
‘আমি ইসরাইলে চলে যাবো, সেখানে প্রধানমন্ত্রী হবো’
ফয়সাল হাসান
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৭:০

ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মল থেকে ব্লু আওয়ারে দেখা মার্কিন ক্যাপিটল। ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে জয় ছিনিয়ে নিয়ে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ, কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে দলটি।
১০০ সদস্যের সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ৫৩টি আসনে জয় পেয়েছে এবং আরও তিনটি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদেও জয় পেয়েছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের পর এই প্রথম কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের কোনো কক্ষেই নিজ দলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলেন না।
এখনো বেশ কয়েকটি আসনের ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে চূড়ান্ত ফল জানতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তবে অনেক ডেমোক্র্যাট নেতা ইতোমধ্যে এই ফলাফলকে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় পরাজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, নির্বাচনি প্রচারে বিরোধী দল তাদের চেয়ে ভালো করেছে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলো ডেমোক্র্যাটরা এবং এই ক্ষমতা দিয়ে তারা কী করতে পারে:
সিনেটে বড় ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা
সিনেটে একাধিক আসনে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর মধ্যে এমন কয়েকটি আসনও রয়েছে, যেগুলোতে কয়েক দশক ধরে দলটি জয় পায়নি।
জেমস তালারিকো, টেক্সাস: ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প এই দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যে ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। প্যাক্সটন অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল। এর আগে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছিল এবং অঙ্গরাজ্যের আইনসভা তাকে একবার অভিশংসনও করেছে। তবে তালারিকো তাকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। অধিকাংশ ভোট গণনা শেষে তিনি ১১ শতাংশ পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। ৩২ বছরের মধ্যে এই প্রথম টেক্সাসে কোনো অঙ্গরাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় পেলেন একজন ডেমোক্র্যাট।
অ্যাডাম হ্যামিলটন, কানসাস: ১৯৯৪ সালের পর টেক্সাসে যে সাফল্য কোনো ডেমোক্র্যাট অর্জন করতে পারেননি, হ্যামিলটন তার চেয়েও বড় সাফল্য পেয়েছেন। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন তিনি। কানসাসে সবশেষ ১৯৩২ সালে সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা।
জশ টুরেক, আইওয়া: ২০১৪ সালে ট্রাম্প এই অঙ্গরাজ্যে ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট আসনটিতে এবার ৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন টুরেক।
অ্যানি অ্যান্ড্রুজ, সাউথ ক্যারোলাইনা: ২০২৪ সালে ট্রাম্প এই অঙ্গরাজ্যেও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর তার বোন ডারলিনকে আসনটি পূরণের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগপর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন এবং ট্রাম্পের জোরালো সমর্থন পেয়েছিলেন। তবে তাতে কাজ হয়নি। অন্তত ৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন অ্যান্ড্রুজ।
রয় কুপার, নর্থ ক্যারোলাইনা: আগে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি ডেমোক্র্যাটদের করে নেওয়ার পাশাপাশি বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন কুপার। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক হোয়াটলিকে প্রায় ২০ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন তিনি।
ট্রয় জ্যাকসন, মেইন: আগে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন জ্যাকসন। প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে সুসান কলিন্সকে পরাজিত করেছেন তিনি।
শেরড ব্রাউন, ওহাইও: রিপাবলিকান প্রার্থী জন হাস্টেডকে প্রায় ৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়েছেন ব্রাউন।
আবদুল এল-সায়েদ, মিশিগান: রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের বিপক্ষে জয় পেয়েছেন এল-সায়েদ। মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইগুলোর একটি ছিল এটি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হচ্ছেন সায়েদ।
প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের জয়
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসনের বেশি পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
এই জয়ের মধ্যে আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির দখলে থাকা বেশ কয়েকটি আসনও রয়েছে।
সিনেটে জয়ের খবর ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ঘোষণা দেয় এপি। এর ফলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ এখন দলটির হাতে।
প্রতিবেদন অনুসারে, নির্বাচনে জয়ী হলে ডেমোক্র্যাটরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস কী কী ক্ষমতা পাবে?
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট আইন প্রণয়ন এবং সরকারি ব্যয় অনুমোদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কোনো কক্ষই এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কংগ্রেসের দুই কক্ষের আলাদা কিছু ক্ষমতাও আছে।
উদাহরণস্বরূপ, সরকারের শীর্ষ পদগুলোতে প্রেসিডেন্টের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ অনুমোদনের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে সিনেটের। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্টসহ ফেডারেল আদালতের বিচারক হিসেবে ট্রাম্পের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবে।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণও পায়। এসব কমিটি তদন্ত শুরু করতে, নথিপত্র তলব করতে এবং সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হাজির হওয়ার নির্দেশ দিতে পারে।
এছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে কোনো প্রেসিডেন্ট বা শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে অভিশংসিত করা হলে পরবর্তী বিচার পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে সিনেটের ওপর। সেই বিচার থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদে, ২০১৯ ও ২০২১ সালে ট্রাম্পকে দুবার অভিশংসিত করা হয়েছিল, তবে উভয় ক্ষেত্রেই সিনেট তাকে খালাস দেয়।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডেমোক্র্যাটদের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বাড়তি ক্ষমতা দেবে। কোনো বিল আইনে পরিণত হতে হলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সেটি পাস হতে হবে। এরপর প্রেসিডেন্ট তাতে স্বাক্ষর করবেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় বাধা রয়েছে।
ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর মতো দ্বিদলীয় সমর্থন পাওয়া কোনো প্রস্তাবও ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতার মুখে পড়তে পারে। এরই মধ্যে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ব্যাপকভাবে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চান। সোমবার একটি পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘আমি সবকিছুতেই ভেটো দেব।’
প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের কিছু রিপাবলিকান সদস্যের সমর্থনও নিতে হবে।
ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস কি ট্রাম্পকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারবে?
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস তদন্তের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ক্ষমতা সক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করবে।
তিনি আল জাজিরাকে ইমেইলে বলেন, ‘সময় ব্যয় এবং সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনার পরিমাণ বিবেচনায় ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যাবে এই ক্ষেত্রেই।’
বর্তমানে সিনেটের স্থায়ী তদন্তবিষয়ক উপকমিটিতে শীর্ষস্থানীয় ডেমোক্র্যাট সদস্য রিচার্ড ব্লুমেনথাল। মঙ্গলবারের নির্বাচনের ফলাফলের পর তিনি কমিটির চেয়ারম্যান হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্লুমেনথাল ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখতে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা ব্যবহার করবে ডেমোক্র্যাটরা। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা অবশ্যই সমন জারির ক্ষমতা ব্যবহার করব।’
কংগ্রেসের তদন্ত পরিচালনার জন্য হোয়াইট হাউসের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। এসব তদন্ত ট্রাম্পের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। গত দুই বছরে তার পরিবার ক্রিপ্টোকারেন্সি, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রেডিকশন মার্কেটসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে।
এ বছর প্রকাশিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ইতোমধ্যে এ ধরনের তদন্তের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। কয়েকজন সিনেটর বিভিন্ন কোম্পানি ও সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে নথিপত্র সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব চিঠিতে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণের জন্য ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
তবে এসব তদন্তে সংশ্লিষ্ট সবাই সহযোগিতা করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে সিনেটের সমন জারির বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন। এতে তদন্ত কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে।
ব্লেসিং মনে করেন না যে ট্রাম্পের পরিবারের নিকটতম সদস্যরা সমন পেয়ে হাজির হবেন। তবে সরকারি কর্মচারী এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিসহ আরও অনেক সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা।
এর মাধ্যমে ট্রাম্প ও তার মিত্রদের সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়ে তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া নিশ্চিত নয়। সম্ভাব্য অপরাধের প্রমাণ প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠাতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। কিন্তু অভিযোগ দায়ের করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ট্রাম্পের বিচার বিভাগকে।
অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিশংসনের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অভিশংসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়নি। এ কারণে কিছু ডেমোক্র্যাট নেতার মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে, ভোটারদের সরাসরি প্রভাবিত করা বিষয়গুলোতে মনোযোগ না দিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তদন্তে কতটা সময় ব্যয় করা উচিত।
ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেস কি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে?
ডেমোক্র্যাটরা আগামী ৩ জানুয়ারির আগে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করতে পারবে না।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক গবেষক ত্রিতা পারসি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের ক্ষেত্রে আগামী দুই মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তার মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় ডেমোক্র্যাটরা চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই ট্রাম্প যুদ্ধ আরও তীব্র করতে পারেন।
পারসি বলেন, ‘অপমান ও পরাজয়ের মুখে তিনি (ট্রাম্প) আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, এমন একটি প্রবণতা তিনি দেখিয়েছেন।’
ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করতে তাদের কঠোর অবস্থান নিতে হবে বলে মনে করেন পারসি। এর মধ্যে যুদ্ধের অর্থায়ন সীমিত করার উদ্যোগও থাকতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক অভিযানের জন্য আগে থেকেই বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় চালিয়ে যেতে পারবে। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকায় যুদ্ধের জন্য নতুন অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব আটকে দিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।
পারসি বলেন, ‘এটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সময়সীমা সীমিত করে দেবে। যুদ্ধের জন্য আরও অর্থের প্রয়োজন হলে তা অন্য খাত থেকে সহজে সরিয়ে নেওয়ার মতো সামান্য অর্থের বিষয় হবে না।’
তবে যেকোনো বাজেট বিল পাস করতে হলে ট্রাম্পের সম্ভাব্য ভেটো মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত ভোট প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া সামরিক ব্যয় সীমিত করতে ডেমোক্র্যাটরা আদৌ কতটা আগ্রহী, সেটিও একটি প্রশ্ন।
ব্লেসিং উল্লেখ করেন, মার্কিন সেনাদের দুর্বল করার অভিযোগ উঠতে পারে এমন আশঙ্কায় ঐতিহাসিকভাবে ডেমোক্র্যাটরা সামরিক অর্থায়ন বন্ধ করতে অনীহা দেখিয়ে এসেছে। তবে যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়াতে আরও কিছু পথ অনুসরণ করতে পারে দলটি।
উদাহরণস্বরূপ, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে যুদ্ধ এবং হামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন আইনের শাসন মেনে চলেছে কি না, তা তদন্ত করতে পারে তারা।
স্বাধীন নজরদারি সংস্থা ‘প্রজেক্ট অন গভর্নমেন্ট ওভারসাইটের’ নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ডেভিড জানোভস্কি বলেন, ‘কঠোর নজরদারি নিজে থেকেই সামরিক অভিযান বন্ধ করবে না। তবে এটি যুদ্ধের রাজনৈতিক ব্যয় এতটাই বাড়িয়ে দিতে পারে, যা প্রেসিডেন্ট বা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।’
যুদ্ধ সীমিত করার উদ্যোগে ডেমোক্র্যাটরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে কি না, তা-ও এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পারসি সতর্ক করে বলেছেন, দলটি যদি ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ না নেয়, তাহলে এর রাজনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘তখন এটি আর শুধু ট্রাম্পের যুদ্ধ থাকবে না। ডেমোক্র্যাটরাও এর অংশীদার হয়ে যাবে। কারণ, যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা কিছু না করে এর সঙ্গে জড়িত থাকবে।’
ডেমোক্র্যাটদের সিনেট কি জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে পারবে?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংকট ছিল অন্যতম।
সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অর্থনীতিবিদ ডিন বেকার মনে করেন, এসব উদ্বেগ কমাতে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার বাণিজ্যের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বেকারের মতে, যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সিনেটে তদন্ত শুরু করলে যুদ্ধ বন্ধের রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম কমতে পারে এবং পারিবারিক ব্যয়ের ওপর চাপও কিছুটা কমতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর উদ্যোগও নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা।
২০২৫ সালে অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিককে স্বাস্থ্যবিমার জন্য বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা এসব ভর্তুকি পুনর্বহালের চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে করা কাটছাঁটও প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারে তারা।
বেকার বলেন, সরকারি ব্যয় নিয়ে আলোচনার সময় এসব পদক্ষেপে রিপাবলিকানদের সম্মত করতে চাপ প্রয়োগ করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। এসব উদ্যোগে দ্বিদলীয় সমর্থন এবং ব্যাপক জনসমর্থন থাকায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের বিষয়ে বেকার বলেন, ‘তারা এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যাতে ট্রাম্প প্রস্তাবটিতে ভেটো দিতে না চান।’
এছাড়া ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহারের উদ্যোগও নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। তবে এ জন্য প্রতিনিধি পরিষদের সমর্থন এবং ট্রাম্পের অনুমোদন অথবা তার ভেটো বাতিল করার মতো পর্যাপ্ত ভোট প্রয়োজন হবে। তবে এসব উদ্যোগ সফল হলেও পণ্যের দাম রাতারাতি কমবে না।
প্রগতিশীল অর্থনৈতিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবরেটিভের নীতি ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান অ্যালেক্স জ্যাকেজ বলেন, ‘দামের ক্ষেত্রে রকেট ও পালকের মতো আচরণ দেখা যায়। দাম রকেটের মতো দ্রুত ওপরে ওঠে, কিন্তু পালকের মতো ধীরে নিচে নামে।’
তবে ট্রাম্পের অনুমোদন ছাড়াও উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণের আরেকটি পথ রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে।
সিনেটের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি, এসব বিষয়ে কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে তারা।
জ্যাকেজ আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হাতে থাকা এবং প্রধান নির্বাহীদের সমন পাঠিয়ে কংগ্রেসে হাজির করার ক্ষমতা ব্যবহার করেই বাস্তব পরিবর্তন আনার অনেক নজির রয়েছে।’
সূত্র: আল জাজিরা