
পূজায় উৎসবের আমেজ বাড়বে সবজি খিচুড়িতে
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৩৩

অতিরিক্ত পরচর্চায় কমতে পারে বিশ্বাসযোগ্যতা। ছবি: সংগৃহীত
কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের নিয়ে ফিসফাস, কানাঘুষা কিংবা ব্যক্তিগত আলোচনা নতুন কিছু নয়। কখনো এসব কথাবার্তা সহকর্মীদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ায়, আবার কখনো তা কারও সম্মানহানি, মানসিক চাপ ও পেশাগত সম্পর্ক নষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে কর্মক্ষেত্রে পরচর্চা কি সব সময় ক্ষতিকর? নাকি কিছু ক্ষেত্রে এটি অন্যকে সতর্ক করারও উপায়?
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কর্মক্ষেত্রে পরচর্চার ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই ধরনের প্রভাবই রয়েছে। আলোচনার বিষয়, উদ্দেশ্য এবং তথ্যের সত্যতা নির্ধারণ করে দেয়, এই কথাবার্তা কারও উপকার করবে, নাকি ক্ষতির কারণ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি টেলিভিশন স্টেশনে কাজ করার সময় স্টেফানি জোসেফকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল একটি মিথ্যা গুজব। বলা হচ্ছিল, বিবাহিত এক সহকর্মীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। তখন তার বয়স মাত্র ২০ বছর। ওই সহকর্মীকে তিনি ভালোভাবে চিনতেনও না। এক প্রযোজকের কাছ থেকে গুজবটি ছড়িয়ে পড়ার কথা জানতে পারেন তিনি।
এ ঘটনায় অপমানিত বোধ করেছিলেন জোসেফ। তার প্রশ্ন ছিল, যেসব মানুষের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন, তারা কি তার চরিত্র সম্পর্কে কিছুই জানেন না?
এই ঘটনা কর্মক্ষেত্রে গুজবের ভয়াবহ দিকটি সামনে আনে। যাচাই না করা একটি কথা মুহূর্তেই কারও ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক সম্মান ও পেশাগত পরিচিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। এমনকি গুজবের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই, তাকেও এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
কখন পরচর্চা হয়ে উঠতে পারে সতর্কবার্তা?
সব ধরনের পরচর্চাকে অবশ্য ক্ষতিকর বলা যায় না। কখনো কোনো সহকর্মী বা ব্যবস্থাপকের অনুপযুক্ত আচরণ সম্পর্কে অন্যদের সতর্ক করা জরুরি হয়ে উঠতে পারে।
ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির ব্যবস্থাপনা, তথ্যব্যবস্থা ও উদ্যোক্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক স্টিফেন লির মতে, কর্মক্ষেত্রে কারও আচরণ নিয়ে আলোচনা অনেক সময় উপেক্ষিত কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। কোনো সহকর্মী যেন হয়রানি, অপমানজনক আচরণ কিংবা অন্য কোনো সমস্যার শিকার না হন, সে জন্য তাকে সতর্ক করাও এমন আলোচনার উদ্দেশ্য হতে পারে।
যেমন, কোনো ব্যবস্থাপক নিয়মিত কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করলে কিংবা কোনো সহকর্মী অন্যদের হয়রানি করলে সে বিষয়ে সতর্কবার্তা অন্যদের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করতে পারে।
তবে গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু মুখে মুখে কথা ছড়ানো যথেষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি ননপ্রফিট নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব ও সক্ষমতা উন্নয়নবিষয়ক ফেলো বেভ ভিটালির পরামর্শ, সমস্যাটি সমাধানের ক্ষমতা রয়েছে এমন ব্যক্তি বা বিভাগের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা উচিত। যেমন—প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অর্থাৎ, কাউকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে কোনো তথ্য জানানো আর যাচাই ছাড়াই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়।
মানসিক চাপ কমাতেও ভূমিকা রাখে?
কর্মক্ষেত্রে অপ্রীতিকর কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে বিশ্বস্ত সহকর্মীর সঙ্গে তা নিয়ে কথা বলা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। কোনো ব্যবস্থাপকের আচরণে কষ্ট পেলে কিংবা সহকর্মীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে নিজের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে অনেকে স্বস্তি পান।
স্টিফেন লির মতে, বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে এমন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলে পরিস্থিতির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণবোধও বাড়তে পারে।
রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার অধ্যাপক রেবেকা গ্রিনবাউম, যিনি কর্মক্ষেত্রে পরচর্চা নিয়ে গবেষণা করেন, তার মতে, এ ধরনের কথাবার্তা সহকর্মীদের মধ্যে সহযোগিতা ও একাত্মতার অনুভূতি বাড়াতে পারে। অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা বোঝেন—এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার জন্য ব্যক্তিগত তথ্য ভাগ করে নেন।
তবে সহকর্মীর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা আর তার কোনো নির্দিষ্ট আচরণ সম্পর্কে পরামর্শ চাওয়া এক নয়। আলোচনার লক্ষ্য যদি সমস্যার সমাধান ও মানসিক সমর্থন পাওয়া হয়, তাহলে তা গঠনমূলক হতে পারে।
এ ছাড়া পরচর্চা মানেই নেতিবাচক কথা নয়। কোনো সহকর্মীর ভালো কাজের প্রশংসা তার অনুপস্থিতিতেও অন্যদের কাছে তুলে ধরা ইতিবাচক আলোচনার উদাহরণ।
অতিরিক্ত পরচর্চায় কমতে পারে বিশ্বাসযোগ্যতা
কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত অন্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করলে একসময় নিজের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। সহকর্মীরা ভাবতে পারেন, তাদের অনুপস্থিতিতেও একইভাবে তাদের নিয়ে কথা বলা হচ্ছে কি না।
নিউইয়র্কভিত্তিক শিষ্টাচার ও ব্যক্তিত্ব উন্নয়ন পরামর্শক মারিয়া হামবার্টের মতে, পেশাগত পরিচিতি গড়ে ওঠে বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর। কেউ যদি নিয়মিত নেতিবাচক আলোচনা কিংবা গুজব ছড়ানোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে সেই বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এর প্রভাব শুধু সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কাজের উৎপাদনশীলতাও কমে যেতে পারে।
বেভ ভিটালি নিজের কর্মজীবনের একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, একসময় সম্ভাব্য একীভূতকরণ ও কর্মী ছাঁটাই নিয়ে গুজবের আলোচনায় তিনি নিজেও জড়িয়ে পড়েছিলেন। কে কী শুনেছেন, কী ঘটতে যাচ্ছে—এসব জানতে গিয়ে তার কাজের মূল্যবান সময় নষ্ট হতো। ফলে গুজব নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ততা কর্মক্ষেত্রে মনোযোগ ও কাজের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
পরচর্চার পর অপরাধবোধ হলে কী করবেন?
কোনো আলোচনা উপকারী ছিল, নাকি ক্ষতিকর—তা বোঝার একটি উপায় হলো আলোচনার পর নিজের অনুভূতি খেয়াল করা।
রেবেকা গ্রিনবাউমের পরামর্শ, নিজেকে প্রশ্ন করুন—কেন অন্যের বিষয়ে কথা বলছেন? কাউকে সতর্ক করার জন্য, সমস্যার সমাধান খুঁজতে, নাকি নিছক বিনোদনের জন্য? যে তথ্যটি ছড়াচ্ছেন, তা সত্য কি না এবং সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনামের কতটা ক্ষতি করতে পারে, তা-ও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আলোচনার পর যদি অপরাধবোধ বা লজ্জা তৈরি হয়, তাহলে সেই অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এটি নিজের নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে আচরণের অসংগতির ইঙ্গিত হতে পারে।
বেভ ভিটালির মতে, প্রতিষ্ঠানের বাইরের কোনো বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে নিজের বিরক্তি বা কষ্ট ভাগ করে নেওয়া অনেক সময় ভালো বিকল্প। কারণ, গুজব নিয়ে আলোচনা সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে।
গুজবে অংশ নিতে না চাইলে কী করবেন?
সহকর্মীদের সঙ্গে মানিয়ে চলার জন্য অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পরচর্চায় অংশ নেন। কিন্তু নেতিবাচক আলোচনা এড়িয়ে গিয়েও পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি কৌশল কাজে আসতে পারে—
বিষয় পরিবর্তন করুন: কেউ অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা শুরু করলে মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিন।
নিরপেক্ষভাবে সাড়া দিন: বলতে পারেন, ‘আপনার কথাটা বুঝতে পারছি, তবে পুরো বিষয়টি আমি জানি না।’
তথ্য যাচাই ছাড়া মন্তব্য করবেন না: কোনো অভিযোগ শুনেই সেটিকে সত্য ধরে অন্যের কাছে প্রচার করবেন না।
সমস্যা গুরুতর হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানান: হয়রানি, হুমকি কিংবা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ থাকলে দায়িত্বশীলভাবে তা তুলে ধরুন।
ইতিবাচক বিষয়ে কথা বলুন: ভ্রমণ, খাবার, খেলাধুলা, সপ্তাহান্তের পরিকল্পনা কিংবা কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করুন।
মারিয়া হামবার্টের মতে, এসব উপায়ে নেতিবাচক আলোচনায় অংশ না নিয়েও সহকর্মীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
পরচর্চার আগে একবার ভাবুন
মানুষ স্বভাবতই অন্য মানুষের আচরণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী। কিন্তু সেই আগ্রহ যেন কারও ক্ষতির কারণ না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
স্টেফানি জোসেফের পরামর্শও তেমনই—কথা বলার আগে ভাবতে হবে, যে তথ্যটি ছড়াতে যাচ্ছেন তা মিথ্যা কি না এবং সেই কথা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামনে বলার সাহস বা যুক্তি আপনার আছে কি না।
কর্মক্ষেত্রে পরচর্চা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়তো সম্ভব নয়। তবে সত্যতা যাচাই, আলোচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা এবং অন্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখার মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব।
কারণ, আজ যে মানুষটিকে নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে, কাল সেই মানুষটি আপনিও হতে পারেন। তাই সহকর্মীর আচরণ নিয়ে আলোচনা করার আগে মনে রাখা জরুরি—কথা শুধু সম্পর্ক তৈরি করে না, কখনো তা ভেঙেও দেয়।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)