চিকিৎসক। তারপর সেই গজ পেটের মধ্যে পচে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। ওই সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তোলেন বীথির স্বজনরা।
বীথির মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। বীথির স্বামী রকিবুল ‘মামলা না করার শর্তে’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ৫৫ হাজার টাকা নিয়েছেন! ভবিষ্যতে রোগীর পরিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা বা আর্থিক দাবি করবে না বলে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা ওই লিখিত চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। নথিতে বীথির স্বামী রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর ব্লার করে দেওয়া হয়।
আর্থিক সহায়তার বিষয়টি নিয়ে বীথির মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে বিথী আক্তারের স্বামী রাকিবুল ইসলাম দাবি করেন, ওই সময় তার কাছে মাত্র ২০ হাজার টাকা ছিল এবং হাসপাতালের বকেয়া বিলসহ নানা আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছিলেন। এ পরিস্থিতিতে তিনি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন বলেও জানান। সে সময় পরিবারের ভবিষ্যৎ ও আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত পরিচালক) মানস কৃষ্ণ কুন্ডু জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টাকা দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি শুনেছি, ফেসবুকে নাকি ভাইরাল হয়েছে। বীথির চিকিৎসার জন্য আমরা মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছিলাম, তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকায় পাঠানো হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিথী।
উপ-পরিচালক আরও জানান, বিথীর চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছে কি না সে বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাসকে প্রধান করে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে তদন্ত কমিটিকে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮ টায় ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। বীথি আক্তার রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যেতিনবর্দিপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী এবং ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিল। পাশাপাশি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতেন।
মৃত বীথির পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বীথির অস্ত্রোপচার করেন ডা. তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু। ওই সময় তিনি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। এর পাঁচ দিন পরে হাসপাতাল ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে চলে যান বীথি। এরপর থেকে অসুস্থতাসহ নানা জটিলতা দেখা দেয় তার।
একপর্যায়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও গুরুতর কোনো সমস্যা হয়নি বলে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রায় দেড় মাস পর দুই দফায় দুটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে আল্ট্রাসনোগ্রাম দেখা যায়, তার পেটের মধ্যে মব (গজ কাপড়) রয়েছে।
এরপর গত ১২ জুলাই ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় তাকে। এর তিন দিন পর ১৫ জুলাই সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও সঞ্জয় সাহা তার দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করে গজ কাপড় বের আনেন। তখন তার পেটের নাড়ী পচে সংক্রমণ দেখা দেয়। পরবর্তীতে ২২ জুলাই তাকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরমধ্যে পেটের মধ্যে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে গত ২ অক্টোবর বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল বিথী নিজেই। পরবর্তী সময়ে তার চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগও করেন স্বজনরা।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় গত ৪ অক্টোবর ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বিথী আক্তারকে। ঢাকা নেওয়ার পরে আরও অবনতি হতে থাকে এবং চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮ অক্টোবর সকালে মারা যায় বিথী। ওই দিনই দুপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় বীথির মরদেহ। জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়।