
কক্সবাজারে গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ, স্বামী গ্রেফতার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:৫৮

অভিযানে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা টেকনাফ থানায়। ছবি: সময় সংবাদ
কক্সবাজারের টেকনাফের হ্নীলায় পাহাড়ে সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের বন্দিশালা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করছে যৌথ বাহিনী। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে তাদেরকে টেকনাফ থানায় হস্তান্তর করা হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে রঙ্গীখালীর গহীন পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের বন্দিশালায় অভিযান চালায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ। এ সময় পাচারকারীদের গুলিতে বাম কাঁধে গুলিবিদ্ধ হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এসময় মানবপাচারকারী চক্রের ৫ জন সদস্যকে আটক করার পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা হয় জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের। এই অভিযানে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশন, বিজিবি ও পুলিশ অংশ নেয়।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে ঘটনায় আটক আরো পাঁচজনকে পরবর্তীতে পুলিশের সোপর্দ করা হবে।’
ওসি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার ৫৭ জনের উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে তথ্য যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে জানা যায় একজন দালালও ওখানে যাত্রী হিসেবে আত্মগোপনে ছিলেন। এছাড়া পাহাড়ে অভিযানের সময় গুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
ঝুপড়িতে বন্দি, পালানোর চেষ্টায় ব্যর্থ ও উদ্ধার
টেকনাফ মডেল থানা হেফাজতে থাকা ফরিদপুরের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান বললেন, ‘আটদিন ধরে মানবপাচারকারীরা পাহাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরে অনেককে বন্দি করে রেখেছিল। এরমধ্যে দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও পারিনি। পাহাড়ে ৪০-৫০ জনের একটি সশস্ত্র পাহারাদল ছিল।’
তিনি জানালেন, একটি ব্রিজে চাকরির সুবাদে উখিয়ার কুতুপালং শিবিরে রোহিঙ্গা ইমামুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে শিবিরে কাজ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আটদিন আগে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। কেড়ে নেয়া হয় মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সবকিছু। পরে রাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তাকে পাহাড়ে নিয়ে মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়া হয়।
আসাদুজ্জামানের ভাষ্যমতে, পাহাড়ে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তার মতো আরও অর্ধশতাধিক মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে। তখনই বুঝতে পারেন, তিনি মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন।
তিনি আরও জানালেন, ‘দুইদিন আগে শতাধিক নৌকাসহ একটি ট্রলার সাগরপথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাকে আরও পাঁচজনের সঙ্গে সেখানে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জায়গা না থাকায় সেদিন ট্রলারে তোলা হয়নি। সর্বশেষ গতকাল আমাদের পাচারের পরিকল্পনা ছিল। ভাগ্যিস, সেনাবাহিনী এসে আমাদের উদ্ধার করেছে। হঠাৎ করে বৃহস্পতিবার বিকেলে অভিযান চালানো হয়। এসময় মানবপাচারকারী ও যৌথ বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
লাখ টাকায় বিক্রি
উখিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাইফুল ও মিজানুর রহমান বলেন, ‘কাজ দেয়ার কথা বলে মো নূরালী নামে এক দালাল মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। পরে পাচারকারীদের কাছ থেকেই জানতে পারি, তারা আমাদের দুজনকে এক লাখ টাকায় কিনেছেন। পাঁচদিন ধরে দেখেছি, প্রতিদিন চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ এনে সেখানে জড়ো করা হচ্ছে। কেউ কথা বলতে চাইলে তাকে ব্যাপক মারধর করা হতো। আমরাও পালানোর চেষ্টা করায় মারধরের শিকার হয়েছি। পরে আমাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়।’
তারা আরও জানালেন, ‘দিনে দুই বেলা খাবার দেয়া হতো। খাবার হিসেবে দেয়া হতো কাঁচা কদু আর ডাল। গতকাল ট্রলারে তুলে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারের কথা ছিল। এর আগেই যৌথবাহিনী আমাদের উদ্ধার করেন।’
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা দিন দিন বাড়ছে। শীত মৌসুমে মানবপাচারকারীদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। বৃহস্পতিবার পাচারকারীদের আস্তানায় গোলাগুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা আর কী হতে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পাহাড়ে সাঁড়াশি অভিযান অত্যন্ত জরুরি।’
আইনজীবী মো. তৌহিদুল এহেছান বলেন, টেকনাফের সমস্যা দীর্ঘদিনের। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে মানবপাচার, মাদক, চোরাচালান, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়সহ নানা অপরাধ দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এমনকি সেখানে অপরাধীদের নিজস্ব এক ধরনের সমান্তরাল অপরাধী বলয় গড়ে উঠেছে, যার কাছে সাধারণ মানুষ অনেকটা অসহায়।
তিনি বলেন, তাই টেকনাফে তিন বাহিনীর যৌথ অভিযানকে আমি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি। এমন অভিযান আরও অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল। তবে এই অভিযানের মধ্য দিয়ে আমরা একজন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে হারিয়েছি, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে সশস্ত্র মানবপাচারকারীদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। অপরাধ করে কারো পার পাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা খোঁজখবর রাখছি।
তিনি আরও বলেন, মানবপাচারকারীদের গুলিতে একজন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। এ ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
এদিকে, ফরিদপুরের নগরকান্দার লস্করদিয়া গ্রামে চলছে সেনাসদস্য তিতাস শেখকে হারানোর শোক। সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা পরিবার, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে তিতাস শেখকে।