
আইজেনকোটের সময় ২৮ দিন, কীভাবে মিলতে পারে আসন সমীকরণ?
আব্দুল্লাহ আল মারুফ
প্রকাশ: রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৬
যে ইউরোপকে মনে করা হয় উন্নত জীবন, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর সমৃদ্ধির প্রতীক, সেই ইউরোপেই এখন তরুণদের সামনে অনিশ্চয়তার অন্ধকার! পড়াশোনা শেষ করেও চাকরির নিশ্চয়তা নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, জীবনযাত্রার ব্যয় আর শিক্ষাব্যবস্থার সংকটে অতিষ্ঠ জেন-জিরা। ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটছে রাজপথে। প্যারিসে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ফ্রাঙ্কফুর্টে পেট্রলবোমা ও লুটপাট, সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের আন্দোলনে সরকার পতন। ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস কোথাও থামছে না বিক্ষোভ। প্রশ্ন উঠছে, যে ইউরোপকে একসময় উন্নত বিশ্বের মডেল বলা হতো, সেখানেই কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ একটি পুরো প্রজন্ম?
আন্দোলন আলাদা, ক্ষোভের জায়গা এক
ইউরোপের এই বিক্ষোভগুলোকে শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, দেশভেদে দাবির পার্থক্য থাকলেও সংকটের জায়গাগুলো প্রায় একই। শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
ফ্রান্সে আন্দোলনের শুরু শিক্ষার্থীদের হাত ধরে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতির অসন্তোষ থেকে রাজপথে নামেন তারা। পরে যুক্ত হন শিক্ষক, শ্রমিক সংগঠন ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, তৃতীয় সপ্তাহে আন্দোলনে অংশ নেন প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ। আগের সপ্তাহে এই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ১০ হাজার।
ফ্রান্সের সংকট শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুর্বলতা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপের মধ্যে সরকারি ব্যয় কমানোর তাগিদ রয়েছে। অন্যদিকে নাগরিকদের দাবি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনসেবায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অর্থাৎ একদিকে ব্যয় সংকোচনের চাপ, অন্যদিকে জনসেবায় বিনিয়োগের দাবি। এই দুইয়ের সংঘাতেই ব্যাপক চাপে এমানুয়েল মাক্রোঁ সরকার।
জার্মানিতেও ক্ষোভের ভাষা প্রায় একই। ৩৪টি শহরে ‘জেনজি রেগেল্ট’ নামের সংগঠনের উদ্যোগে বিক্ষোভ করেন তরুণরা। তাদের দাবি, শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে হবে। ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে জার্মানিতে তরুণদের জন্য আবারও সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক করার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। তবে তরুণদের দাবি- জোর করে সেনাবাহিনীতে নেওয়া যাবে না, বরং এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সম্পূর্ণ তাদের ওপরই ছেড়ে দিতে হবে। জার্মানির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন অধিকাংশই শান্তিপূর্ণ থাকলেও বেশ কিছু জায়গায় সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
যে সংকট দেশের সীমানা মানছে না
জেন-জি আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এর কোনো একক সূচনাবিন্দু পাওয়া যায় না। স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন অ্যাবাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আবাসনসংকটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উসকে দেয়। বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, উচ্ছেদের ঝুঁকি এবং সাশ্রয়ী বাসস্থানের অভাব তরুণদের পাশাপাশি বয়স্কদেরও আন্দোলনে যুক্ত করেছে।
পর্তুগালের লিসবনেও আবাসন নিয়ে ক্ষোভ তীব্র। বাড়ির দাম ও ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে শহরে বসবাস কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের দাবি, ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা দিতে হবে এবং উচ্ছেদ সহজ করার প্রস্তাবিত আইন বাতিল করতে হবে।
ইতালিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শ্রমিকরাও বিক্ষোভে নেমেছেন। তাদের দাবি, মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপদ কর্মসংস্থান, শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।
গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। অর্থাৎ, কোথাও বাড়ি নেই, কোথাও ভালো শিক্ষা নেই, কোথাও কাজের নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু সবখানেই প্রশ্ন রাষ্ট্রের উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে কারা?
বিশ্লেষকদের মতে, একটি দেশের আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে। ইতালি ও গ্রিসের বিক্ষোভে ফরাসি আন্দোলনের প্রতি সংহতির স্লোগান এসেছে। স্পেনের আবাসন আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে পর্তুগালেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর যোগাযোগ এই সংহতিকে আরও বিস্তৃত করছে।
অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
ইউরোপের সব আন্দোলনই অর্থনৈতিক দাবি থেকে শুরু হয়নি। কোথাও দুর্নীতির অভিযোগ, কোথাও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আবার কোথাও সরকারের জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দিয়েছে।
সার্বিয়ার ঘটনা ইউরোপের রাজনীতিতে তরুণদের প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে চাপ তৈরি করেছে। ব্যাপক আন্দালনের মধ্যে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ পদত্যাগ করেন। এরপর ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত দল প্রায় ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আর ভুচিচের নেতৃত্বাধীন জোট ভোট পেয়েছে প্রায় ৩৯। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুধু রাজপথের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি; নির্বাচনী রাজনীতিতেও সাড়া জাগানো প্রভাব ফেলেছে।
জেন-জি ক্ষোভ, ইউরোপের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের সরকারগুলো কেন এই ক্ষোভ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে একটি প্রজন্মগত বৈষম্য। আগের প্রজন্মের তুলনায় নতুন প্রজন্মের জন্য বাড়ি কেনা, স্থায়ী চাকরি পাওয়া এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। উচ্চশিক্ষার খরচ, বাড়িভাড়া, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে প্রবেশপর্যায়ের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। উদার গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল- পরবর্তী প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে ভালো জীবন পাবে। কিন্তু তরুণদের কাছে সেই প্রতিশ্রুতি এখন আর বাস্তব বলে মনে হচ্ছে না। এখানেই সংকটের গভীরতা।
গ্রেপ্তার কিংবা কঠোর পুলিশি পদক্ষেপে কি এই ক্ষোভ থামানো সম্ভব? কারণ, তরুণদের মূল সংকট তো রয়েই যাচ্ছে। পড়াশোনা শেষে চাকরি নেই, সাধ্যের মধ্যে বাড়ি ভাড়া পাওয়া কঠিন, নিশ্চিত নয় ভবিষ্যৎও। এই সংকটগুলো সমাধানে ব্যর্থ হলে আজকের বিচ্ছিন্ন আন্দোলন আগামী দিনে ইউরোপের আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।