
বাবাকে হত্যার পর আত্মগোপনে, প্রতিবেশীর বাড়িতে মোবাইল চার্জ দিতে গিয়ে ধরা ছেলে

গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে বের হওয়া গ্যাসে জ্বলে উঠেছে আগুন। ছবি: সময় সংবাদ
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের স্থান থেকে বের হওয়া গ্যাসে জ্বলে ওঠা আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে ইনানীর ছোটখাল সংলগ্ন সিকদারবাজার এলাকার একটি বাড়ির আঙিনায় আগুনের সূত্রপাত হয়। বিকেল ৫টার পর আগুনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। আগুনের শিখা দেখতে মেরিন ড্রাইভ ও ছোট ব্রিজ এলাকায় ভিড় করেন উৎসুক মানুষ।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর একটি দল কাজ করছে। তবে উচ্চচাপে গ্যাস নির্গত হওয়ায় আগুন নেভানোর চেষ্টা সফল হয়নি। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ঢাকায় থেকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল রাত ১০টায় ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
পর্যবেক্ষণ শেষে বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বেরিয়ে আসার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। গ্যাসের প্রকৃত উপাদান ও বৈশিষ্ট্য পরীক্ষার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে আগুন বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের দলনেতা এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, ইনানীতে গ্যাস উদ্গিরণ ও আগুনের ঘটনাটি প্রাথমিকভাবে উচ্চচাপের গ্যাসের অনিয়ন্ত্রিত নির্গমন বা ‘ব্লোআউট’-এর মতো মনে হচ্ছে। প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে নলকূপ খননের সময় গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ভূগর্ভের উচ্চচাপের গ্যাস বিভিন্ন ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে এসে থাকতে পারে। পরে কোনো উৎস থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এসে গ্যাসে আগুন ধরে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার ধরন দেখে গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তবে গ্যাসের প্রকৃত উপাদান ও বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয়া হবে।
এস এম নাফিকুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় জোর করে এর প্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এতে গ্যাস অন্য কোনো ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে বেরিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আপাতত মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্ঘটনা এড়াতে আগুনের চারপাশে অন্তত ২০০ মিটার, সম্ভব হলে আরও বেশি এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের মাত্রা বিশ্লেষণ না করে আগুন কত দিন জ্বলবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, পাইপলাইনের গ্যাস হলে ভালভ বন্ধ করে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখানে প্রাকৃতিকভাবে উচ্চচাপে গ্যাস বের হচ্ছে, যার প্রবাহ স্বাভাবিক গ্যাসলাইনের তুলনায় অনেক বেশি।
তিনি বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বালু ও বালুভর্তি সিমেন্টের বস্তা ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি চারদিক থেকে পানি ছিটিয়েও আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর একটি দল এসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে এবং নিরাপত্তার বিষয়টি দেখেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ দিন আগে ওই বাড়ির আঙিনায় নলকূপ বসানোর জন্য খননকাজ শুরু হয়। প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করেও পানি পাওয়া যায়নি। পরে তিন দিন আগে খননকাজ অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। মঙ্গলবার ভোরে আগের খনন করা স্থান থেকে হঠাৎ গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে গ্যাসে আগুন ধরে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সকাল ৭টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। পরে সেখানে বালু আনা হয়। তবে বালু ও বস্তা ফেলার পর আগুনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।
বাড়ির মালিক মো. আবদুল্লাহ বলেন, দুই বছর আগে ২০ শতক জমি কিনে সেখানে কয়েকটি রিসোর্ট নির্মাণ করেছি। পরিবার নিয়ে ওই এলাকায় বসবাস করি। প্রায় ১৫ দিন আগে জমিতে নলকূপ বসানোর কাজ শুরু হয়। এক হাজার ফুট খনন করেও পানি না পাওয়ায় পরে খননকাজ অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে আগের খনন করা স্থান থেকে হঠাৎ গ্যাস বের হয়ে আগুন জ্বলে ওঠে। শ্রমিকেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা এখনো সেখানে অবস্থান করছেন। আগুন যেভাবে জ্বলছে, তাতে পরিবার নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য শামশুল আলম বলেন, পরিত্যক্ত খননস্থান থেকে গ্যাস বের হওয়ার পর বিদ্যুতের তারের সংস্পর্শে এসে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন ধারণা করছেন। আগুন নেভাতে কয়েক ঘণ্টা ধরে চেষ্টা চললেও সফলতা আসেনি। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক গোলাম মুর্শিদ সরকার বলেন, ঘটনাস্থলে স্থানীয় বাসিন্দা ও উৎসুক মানুষের ব্যাপক সমাগম হয়েছে। তাদের নিরাপদ দূরত্বে রাখা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাজ করছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ব্রিটিশ আমলেও এ এলাকায় গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। পরে সেই গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ছাড়া এলাকায় প্রায় ৪০০ ফুট গভীরে খনন করলেও গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের মধ্যে ধারণা রয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
স্থানীয় বাসিন্দা করিম সিকদার মনে করেন, এলাকায় গ্যাসের উপস্থিতি ও সম্ভাব্য খনিজ সম্পদ সম্পর্কে জানতে সরকারের দ্রুত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চালানো উচিত।
খবর পেয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ও উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।
ইউএনও পান্না আক্তার বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে আগুন নেভানোর কৌশল নির্ধারণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও এক্সকাভেটর আনার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনাস্থলে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আছে কি না, তা নিশ্চিত হতে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলকে ডাকা হয়েছে। দলটি গ্যাসের নমুনা পরীক্ষা ও কারিগরি অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করবে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া এ এলাকায় গ্যাসের মজুত সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
এ মুহূর্তে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা, উৎসুক মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই প্রশাসন কাজ করছে।