
থাইল্যান্ডে জাতীয় কোরআন প্রতিযোগিতায় রাজা-রানির উপস্থিতি, সম্মাননা পেলেন বিজয়ীরা
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৯

হিজরি সনের ১২টি মাসের মধ্যে পঞ্চম মাস হলো জুমাদাল উলা
ইসলামি বর্ষপঞ্জি চাঁদের আবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। হিজরি সনের ১২টি মাসের মধ্যে পঞ্চম মাস হলো জুমাদাল উলা। আরবি ভাষায় মাসটি ‘জুমাদাল আউয়াল’ নামেও পরিচিত। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে এ মাস ২৯ অথবা ৩০ দিনের হয়ে থাকে। ইসলামের ইতিহাসে এ মাসকে ঘিরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যুদ্ধ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের স্মৃতি আলোচিত হয়।
‘জুমাদা’ শব্দটির সঙ্গে শুষ্কতা ও পানির অভাবের ধারণা যুক্ত। আরবি ভাষার শব্দমূল অনুসারে, শীতের এমন সময়ের সঙ্গে নামটির সম্পর্কের কথা বলা হয়, যখন পানি জমে যাওয়া কিংবা ভূমি শুষ্ক হয়ে থাকার পরিস্থিতি দেখা দিত। তবে মাসটির নামকরণের ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভাষাগত অর্থ ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রাখা প্রয়োজন।
জুমাদাল উলা মাসে ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
ইসলামের ইতিহাসে জুমাদাল উলা মাসের সঙ্গে যুক্ত সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো মুতার যুদ্ধ। হিজরি ৮ সালের জমাদিউল উলা মাসে সংঘটিত এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পর্যায়ক্রমে যায় যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.), জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)-এর ওপর। তাঁরা একে একে শাহাদাতবরণ করলে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেননি।
মুতার যুদ্ধের ইতিহাস মুসলিম বাহিনীর আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দৃঢ়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে এ যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় মতপার্থক্য রয়েছে। তাই মাসের সঙ্গে ঘটনাটির সম্পর্ক উল্লেখ করা হলেও নির্দিষ্ট দিনকে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত বলা উচিত নয়।
জুমাদাল উলা মাসে যেসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতি আলোচিত হয়
জুমাদাল উলা মাসের সঙ্গে হজরত যায়েদ ইবনে হারিসা (রা.), হজরত জাফর ইবনে আবু তালিব (রা.) ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)-এর শাহাদাতের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত। মুতার যুদ্ধে তাঁদের আত্মত্যাগ ইসলামের প্রাথমিক যুগের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
কিছু ঐতিহাসিক ও পরবর্তী ইসলামি বর্ষপঞ্জিভিত্তিক লেখায় এ মাসের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ এবং তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করা হয়। তবে এসব ঘটনার মাস ও তারিখ নিয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে মতভিন্নতা রয়েছে। তাই এগুলোকে নিশ্চিতভাবে জুমাদাল উলা মাসের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
জুমাদাল উলা মাসের কয়েকটি বহুল প্রচলিত তারিখ
কিছু ইসলামি বর্ষপঞ্জি ও ঐতিহাসিক ঘটনাপঞ্জিতে ৫ জুমাদাল উলাকে হজরত যায়নাব বিনতে আলী (রা.)-এর জন্মদিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একইভাবে ১০ জুমাদাল উলাকে হজরত ফাতিমা (রা.)-এর ইন্তেকাল এবং ১৫ জুমাদাল উলাকে আলী ইবনে হুসাইন (রহ.)-এর জন্মদিন হিসেবে উল্লেখ করার প্রচলন রয়েছে। তবে এসব তারিখের ঐতিহাসিক নির্ভরযোগ্যতা ও মতভেদ যাচাই না করে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
ইসলামি বর্ষপঞ্জিতে প্রতি হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ ‘আইয়ামে বিজ’ বা উজ্জ্বল দিন হিসেবে পরিচিত। এ তিন দিন নফল রোজা রাখা সম্পর্কে হাদিসে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু জুমাদাল উলা মাসের জন্য নির্দিষ্ট নয়; বরং সারা বছরের হিজরি মাসগুলোতেই এ আমল করা যায়।
উটের যুদ্ধ ও জুমাদাল উলা
ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো উটের যুদ্ধ। হজরত আয়েশা (রা.)-এর পক্ষ এবং হজরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনীর মধ্যে ৩৬ হিজরিতে বসরার কাছে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের সময় ও তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো ঘটনাপঞ্জিতে এ যুদ্ধকে জুমাদাল উলা মাসের সঙ্গে যুক্ত করা হলেও একে সর্বসম্মত ও নিশ্চিত তারিখ হিসেবে উল্লেখ করা যায় না।
হিজরি সনের সূচনা কীভাবে
হিজরি বর্ষপঞ্জি মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে প্রশাসনিক প্রয়োজনে একটি সুসংহত ইসলামি বর্ষপঞ্জি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৭ হিজরি সালের দিকে এ বিষয়ে পরামর্শের ভিত্তিতে হিজরতকে বর্ষ গণনার সূচনাবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করা হয়। যদিও বর্ষপঞ্জির সূচনা হিজরতের বছর থেকে গণনা করা হয়, এর আনুষ্ঠানিক প্রবর্তন ঘটে পরবর্তী সময়ে।
হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম। এরপর সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জুমাদাল উলা ও জুমাদাল আখিরা আসে। এরপর রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ—এভাবে ১২ মাসে একটি হিজরি বছর পূর্ণ হয়।
জুমাদাল উলা মাস থেকে আমাদের শিক্ষা
জুমাদাল উলা মাসের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো মুসলিমদের সামনে আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ, নেতৃত্ব ও ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে কোনো নির্দিষ্ট মাস বা দিনের সঙ্গে কোনো ঘটনা যুক্ত থাকলেই সেই দিনকে বিশেষ ধর্মীয় ইবাদত, উৎসব কিংবা রোজার জন্য নির্ধারিত মনে করার সুযোগ নেই—যতক্ষণ না কোরআন ও নির্ভরযোগ্য সুন্নাহ থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসলামের ইতিহাসকে নির্ভরযোগ্য সূত্রের আলোকে জানা, সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং প্রমাণিত ইবাদতগুলো নিয়মিত পালন করা। এভাবেই হিজরি মাসগুলোর পরিচিতি কেবল তারিখ গণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মুসলিমদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে পারে।