
মিশিগানে ইতিহাস গড়ার পথে এল-সায়েদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৯

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, চলতি বছরের শেষেই ইসরাইলকে দেওয়া মার্কিন সহায়তা বন্ধ করা হবে। তার দাবি, ইসরাইলের এখন আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন সকালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে তার সমঝোতা হয়েছে।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোগ্রহণ চলছে। পরে ফলাফল আসতে শুরু করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। যেখানে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের ভরাডুবি হয়েছে। এছাড়া ১০০ আসনের সিনেটেও বিজয় নিশ্চিত করেছে বিরোধীরা।
নির্বাচনের আগে থেকেই বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে রিপাবলিকানদের সমালোচনা করছেন। ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
ট্রাম্প বলেন, ইসরাইল এখন বেশ সমৃদ্ধ একটি দেশ। তারা আর মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সহায়তা দেয়। কিন্তু এই অর্থ নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা রিপাবলিকানদের আক্রমণ করছেন। তাই সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। দেশটিকে অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু এখন তাদের আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই। তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের অর্থের প্রয়োজন হলে সহায়তা চালু রাখতেন। তবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে কয়েক মাস আগেই সমঝোতা হয়েছে।
মার্কিন সহায়তা বন্ধ হলে কী হবে?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের বর্তমান ১০ বছর মেয়াদি সামরিক সহায়তা চুক্তি ২০১৮ সালে কার্যকর হয়। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর ইসরাইলকে ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়। ২০২৮ সালে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।
এই অর্থ দিয়ে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে পারে। ফলে সহায়তার অর্থ শেষ পর্যন্ত মার্কিন অস্ত্র প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই যায়।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, বছরের শেষেই এই সহায়তা বন্ধ হতে পারে। তবে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় তা বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার মনে করেন, ইসরাইলকে সহায়তার বিষয়টি এখন রিপাবলিকান পার্টির মধ্যেও বড় বিভাজন তৈরি করেছে। রিপাবলিকানদের কট্টরপন্থী অংশের কয়েকজন নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
তার মতে, ইসরাইলে সরকার গঠনের আলোচনা চলার সময় ট্রাম্পের এমন ঘোষণা বেশ অস্বস্তিকর। কারণ, এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর প্রতিপক্ষের সমালোচনা
ট্রাম্পের ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের বিরোধী রাজনৈতিক নেতা গাদি আইজেনকোট। তিনি নেতানিয়াহুর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে জোট গঠনের চেষ্টাও করছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আইজেনকোট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অথচ দেশটির প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা ও সাধারণ মানুষ সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে এই কৌশলগত সম্পর্কের পরিবর্তনের কথা জানতে পারছেন। নেতানিয়াহুর এমন আচরণ ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনক। তার ওপর আর আস্থা রাখা যায় না।
নেতানিয়াহু এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। তবে এত দ্রুত সহায়তা বন্ধের কথা বলেননি। গত মে মাসে দুই দেশ বিদ্যমান চুক্তির পরিবর্তে নতুন একটি চুক্তি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। তবে এ বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
গত সপ্তাহে ইসরাইলের নির্বাচনের কয়েক দিন আগে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাওয়া সামরিক সহায়তা একসময় বন্ধ হবে। সে বাস্তবতার জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখবে যুক্তরাষ্ট্র
ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করছেন, নাকি সরাসরি অর্থ দেওয়া বন্ধ করছেন? জবাবে ট্রাম্প বলেন, বিষয়টি যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, ইসরাইলকে দেওয়া অর্থ ও সামরিক সরঞ্জামের সহায়তা বন্ধ হবে। তবে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্র কিনতে পারবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তারা ট্রাম্পের ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে আবারও যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ ছাড়া ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসেও বিরোধিতা বাড়ছে। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা এ বিষয়ে আপত্তি তুলছেন। তবে গত জুলাইয়ে প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া বার্ষিক প্রতিরক্ষা বিলের একটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়াইর গোলানও। তিনি বলেন, একজন দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল মার্কিন সহায়তা বাড়ানোর চেষ্টা করা, বন্ধ করার পরিস্থিতি তৈরি করা নয়। নেতানিয়াহু ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করছেন।
নেতানিয়াহুর জীবনীকার ও সাংবাদিক আনশেল ফেফারও এ ঘটনাকে নেতানিয়াহু এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রন ডারমারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি সম্পর্কে নিজেদের বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করলেও নেতানিয়াহু ও ডারমার দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অবনতি ঘটিয়েছেন।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদেও ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরেও ইসরাইলের কাছে ২৮০ কোটি ডলারের ভারী বোমা বিক্রির অনুমোদন দেয় তার প্রশাসন। ফলে সহায়তা বন্ধের ঘোষণা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সিএনএন থেকে অনুদিত