
বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা জানালেন বিপাশা বসু
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৬

গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাথা ন্যাড়া করার একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করে নিজের অনুভূতির কথা জানান সামিয়া। ছবি: সংগৃহীত
চুল হারানোর কষ্ট যেন একা বয়ে বেড়াতে না হয়, তাই স্ত্রীর পাশে দাঁড়ালেন স্বামী, মায়ের প্রতি ভালোবাসা জানাতে মাথা ন্যাড়া করল ছেলেও। ক্যানসারের কঠিন সময়ে পরিবারের এই নিঃশর্ত ভালোবাসা হয়ে উঠেছে সাহস, সংহতি আর একসঙ্গে লড়াই করে যাওয়ার অনন্য গল্প।
ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই কেবল শরীরের নয়, মনেরও। চিকিৎসার নানা ধাপ, শারীরিক পরিবর্তন, অনিশ্চয়তা আর মানসিক চাপ—সবকিছু সামলে এগিয়ে যেতে হয় আক্রান্ত ব্যক্তিকে। এই কঠিন সময়ে প্রিয়জনের একটু সাহস, ভালোবাসা কিংবা পাশে থাকার আশ্বাসও হয়ে উঠতে পারে অনেক বড় শক্তি। উপস্থাপক সামিয়া আফরিনের জীবনে সেই শক্তির নাম তার পরিবার।
ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় বর্তমানে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন সামিয়া। চিকিৎসার অংশ হিসেবে চুল পড়ে যেতে পারে—চিকিৎসকের কাছ থেকে আগেই এমনটা জেনেছিলেন তিনি। তাই ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন চুল হারানোর জন্য। প্রথমে ছোট করে ফেলেন চুল। এরপর নিজের ছেলের হাতেই মাথা ন্যাড়া করান।
কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা যেন মায়ের প্রতি ভালোবাসার এক আবেগঘন প্রকাশ। মাকে একা চুল হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে দিতে চায়নি ছেলে আহানাফ আরাবি। মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সংহতি জানাতে নিজেও মাথা ন্যাড়া করে হাসিমুখে হাজির হয় সে। ছেলের এই ভালোবাসায় যোগ হয় আরেকটি আবেগের মুহূর্ত।
স্ত্রীকে কঠিন সময়ে একা অনুভব করতে দিতে চাননি স্বামী এস এম রেজাউল ইমরানও। প্রিয় মানুষের পাশে থাকার বার্তা দিতে তিনিও মাথা ন্যাড়া করেন। পরিবারের তিন সদস্যের এই সিদ্ধান্ত যেন নীরবে বলে দেয়—সামিয়ার লড়াই শুধু তাঁর একার নয়, এই লড়াইয়ে তার সঙ্গে রয়েছে পুরো পরিবার।
কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়ার বিষয়টি অনেক ক্যানসার রোগীর জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হতে পারে। চুলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিজের চেহারা, পরিচিত সত্তা ও আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি। চিকিৎসার কারণে সেই পরিচিত রূপ বদলে গেলে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও সহজ হয় না।
সামিয়াও বিষয়টি নিয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে চুল হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মন খারাপ করে না থেকে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তার এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবারের ভালোবাসা যুক্ত হয়ে অভিজ্ঞতাটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাথা ন্যাড়া করার একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করে নিজের অনুভূতির কথা জানান সামিয়া। ভিডিওতে উঠে আসে পরিবারের সদস্যদের পাশে থাকার বিষয়টি। বিশেষ করে ছেলের নিজের মাথা ন্যাড়া করে মায়ের সামনে হাজির হওয়া এবং স্বামীর একই সিদ্ধান্ত নেওয়া—সবকিছুই তাদের পারিবারিক বন্ধনের গভীরতা তুলে ধরে।
তার এই উপলব্ধির মধ্যেই রয়েছে পরিস্থিতিকে নতুনভাবে দেখার একটি বার্তা। সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক রূপে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সাহস, মানসিক দৃঢ়তা, ভালোবাসা গ্রহণ করার ক্ষমতা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও সৌন্দর্যের অংশ।
সামিয়া নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে চেষ্টা করছেন, জীবনের প্রতিটি পরিবর্তনকে সব সময় নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কিছু বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই হয়ে ওঠে এগিয়ে যাওয়ার পথ। চুল পড়ে যাওয়া তাঁর কাছে চিকিৎসার একটি বাস্তবতা; আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পরিবারের সমর্থন তাকে দিচ্ছে বাড়তি সাহস।
ক্যানসারের চিকিৎসায় ওষুধ, চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাব্যবস্থার পাশাপাশি মানসিক সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যরা যখন রোগীর ভয়, দুশ্চিন্তা ও পরিবর্তনগুলোকে সহমর্মিতার সঙ্গে গ্রহণ করেন, তখন কঠিন সময় সামলানোর ক্ষেত্রে রোগী নিজেকে একা মনে না-ও করতে পারেন।
সামিয়া আফরিনের স্বামী ও ছেলের মাথা ন্যাড়া করার ঘটনা তাই শুধু একটি আবেগঘন পারিবারিক মুহূর্ত নয়। এটি প্রিয় মানুষের কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার প্রতীকী প্রকাশ। তারা সামিয়ার চিকিৎসার শারীরিক প্রভাব নিজেরা অনুভব করছেন না ঠিকই, কিন্তু তার অভিজ্ঞতার পাশে দাঁড়ানোর জন্য নিজেদের চেহারায় পরিবর্তন আনতে দ্বিধা করেননি।
এমন ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে রোগীর সব কষ্ট দূর হয়ে যায়। বরং এর অর্থ—কষ্টের সময়টুকুতে তাকে একা থাকতে হবে না। মন খারাপের দিনেও পাশে কথা বলার মানুষ থাকবে, দুর্বল লাগলেও হাত ধরে রাখার কেউ থাকবে, আর কঠিন পথ পেরোনোর সময় মনে হবে, এই লড়াইয়ে নিজের মানুষগুলোও সঙ্গে আছে।
সামিয়া আফরিনের জীবনে সামনে রয়েছে চিকিৎসার আরও ধাপ। সেই পথ কেমন হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে তার স্বামী ও ছেলের এই ভালোবাসার প্রকাশ মনে করিয়ে দেয়, প্রতিকূলতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস অনেক সময় জন্ম নেয় প্রিয়জনদের কাছ থেকেই।
চুল আবারও গজাতে পারে, বাহ্যিক রূপও বদলে যেতে পারে সময়ের সঙ্গে। কিন্তু কঠিন সময়ে পরিবারের মানুষগুলো যেভাবে পাশে দাঁড়ায়, সেই স্মৃতি থেকে যায় দীর্ঘদিন। সামিয়ার গল্প তাই কেবল ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি ভালোবাসার, সহমর্মিতার এবং একসঙ্গে পথ চলার গল্প।
কারণ, কখনো কখনো ভালোবাসা শুধু মুখে বলা হয় না—ভালোবাসা প্রকাশ পায় প্রিয় মানুষের কষ্টের পাশে দাঁড়িয়ে, তার ভয়কে আপন করে নিয়ে এবং নীরবে জানিয়ে দিয়ে, ‘তুমি একা নও, আমরা আছি।’