
বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রকল্প দেখলেন প্রধানমন্ত্রী, বাস্তবায়নে সহায়তার আশ্বাস
প্রতিবেদক, কুমিল্লা
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৪৯

নিহত জান্নাতুল তাজমীন। ছবি: সংগৃহীত
‘বাবা, তারা আমাকে আটকে রেখেছে। তুমি এসে আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও। না হলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে বাবা।’ মোবাইল ফোনে বাবার কাছে এটাই ছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমীনের শেষ আকুতি। এই ফোনকলের কয়েক ঘণ্টা পরই ঘাতকদের হাত থেকে বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা শেষে ধানক্ষেতে নির্মমভাবে খুন হতে হয় তাকে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর (মানুমুড়া) এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে ওই কিশোরীর বিবস্ত্র মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থলজুড়ে মিলেছে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন, পাশেই পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
সরেজমিনে জগতপুর গ্রামের নির্জন পাকা সড়কের পাশের অন্তত চার-পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ মাড়ানো ও এলোমেলো অবস্থায় দেখা যায়। এসব চিহ্ন দেখে স্থানীয়দের ধারণা, হত্যাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে কিশোরীটি প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল এবং দিগ্বিদিক ছুটেছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, সকালে সড়কের এক পাশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকতে দেখে তিনি এগিয়ে যান। অটোরিকশা থেকে ২০-৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ দেখতে পান তিনি। এরপর ধস্তাধস্তির চিহ্ন অনুসরণ করে সামনে এগোতেই কাদায় মাথা গোঁজানো অবস্থায় নারীর বিবস্ত্র মরদেহ দেখতে পান। তার গলায় একটি গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে তিনি গামছা দিয়ে মরদেহটি ঢেকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে বিষয়টি জানান।
আরেক বাসিন্দা মো. মুহিন বলেন, ‘ধানক্ষেতের অবস্থা দেখেই বোঝা যায়, মেয়েটিকে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিজের জীবন বাঁচাতে সে অনেক চেষ্টা করেছিল। তবে হত্যাকারীরা কেন অটোরিকশা ফেলে গেল, তা একটি বড় প্রশ্ন।’
নিহত তাজমীন রেনাটা ফার্মাসিউটিক্যালসে কর্মরত আবদুল আলীম ও কেয়া আক্তার দম্পতির মেয়ে। তাদের গ্রামের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করত সে।
পরিবার জানায়, চার দিন আগে বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমীন। পরে ওই বান্ধবীর সঙ্গে সে কক্সবাজারে যায়। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় সে। পথিমধ্যেই দুর্বৃত্তরা তাকে আটকে রেখেছিল বলে সে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবাকে ফোনে জানিয়েছিল। তবে সে কোথায় রয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেনি। এরপর তার ফোনে একাধিকবার কল করলেও আর সাড়া পাওয়া যায়নি।
আবদুল আলীম বলেন, ‘মেয়েটি রাতে ফোনে কেঁদে কেঁদে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছিল। কিন্তু কোথায় আছে, তা বলতে পারেনি। সকালে থানায় এসে আমাকে মেয়ের লাশ দেখতে হলো।’
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, নিহতের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি, তবে গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির নিবন্ধন রয়েছে। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ শুরু করেছে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় তাজমীনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
তাজমীন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাজমীনের মরদেহ নিয়ে যশোরের উদ্দেশে রওনা দেন স্বজনরা। ছাতিয়ানতলা এলাকায় গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।