
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকাতারে আটকে আছে পাকিস্তানের লাগেজ, বাতিল অনুশীলন
মোশারফ হোসাইন
প্রকাশ: রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৫৬

রাণীশংকৈলের এই মাঠে অর্ধশত নারী ফুটবলার অনুশীলন করেন। ছবি: লেখক
ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়াম থেকে ৩৯৮ কিলোমিটার দূরে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে রাঙ্গাটুঙ্গি মহিলা ফুটবল একাডেমির মাঠ। প্রত্যন্ত এই গ্রামের মাঠে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে অনুশীলন করতে আসেন স্কুলপড়ুয়া মেয়েরা। মাঠে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় অর্ধশতাধিক মেয়ে ফুটবল অনুশীলনে ব্যস্ত। তাদের কারও স্বপ্ন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামা, কারও লক্ষ্য ফুটবল খেলে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করা।
সামাজিক নানা বাধা পেরিয়ে স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলেছে এই অঞ্চলের মেয়েরা। একাডেমির নারী ফুটবলারদের সাফল্য তাদের অনুপ্রেরণা জোগায়, সাহস দেয় সামনে এগিয়ে যাওয়ার। এই একাডেমি থেকেই উঠে এসে জাতীয় দলে খেলছেন মোছা. সাগরিকা, স্বপ্না রানী সরকার ও কুহাতি কিসকুর মতো ফুটবলার। বয়সভিত্তিক জাতীয় দলেও সুযোগ পেয়েছেন কয়েকজন।
তবে এই পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ফুটবল খেলতে গিয়ে সামাজিক কটূক্তি, পরিবারের আপত্তি, নিরাপত্তাহীনতা ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। শুনতে হয়েছে, ‘মেয়ে মানুষ হয়ে ফুটবল খেলবে কেন’, ‘প্যান্ট পরে মাঠে যাবে কেন’— এমন নানা প্রশ্ন। কখনও এসব কটূক্তি পৌঁছে গেছে পরিবারের কানেও, তৈরি হয়েছে নতুন বাধা। এমনকি মেয়েরা ফুটবল খেলতে আসায় মাঠ কেটে নষ্ট করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এত প্রতিকূলতার পরও মনোবল হারাননি তারা। বরং সব বাধা পেরিয়ে ফুটবলের মাঠেই নিজেদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছেন অদম্য এই মেয়েরা।
একসময় যেসব অভিভাবক মেয়েদের ফুটবল খেলতে পাঠাতে চাইতেন না, সময়ের সঙ্গে তাদের অনেকের মনোভাবেও এসেছে পরিবর্তন। এখন তারাই মেয়েদের একাডেমিতে ভর্তি করাতে নিয়ে আসেন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনই রাণীশংকৈলের প্রত্যন্ত গ্রামের মাঠে জাগিয়ে তুলছে নতুন সম্ভাবনা। যে মাঠে একসময় মেয়েদের খেলাধুলা নিয়ে ছিল আপত্তি, সেই মাঠই এখন হয়ে উঠছে তাদের স্বপ্নপূরণের ঠিকানা।
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলের বলিদ্বারা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্বী আক্তার। খুব ছোট থেকেই অনুশীলন করতে আসেন। পরিবার শুরু থেকেই তাকে সমর্থন করেছে। তবে বাসা থেকে মাঠে আসার সময় গ্রামের মানুষ তাকে নানা কথা শোনায়। তন্বী বলেন, ‘মেয়ে মানুষ প্যান্ট পরে খেলবে—এমন নানা আজেবাজে কথা বলে। বাসায় গিয়েও অনেকে বলেছে, কেন মেয়েকে খেলতে পাঠাচ্ছেন। ধর্মীয় বিষয় নিয়েও কথা বলেছে। পরিবার আমাকে সমর্থন দিয়েছে, যে কারণে এখনও মাঠে আসতে পারছি।’’
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুহিমা রানী খুশি বলেন, ‘তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে ফুটবল খেলা শুরু করি। তবে শুরু থেকেই পরিবারের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এলাকার মানুষও নানা কথা বলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মেয়ে মানুষের ফুটবল খেলা ভালো না, এমন কথা শুনতে হয়েছে। এলাকার মানুষ বলত, তোমরা খেলতে যেয়ো না, এটা সমাজের সঙ্গে মানায় না। যাতায়াতের সময়ও কিছুটা সমস্যা হয়। যাওয়ার পথে অনেকে এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা বলা সম্ভব নয়। এসব সহ্য করেই মাঠে আসি। আমি খেলোয়াড় হতে চাই, বাবা-মায়ের নাম উজ্জ্বল করতে চাই।’
খুশির আক্ষেপ, ‘আমরা যদি ছেলে হতাম, কেউ কিছু বলত না। ছেলেদের তো কেউ কিছু বলে না। মেয়ে হয়ে জন্মেছি বলেই এসব কথা শুনতে হচ্ছে।’
এসব কথা শুনে কখনও খেলা ছেড়ে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে খুশি বলেন, ‘প্রথম দিকে এমনটা হয়েছিল। দুই দিন খেলতে আসিনি। পরে একা একাই মনে হয়েছে, মানুষের কথায় খেলা ছেড়ে দিলে হবে না। আমরা মেয়ে মানুষ, আমাদের এসব কথা শুনতেই হবে। দুই দিন পর আবার মাঠে এসেছি।’
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়া কিসকু বলেন, ‘আমরা দূরদূরান্ত থেকে মাঠে আসি। আমার চাওয়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং মাঠের পরিবেশ আরও ভালো করা।’ জয়া আরও বলেন, ‘বাসা থেকে মা প্রায়ই বলে, খেলতে না যাওয়াই ভালো। তবে মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি। আমি এখন পর্যন্ত যতদূর গিয়ে খেলেছি, অনেক ছেলেও সেই পর্যায়ে যেতে পারেনি।’ খেলায় আসার ক্ষেত্রে সামাজিক বাধার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জয়া আরও বলেন, ‘আমি খেলতে আসতে চাইতাম। কিন্তু সমাজের মানুষের কথা শুনে আমাকে আসতে দেওয়া হতো না। ওইসময় বল দেখতে না পাওয়ার কারণে অনেক কষ্ট পেয়েছি। অনেক কান্নাও করেছি।’
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুহাসিনী বলেন, ‘খেলতে আসার সময় অনেকে বাজে কথা বলেন। আমার চাওয়া, একটু নিরাপত্তা যেন থাকে। মানুষ যেন এসব কথা না বলে। আমার ইচ্ছে দেশের হয়ে খেলব।’
রাঙাটুঙ্গি ইউনাইটেড মহিলা একাডেমির প্রশিক্ষক গোপাল মুর্মু সুগা বলেন, ‘অনেক মেয়ে সাত কিলোমিটার দূর থেকেও অনুশীলন করতে আসেন। তাদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি। প্রতিদিন ৫০ জনের বেশি মেয়ে অনুশীলন করেন। এলাকাবাসী সহযোগিতা করলে মেয়েরা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তবে এমন সময়ও গেছে, এলাকাবাসীর কারণে এক সপ্তাহ খেলা বন্ধ ছিল।’
রাঙ্গাটুঙ্গি ইউনাইটেড মহিলা ফুটবল একাডেমির পরিচালক তাজুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে এলাকার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ‘আগে আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলতাম, আপনার মেয়েটাকে দেন, আমরা একাডেমিতে ভর্তি করাব। কিন্তু অভিভাবকেরা দিতে চাইতেন না। এখন অভিভাবকেরাই আসেন, বলেন, আমার মেয়েটাকে খেলা শেখান।’