
টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সাজেক সড়কে চলছে অনির্দিষ্টকালে অবরোধ
মাহমুদ হাসান, মোংলা (বাগেরহাট)
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৬

মোংলা বন্দর, ফাইল ছবি
বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি মোংলা সমুদ্রবন্দর পরিদর্শনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে বন্দরটির সক্ষমতা, নতুন জেটি নির্মাণ, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনা পরিদর্শন করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঘিরে মোংলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন বিনিয়োগ ও উন্নয়নের প্রত্যাশা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে মোংলা ও আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের নাব্য সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে মোংলা বন্দরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার আশা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে মোংলা বন্দর চ্যানেল, হিরণ পয়েন্ট এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া বন্দরের সাগরমোহনার আকরাম পয়েন্ট এলাকায় প্রস্তাবিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) স্থাপনের নির্ধারিত স্থান পরিদর্শনের কথা রয়েছে তার।
এলএনজি স্থাপনের স্থান পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী নলিয়ানে যাবেন। পরে নৌপথে মোংলা নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে পৌঁছাবেন তিনি। সেখান থেকে বিকেলে মোংলা বন্দরের জেটি এলাকা পরিদর্শন শেষে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘুরে দেখবেন।
চীনা বিনিয়োগ ও নতুন জেটিতে গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে শুধু মোংলা বন্দর নয়, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক মহলেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক উদ্দীপনা। বন্দরকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের সমস্যা, নাব্য সংকট ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে মোংলাকে আন্তর্জাতিক মানের অর্থনৈতিক কেন্দ্রে রূপান্তরের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সফরকালে প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা, জেটি এলাকা এবং মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সরেজমিনে মূল্যায়ন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই হাই-প্রোফাইল সফরের প্রধান আলোচনার বিষয় হলো চীনা বিনিয়োগ ও নতুন জেটি নির্মাণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘চীন সরকারের সঙ্গে চুক্তি হওয়া মোংলা বন্দরের নতুন জেটি নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। এই বিনিয়োগ দ্রুত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া মোংলা ইপিজেড এবং বন্দরসংলগ্ন স্পেশাল ইকোনমিক জোন এলাকায় শিল্পায়নের গতি বাড়াতে নতুন কর্মপরিকল্পনা সরকারপ্রধানের কাছে তুলে ধরা হবে।’
তারেক রহমানের এই সফরকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে মোংলা বন্দর, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা ও পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন শেখ ফরিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি উপকূলের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মানে এক ইতিবাচক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মোংলা নদীর ওপর বহুল কাঙ্ক্ষিত সেতু নির্মাণ এবং মোংলা-খুলনা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার প্রস্তাবও প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। মোংলা বন্দর উন্নয়নের পাশাপাশি তাকে এটিও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে।’
নাব্য সংকট নিরসন চান ব্যবসায়ীরা
মোংলা বন্দরকে চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সমকক্ষ ও পরিপূরক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোও নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকার আলী বলেন, ‘বন্দর চ্যানেলে নিয়মিত নাব্যতার অভাবে অনেক বড় বিদেশি জাহাজ সরাসরি জেটিতে এসে ভিড়তে পারে না। স্থায়ী ও বিজ্ঞানসম্মত ড্রেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে চ্যানেলের গভীরতা বজায় রাখাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চীনের সহায়তায় নতুন জেটি নির্মাণের স্থান দেখার পাশাপাশি চ্যানেলের গভীরতা বাড়ানোর স্থায়ী নির্দেশনা দেবেন বলে আমরা আশাবাদী। এ ছাড়া মোংলা ইপিজেড ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এটি সম্ভব হলে বিশ্ববাজারের তীব্র প্রতিযোগিতায় আমাদের উৎপাদন খরচ কমবে। একই সঙ্গে বন্দর থেকে খালাস করা পণ্য কম সময়ে ও কম খরচে ঢাকায় পৌঁছাতে সড়ক ও রেলপথের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’
বন্দরের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জেটিতে জাহাজ আগমনের সংখ্যা দিন দিন কমছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করা না গেলে শুধু ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা প্রত্যাশা করছেন তারা।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি সরকারপ্রধান দিয়ে আসছেন, এই সফরের মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান ব্যবসায়ীরা।
উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীরা
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে উচ্ছ্বসিত বিএনপির নেতাকর্মীরা। সফরটি সরকারি, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পর্যালোচনাকেন্দ্রিক হওয়ায় এতে কোনো দলীয় রাজনৈতিক জনসভার কর্মসূচি রাখা হয়নি। তবে তার আগমন উপলক্ষে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। বাগেরহাট জেলা ও মোংলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিলের পাশাপাশি ব্যানার-ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে পথঘাট।
অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার আশা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মোংলা সফরকে ঘিরে স্থানীয়দের প্রত্যাশা শুধু বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের আশা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট সুবিধার সম্প্রসারণের পাশাপাশি সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, নতুন জেটি নির্মাণ, নিয়মিত ড্রেজিং, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়বে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।
এখন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে উত্থাপিত সমস্যা ও উন্নয়ন প্রস্তাবগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাতে মোংলা বন্দরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথ আরও সুগম হবে।