
কঠিন বিপদে যে ৩ দোয়া পড়তে বলেছেন নবীজি
সুনয়না বৃষ্টি
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:৪

চলছে শারদীয় দুর্গাপূজার সপ্তমী তিথি। ফাইল ছবি
শারদীয় দুর্গাপূজার মূল ভাবনা হলো অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয় আর অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা। হিন্দুধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পুরাণ অনুযায়ী, দেবী দুর্গার তিনটি কল্পের তৃতীয় কল্পে দশভুজা হয়ে মহিষাসুর বধ করেছিলেন। অত্যাচার ও অসত্যের প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করতে দেবতাদের সম্মিলিত ঐশ্বরিক গুণ থেকে আর্বিভূত হয়েছিলেন দেবী দুর্গা।
দেবতাদের দেয়া অস্ত্র দশ হাতে নিয়ে তিনি সিংহের ওপর আরোহন করে অসত্য-অন্যায়ের প্রতীক মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে হত্যা করেন। তাই মানুষের অসুর মন, অন্ধকার, অহংকার ও সমাজের অসত্য-অন্যায়ের বিরুদ্ধে জয়ের জন্য যুগে যুগে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন মর্ত্যবাসীর ভক্তরা।
প্রাচীন ঐতিহ্যে দেবী দুর্গার আরাধনার বিভিন্ন সময়ের কথা উল্লেখ থাকলেও সময়ের পরিক্রমায় শরৎকালের দেবী দুর্গার পূজা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। আর শরৎকালের এ দুর্গাপূজার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হিন্দু ধর্মের দশ অবতারের এক অবতার শ্রীরামচন্দ্রের কাহিনি।
হিন্দু পৌরাণিক মহাকাব্য অনুযায়ী, রাবণ ছিলেন লঙ্কার (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) রাক্ষসরাজ। অসত্য ও অন্যায়ের প্রতীক এ রাক্ষসরাজের কাছে যখন সীতা দেবী বন্দি হন তখন স্ত্রীকে উদ্ধার ও রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য এই শরৎকালেই শ্রীরাম দেবী দুর্গার শক্তি আরাধনা করেন যা রামের ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিত।
তবে শ্রীরামের এ অকালবোধনের কাহিনি বাল্মীকী রচিত রামায়নে বর্ণিত নেই। এটির উল্লেখ রয়েছে কৃত্তিবাসের লেখা রামায়ণে। তাই অকালবোধন আর দুর্গাপূজা এক নয়। বর্তমানে শ্রীরামের দুর্গাপূজার সঙ্গে মিলিয়ে শরৎকালে দুর্গা আরাধনায় মেতে ওঠেন বাঙালিরা।
শরৎকালে দেবীর আরাধনা ও পূজা ‘শারদীয় দুর্গাপূজা’ নামে পরিচিত। এ পূজার ঘোষণা দেয় মহালয়া তিথি। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের (অমাবস্যা) শেষ তিথিটি হলো মহালয়া। এ তিথিতে অমাবস্যার সমাপ্তির সাথে সাথে সমাপ্তি ঘটে পিতৃপক্ষের এবং শুভ সূচনা হয় দেবীপক্ষের। আর এটিই জানান দেয় মা দুর্গার আগমনী বার্তা।
মহালয়ার ঠিক ৫ দিন পর শুরু হয় দুর্গাপূজার ষষ্ঠীর তিথি। আর এ ষষ্ঠীর তিথির মধ্য দিয়েই শুরু শারদীয় দুর্গাপূজা। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনটিতে ভক্তের ডাকে দেবী দুর্গা তাঁর সব শুভ শক্তির প্রতীকরূপ সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে আগমন করেন।
মর্ত্যলোকে দেবীর আগমনের জন্য ভক্তরা আশ্বিনের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর কল্পারম্ভ, বোধন, অধিবাস এবং আমন্ত্রণ– এই চারটি আচার করেন।
* কলারম্ভ: ষষ্ঠীর ভোরে কল্পারম্ভে সূর্য উদয়ের পর দুর্গা মণ্ডপে জলভর্তি তামার কলস বা ঘট স্থাপন করা হয়। এরপরে দুর্গা ও চণ্ডীর পূজা করা হয়। এর মাধ্যমে দুর্গাপূজার সংকল্প নেয়া হয়।
* বোধন: ওই দিনই গোধূলি বা সন্ধ্যায় তিথি ও ক্ষণ মেনে বোধন বা মা দুর্গাকে জাগরণের পূজা শুরু হয়। এই সময়ে সূর্যের দক্ষিণায়ন চলে, যা দেবতাদের নিদ্রাকাল। বোধন ঘরে বা বোধন স্থলে বেদির উপর বেলগাছ বা বেলপাতা বসানো হয়। এর সামনে পঞ্চপল্লব ও ডাব দিয়ে ঘট স্থাপন করা হয়। পঞ্চপল্লবে আম, অশ্বত্থ, বট, পাকুড় এবং যজ্ঞডুমুরের পাতা দেয়া হয়। মর্ত্যলোকে দেবী না আসা পর্যন্ত ওই বেলগাছটিকে দেবী কল্পনা করে আরাধনা করা হয়। এ আচারে দেবীকে জাগিয়ে তোলা হয় প্রার্থনার মাধ্যমে। বোধনের পূজায় শিব, দুর্গা, নারায়ণ ও কুলদেবতার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়।
* অধিবাস: বোধনের পরে শুরু হয় অধিবাস পর্ব। এ পর্বে জাগ্রত দেবীকে ভক্তের পূজা নেয়ার জন্য প্রার্থনা করা হয়। এ সময় শঙ্খ, কাঁসর, ঢাকের বাদ্য এবং উলুধ্বনি দিয়ে শুভ শক্তির আবাহন করা হয়।
সপ্তমী
আশ্বিনের শুক্ল পক্ষের সপ্তমী তিথিতে দেবীকে পূজা গ্রহণ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। দুর্গাপূজার সপ্তমী হলো দুর্গোৎসবের মূল বা প্রধান পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা। এই দিনে সপ্তমী তিথিতে নবপত্রিকা স্নান (কলাবউ স্থাপন) ও প্রাণপ্রতিষ্ঠা (কল্পারম্ভ)-এর মাধ্যমে দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা এবং মূল উপাসনা শুরু হয়।
* নবপত্রিকা স্নান (কলাবউ স্নান): সপ্তমীর সকালে দেবী দুর্গাকে আবাহনের আগে নবপত্রিকাকে (যাকে জনপ্রিয় ভাষায় 'কলাবউ' বলা হয়) নদী বা জলাশয়ে স্নান করিয়ে মন্দিরে আনা হয়। নয়টি উদ্ভিদ (কলা, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, ডাড়িম, অশোক, মান ও ধান) মিলে এই নবপত্রিকা তৈরি হয়, যা দেবী দুর্গার নয়টি রূপ এবং প্রকৃতির উর্বরতা ও জীবনের প্রতীক।
* প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও চক্ষুদান: ষষ্ঠীতে বোধনের পর সপ্তমীতে দেবীপ্রতিমা মন্ডপে স্থাপন করে পবিত্র মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে দেবীর চক্ষুদানের আচারে মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মাধ্যমে মা দুর্গার শক্তি মণ্ডপে পূর্ণরূপে জাগ্রত হয়।
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, সপ্তমীর দিন থেকেই দেবী দুর্গা ও মহিষাসুরের মধ্যকার যুদ্ধ বা আনুষ্ঠানিক সংগ্রামের সূচনা হয়। যা জগতের সমস্ত ভয়, বাধা ও অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটায়।
সপ্তমী থেকেই দেবী দুর্গার ষোলোটি উপচারে পূজা করা হয়। সকালে ভক্তরা মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দেন এবং ফুল-বেলপাতা নিবেদন করেন। সন্ধ্যায় প্রদীপ, ঢোল, কাঁসর ও শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে সন্ধ্যারতি অনুষ্ঠিত হয়। দিনটি থেকেই দেবী দুর্গা ও তার শক্তির দর্শন পেতে আনুষ্ঠানিকভাবে মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় শুরু করেন ভক্তরা।
প্রসঙ্গত, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার সপ্তমী তিথি শুরু হয়েছে শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভোর ৫টা ৫৪ মিনিটে এবং শেষ হবে রোববার (১৮ অক্টোবর) সকাল ৮টা ২৭ মিনিটে। তিথিটি দুই দিনের সূর্যোদয়ের মাঝে অবস্থান করায় অঞ্চলভেদে সময়ের পার্থক্যের কারণে দুই দিনই সপ্তমীর রীতিনীতি উদ্যাপন হচ্ছে।