
প্রদর্শনীর জন্য সমুদ্রসৈকতে উন্মুক্ত ৫ টনের ‘প্লাস্টিক দানব’
রিমু সিদ্দিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪

অযত্ন, অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে করুণ দশা রাজধানীর বিভিন্ন পার্কের। ছবি: সময় সংবাদ
রাজধানীর পার্কগুলোতে দিন দিন বাড়ছে অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তাহীনতা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি। কোথাও পার্কের ভেতরে চলছে ফুটপাতের দোকান, কোথাও ভাঙাচোরা হাঁটার পথ। আবর্জনা ও পুকুরে হাঁসের খামারের দুর্গন্ধে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। আবার কোথাও মাদকসেবী ও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের কারণে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় দর্শনার্থীরা। এর মধ্যে কমছে গাছের সংখ্যাও। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত চার দশকে রাজধানীর পার্কগুলোতে সবুজ কমেছে ৫৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
রাজধানীর পার্কগুলো যেন এখন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে নথিপত্র আর স্মৃতির পাতায়। যে জায়গায় ক্লান্ত নগরবাসীর বুকভরে শ্বাস নেয়ার কথা, নির্মল প্রকৃতির সান্নিধ্যে মনপ্রাণ সতেজ হওয়ার কথা, সেই পার্কই এখন অনেকের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। অযত্ন, অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে করুণ দশা রাজধানীর বিভিন্ন পার্কের।
বছর চারেক আগে সংস্কারের পর দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছিল গুলিস্তানের শহীদ মতিউর পার্ক। কিন্তু এরইমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে হাঁটার পথ। মাত্র ৩০ টাকা চুক্তিতে পার্কের ভেতরে ভাড়া দেয়া হচ্ছে ফুটপাতের দোকানের জায়গা।
পার্কের পুকুরে হাঁসের খামার থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ, দূষিত হচ্ছে পানি। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই আবর্জনার স্তূপ। ভেঙে পড়ছে পুরোনো গাছ। নেই পর্যাপ্ত শৌচাগার। যেগুলো আছে, সেগুলোরও বেহাল দশা। কখনো কখনো এসব শৌচাগারেই চলে অনৈতিক কর্মকাণ্ড।
এক দর্শনার্থী বলেন, ‘রাস্তাঘাট পুরোটাই ভাঙা, গাছগাছালি ফেলে রাখা হয়েছে। মানুষ যে একটু হাঁটবে, সেই পরিবেশ নেই। টিকিট কেটে কি কেউ দুর্গন্ধ নিতে আসে? আমরা তো এসেছি একটু অবকাশযাপন করতে। সারাদিন কর্মব্যস্ততার পর একটু স্বস্তিতে বসতে, ভালো পরিবেশে সময় কাটাতে। এখানে এসে দেখি হাঁসের খামার। বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই দুর্ভোগের।’
সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাজধানীর শাহবাগের শিশুপার্ক। এর পাশেই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও স্বস্তিতে সময় কাটানোর পরিবেশ নেই। কংক্রিটের স্থাপনা, যত্রতত্র আবর্জনা ও অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়িতে ভোগান্তিতে পড়ছেন দর্শনার্থীরা। এর সঙ্গে রয়েছে মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের উৎপাত। নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন অনেকে।
এক দর্শনার্থী বলেন, ‘ডানে-বামে তাকালেই দেখা যাবে, কেউ গাঁজা বানাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেউ সামনে করলে; নিজের মধ্যেই একটা ভীতি কাজ করে।’
পার্কগুলোর এমন অব্যবস্থাপনার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি মেলে রমনা পার্কে। গাছপালার সবুজ ছায়ায় এখানে সময় কাটান বিপুলসংখ্যক মানুষ। তবে সেখানেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে শতবর্ষীসহ বিভিন্ন বয়সী গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘ঢাকায় একজন মানুষের জন্য সাতটি গাছ থাকার কথা, সেখানে সাতজনের জন্য আছে একটি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সবুজের পরিমাণ থাকার কথা ছিল ২৫ শতাংশ। কিন্তু তা এখন ৫ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।’
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত চার দশকে রাজধানীর পার্কগুলোতে কমপক্ষে ৫৫ শতাংশ সবুজ কমেছে। কোনো পার্কেই পর্যাপ্ত বনায়নের উদ্যোগ নেই। পার্কগুলোর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং নগরবাসীর জন্য ব্যবহার উপযোগী করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘পার্কগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে উদ্ভিদ শ্রেণিবিন্যাসবিদ, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, পরিবেশবিজ্ঞানী, দূষণ বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের সমন্বয়ে একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা তৈরি করে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ইমারত বিধিমালায় পার্কে ৫ শতাংশ অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে কোথাও কোথাও তা বেড়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হচ্ছে। এতে পার্কের প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘পার্কে যখন ইট, পাথর ও কংক্রিট বাড়ছে, তখন তাপমাত্রাও বাড়ছে। পার্কের মৌলিক প্রকৃতিতে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা আধুনিক পার্ক পরিকল্পনার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা কখনোই কংক্রিটকে প্রাধান্য দেব না। বরং যত বেশি সম্ভব প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের দিকে যেতে হবে।’
গণপূর্ত অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিনোদন কেন্দ্রসহ রাজধানী ঢাকায় ছোট-বড় পার্ক ও উদ্যানের সংখ্যা প্রায় ৬০টি। এর অধিকাংশই এখন অস্তিত্ব সংকটে ধুঁকছে।
তবে অপরিকল্পনা, অযত্ন ও অবহেলার বৃত্ত থেকে নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষঙ্গকে প্রকৃতির ভারসাম্য ও নগরবাসীর চাহিদা অনুযায়ী কবে ফিরিয়ে আনা হবে, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন রাজধানীর কোটি মানুষ।