
জমি নেই, একমাত্র সম্বল বসতঘরেই বৃদ্ধকে দাফন!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০:৫৭

সোমবার (২৬ অক্টোবর) কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কে উচ্ছেদ অভিযানে চারতলা রিসোর্টটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। এর অংশ হিসেবে সোমবার (২৬ অক্টোবর) ইনানীতে চারতলা একটি রিসোর্ট ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভবনটির নিচে ও দুই পাশে থাকা ১০ থেকে ১২টি দোকানঘরও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
কউক বলছে, ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র ও অনুমোদিত নকশা ছাড়াই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণকাজে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে। তবে মালিকপক্ষের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও তাদের স্থাপনায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবর কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। আহত হন আরও ছয়জন। এ ঘটনার নয় দিন পর মেরিন ড্রাইভে অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযানে নামে কউক। অভিযানে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, এসআরবি, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে ইনানীতে নৌবাহিনীর জেটির পূর্ব পাশে অবস্থিত ওই রিসোর্ট ভবনের সামনে এক্সক্যাভেটর নিয়ে আসা হয়। অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা ভিড় করেন। দুপুরের দিকে ভবনের নিচে ও দুই পাশে থাকা ১০ থেকে ১২টি দোকানঘর ভেঙে ফেলা হয়। এরপর চারতলা ভবনটির কাচের গ্লাস ভাঙা হয়। পরে মূল ভবনের পিলারসহ বিভিন্ন অংশ অপসারণের কাজ করা হয়।
উপজেলা প্রশাসনের দাবি, ভবনটির নির্মাণকাজের শুরু থেকেই কাঠামোগত ত্রুটি ছিল। দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত পিলার ছিল না। পরে ভবনের ভেতরে পিলার যুক্ত করা হয়। নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার জন্য একাধিকবার নির্দেশ দেওয়া হলেও মালিকপক্ষ তা মানেনি। এ কারণে আর সময় না দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
উখিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু আবদুল্লাহ বলেন, কউকের উদ্যোগে এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক বিষয় তদারকির জন্য তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভবনটির কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়ে আবু আবদুল্লাহ বলেন, ভবনের বিমে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো ভেঙে পড়ছে। নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু ছবিও প্রশাসনের কাছে রয়েছে। সেসব ছবি থেকে নির্মাণকাজের বিভিন্ন অসংগতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, গত ১৯ অক্টোবর কউকের সচিব সরেজমিনে পরিদর্শনে এসে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপরও মালিকপক্ষ আরও এক দিন সময় চেয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের অতিরিক্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয়নি।
কউকের সচিব সানজিদা বেগম বলেন, অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেউ রিসোর্ট বা ভবন নির্মাণ করলে যেকোনো সময় সেই স্থাপনা উচ্ছেদ করা হতে পারে।
তিনি বলেন, ২০২৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ দিয়ে নির্মাণকাজের অনিয়ম সম্পর্কে জানানো হয়েছে। ভবন নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র (এলইউসি) নেওয়ার বিধান থাকলেও মালিকপক্ষ তা নেয়নি বলে কউকের দাবি। অনুমোদিত নকশা না থাকা এবং বিএনবিসি অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে।
সানজিদা বেগম বলেন, বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে স্থাপনা অপসারণের কাজ কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ বছর কক্সবাজারে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় অভিযানে বিরতি ছিল। তবে বর্তমান অভিযান নিয়মিত কার্যক্রমেরই অংশ।
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। অবৈধভাবে রিসোর্ট নির্মাণকারীরা যাতে সতর্ক হন এবং আইন মেনে স্থাপনা নির্মাণ করেন, সে জন্যও এ অভিযান গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকার বিষয়ে মালিকপক্ষের দাবির প্রসঙ্গে কউকের সচিব বলেন, শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকলেই ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়া যায় না। এ জন্য ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র, অনুমোদিত নকশাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
তিনি আরও বলেন, নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই মালিকপক্ষকে বিভিন্নভাবে সতর্ক করা হয়েছে। গত দেড় থেকে দুই বছর ধরে নোটিশ ও সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও সেগুলো যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে তাদের পর্যবেক্ষণ। উচ্ছেদ কার্যক্রম শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্ত নেবেন।
উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বে হিলটন রিসোর্টের মালিকপক্ষ। তাদের দাবি, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দেওয়া চিঠির জবাব দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে। এরপরও কেন ভবনটি অপসারণ করা হচ্ছে, তা তাদের বোধগম্য নয়।
মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. জসিম বলেন, ২০১৫ সাল থেকে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিটি চিঠির জবাব তারা দিয়েছেন। সম্প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিশেরও জবাব দেওয়া হয়েছে। ভবন নির্মাণের কাগজপত্র, ইউনিয়ন পরিষদের অনুমতি, পরিকল্পনার অনুমোদন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন নথি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
জসিম আরও বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রের জন্যও আবেদন করা হয়েছে। মালামাল সরিয়ে নেওয়ার জন্য অন্তত এক দিন সময় চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সময় দেওয়া হয়নি।
কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, মেরিন ড্রাইভে অনেক রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। অবৈধ হোটেল-রিসোর্টগুলোকে আইনের আওতায় আনার পক্ষে তারাও।
মুকিম খান বলেন, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনায় কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা এড়াতে আইন মেনে স্থাপনা নির্মাণ নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ৫০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০০টি ফায়ার লাইসেন্স নিয়েছে। বাকি ৪০০টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।