
মিডটার্মে রিপাবলিকানদের বাজেভাবে ‘ফেল’ করার পাঁচ কারণ
মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:৩

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চলাকালীন চলতি বছরের ২২ এপ্রিল ইসরাইলের তেল আবিবের সমুদ্র সৈকতে এক ব্যক্তিকে ইসরাইলি পতাকা হাতে দৌড়াতে দেখা যায়। ছবি: সংগৃহীত
মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে চারটি নির্বাচনে হেরেছে ইসরাইল। এর মধ্যে একটি ছিল দেশটির নিজেদের জাতীয় নির্বাচন। সবশেষ পরাজয় এসেছে মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।
এই পরাজয়ের ধারা শুরু হয় ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত আলেকসান্দার ভুচিচ এক মাস আগে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার জোট পরাজিত হয়। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে একটি জোটের কাছে হেরে যায় ভুচিচের জোট।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মতো সার্বিয়ার নির্বাচনে ইসরাইল কোনো বড় ইস্যু ছিল না। সেখানে মূলত অভ্যন্তরীণ অসন্তোষই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করেছে। ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ভুচিচ নির্বাচনে হারেননি। তবে তার পরাজয়ের প্রভাব দুই দেশের সম্পর্কে পড়তে পারে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইলের জন্য সার্বিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পশ্চিমা মিত্রদের কেউ কেউ যখন ইসরাইলের কাছে অস্ত্র কিংবা অস্ত্রের যন্ত্রাংশ বিক্রিতে বিধিনিষেধ আরোপ করছিল, তখন তেল আবিবের পাশে দাঁড়ায় সার্বিয়া। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পরদিনই ইসরাইল অস্ত্র ও গোলাবারুদের জন্য সার্বিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়। ভুচিচ তাতে সম্মতি দেন। এরপর ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলা আকাশপথে ইসরাইলে পাঠানো শুরু হয়। ফলে ভুচিচের নির্বাচনী পরাজয় ইসরাইলের জন্য কেবল একজন ঘনিষ্ঠ মিত্রের রাজনৈতিক বিপর্যয় নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, সার্বিয়ার নেতার সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশটির ‘কথা ও কাজ—উভয় ক্ষেত্রেই অটল সমর্থন-এর প্রশংসা করেন। একইসঙ্গে ভুচিচকে ‘ইসরাইলের প্রকৃত বন্ধু’ বলে আখ্যা দেন। এখন যেহেতু ‘প্রকৃত বন্ধু’ ক্ষমতার বাইরে, ফলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের কী হবে?
অস্ত্রের লেনদেন ছিল দুই দিক থেকেই। ২০২৫ সালের আগস্টে সার্বিয়া ইসরাইলি ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য ১.৬ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। গত এপ্রিল মাসে দেশ দুটি একটি কৌশলগত সংলাপ শুরু করে এবং ১৭ সেপ্টেম্বর ভুচিচ বেলগ্রেডে ইসরাইলি নকশায় তৈরি ড্রোন সংযোজনের একটি কারখানার উদ্বোধন করেন।
সবশেষ নির্বাচনে বিজয়ী ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে অস্ত্র রফতানি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি অবশ্য ইউক্রেনের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে। যদি বিষয়টি ইসরাইলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে কি না এবং ড্রোন সংক্রান্ত উদ্যোগটির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
স্টুডেন্ট লিস্ট অবশ্য নির্বাচনী ইশতেহারে গাজার বিষয়ে একটি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘গাজা উপত্যকায় ইসরাইল ফিলিস্তিনি জনগণকে ধ্বংস করার যে সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, আমরা তাতে কোনোভাবেই সহযোগী হব না।’
সার্বিয়ায় ভুচিচের জোট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার দিনেই ব্রাজিলের বামপন্থি ও ইসরাইল-বিরোধী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা পরাজিত হন। তিনি ডানপন্থি ও ইসরাইলন্থি ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেন। এর মধ্য দিয়ে ব্রাজিলকে ঘিরে ইসরাইলের প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা লাগে। জেরুজালেম আশা করেছিল- কলম্বিয়া, পেরু, চিলি, বলিভিয়াসহ লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের মতো ব্রাজিলেও ডানপন্থি সরকার ক্ষমতায় আসবে। এতে ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু লুলার জয়ে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
অক্টোবরের শুরুর দিকে প্রথম দফার নির্বাচনে লুলার চেয়ে এগিয়ে থাকার পর, নেতানিয়াহু বলসোনারোকে ফোন করে অভিনন্দন জানান। নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ইসরাইলের সঙ্গে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন ঘটছে, তার অংশ হিসেবে তারা উভয় দেশ নিজেদের মধ্যকার গভীর বন্ধুত্বকে নতুন করে গড়ে তুলতে আগ্রহী।’ কিন্তু দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলার জয়ে নেতানিয়াহুর এমন আশায় গুড়েবালি।
ফ্লাভিও বলসোনারোর জয় তার বাবা জাইর বলসোনারোর নীতিগুলোর প্রত্যাবর্তন ঘটাবে বলে আশা করা হয়েছিল। ক্ষমতায় থাকার সময় বলসোনারো ২০১৯ সালে জেরুজালেমে একটি বাণিজ্য কার্যালয় খুলেছিলেন, ইসরাইলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা জোরদার করেছিলেন। তবে ২০২২ সালে লুলা যখন জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করেন, তখন তিনি ব্রাজিলকে বলসোনারের বিপরীত পথে পরিচালিত করেন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার আনা গণহত্যার মামলায় ব্রাজিল সমর্থন জানায়।
এছাড়া গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে হলোকাস্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন লুলা। একইসঙ্গে ইসরাইলে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতকে ফিরিয়ে এনেছেন। ব্রাজিলে লুলার পুনর্নির্বাচন জেরুজালেমের প্রত্যাশিত সুযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধীদলীয় নেতা গাদি আইজেনকোটের মিত্ররা কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে দেশটিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি বৃহত্তম দল হিসেবে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে। তার জোট ‘চ্যাঞ্জ ব্লক’-এর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ‘চ্যাঞ্জ ব্লক’ বলছে, নেতানিয়াহুর শিবিরের বাইরের দলগুলো—যার মধ্যে আরব দলগুলোও অন্তর্ভুক্ত-নেসেট -এ আসন সংখ্যার দিক থেকে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। যদিও কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
দেশে ও বিদেশে নানা চ্যালেঞ্জ থাকায় ইসরাইলের জন্য এবার এমন একটি নির্বাচন জরুরি ছিল, যার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী ও স্থিতিশীল সরকার গঠন সম্ভব হবে। এমন সরকারই দেশ পরিচালনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো ফল হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচটি নির্বাচনের সময় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবারও অনেকটা তেমন ফলই পেয়েছে ইসরাইল। নির্বাচনে কোনো দল বা জোট স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে কয়েক মাস ধরে জোট আলোচনা চলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এসব আলোচনা সফল হয়ে সরকার গঠন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই জয়লাভ করেছে। আগামী জানুয়ারিতে যারা শপথ নেবেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মিশিগানের নবনির্বাচিত সিনেটর আব্দুল এল-সায়েদ, যিনি ইসরাইলবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ডেমোক্রেটিক পার্টির মূলধারার নেতারা এল-সায়েদের অবস্থানের কতটা কাছাকাছি যাবেন। কোনো দলের মধ্যে ছোট হলেও সোচ্চার একটি গোষ্ঠী ভোটের সংখ্যায় সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো শক্তিশালী না হলেও বিতর্কের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কংগ্রেসে যখন ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি, সামরিক সহায়তা এবং দেশটির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ওপর নজরদারির মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে, তখন এই প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বার্নি স্যান্ডার্সপন্থি, ইসরাইল-বিরোধী অংশটি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় শক্তিশালী হয়েছে।
এছাড়া ইসরাইলের জন্য সমস্যাটি কেবল ডেমোক্র্যাটিক শিবিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রিপাবলিকানদের মধ্যেও এমন কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে, যারা মঙ্গলবারের শোচনীয় পরাজয়ের জন্য ইসরাইলকেই দায়ী করছে।
প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি শিরোনাম ছিল: ‘ট্রাম্পের মিত্ররা রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যয়কর পরাজয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করছেন: ‘আশা করি শুমার (সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা) নেতানিয়াহুকে ফোন করে তাকে ধন্যবাদ জানাবেন।’
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট সরাসরি ইসরাইলকে দায়ী করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করা কিছু ভোটার মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর পেছনে চারটি প্রধান কারণ ছিল: ইরানে যুদ্ধের অবসান ঘটানো, জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেয়া, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকাকে অগ্রাধিকার দেয়া) নীতি অনুসরণ করা এবং ইসরাইলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের পরিবর্তন আনা।
যুক্তিটি হলো এই রকম: রিপাবলিকানরা নির্বাচনে হেরেছে কারণ জ্বালানির দাম ছিল বেশি। আর জ্বালানির দাম বেশি ছিল ইরান যুদ্ধের কারণে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে সেই যুদ্ধে টেনে এনেছিলেন। সুতরাং, দোষটা ইসরাইলের।
আগামী দুই বছর ট্রাম্প হোয়াইট হাউসেই থাকবেন। তবে ইসরাইলকে এখন ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সামনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে হবে। একই সময়ে যখন খোদ প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কেউ কেউ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের জন্য ইসরাইলকেই দায়ী করছেন।
ইসরাইলে নতুন সরকার গঠিত হোক বা না হোক, ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। ইসরাইলের অনিষ্পন্ন নির্বাচনের ঝুঁকি এটাই। জেরুজালেমে কে ক্ষমতায় আসবে তা নির্ধারিত হতে হতে ওয়াশিংটনের পরিস্থিতি হয়তো সম্পূর্ণ বদলে যাবে। এমনকি তখন ইসরাইলের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক রাখা উচিত, তা নিয়ে হয়তো নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়ে যাবে।
সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট