
নলছিটিতে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকে ছিনিয়ে নিলো স্বজনরা
প্রকাশ: রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২১:১৪

নান্দাইলের মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয়। ছবি: সময় সংবাদ
প্রধান শিক্ষক, দুই সহকারী শিক্ষক, কর্মচারীসহ ১৬ সদস্যের মধ্যে ৯ জনই প্রতিষ্ঠাতার পরিবারের সদস্য ও স্বজন। বিদ্যালয় তো নয়, এ যেন এক পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। তবে, বিপত্তি বেধেছে সম্প্রতি দুই শিক্ষিকার (প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী ও ভাইয়ের স্ত্রী) এমপিওভুক্তির আবেদন করতে গিয়ে নিয়োগ জালিয়াতি সামনে আসায়। নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলপত্রে জাল করা হয়েছে সরকারি দুই কর্মকর্তার স্বাক্ষর। তদন্তেও মিলেছে জালিয়াতির প্রমাণ। এমন ঘটনা ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয়ে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের হালিউড়া এলাকায় ২০০২ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক প্রতিষ্ঠা করেন মুক্তিযোদ্ধা উচ্চ বিদ্যালয়। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে পারিবারিক বলয় তৈরির। প্রতিষ্ঠাতার ছেলে প্রধান শিক্ষক, দুই পুত্রবধূও আছেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে।
২০১৫ সালে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ইংরেজি ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে নিয়োগ পান প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী কামরুন্নাহার সুধা ও তার ভাইয়ের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার। সম্প্রতি তাদের এমপিওভুক্তির আবেদন করতে গিয়ে সামনে আসে নিয়োগে জালিয়াতির অভিযোগ। ওই নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট নথিতে ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্বে থাকা চণ্ডীপাশা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক (অবসরপ্রাপ্ত) নাজির উদ্দিন আহাম্মদ এবং নান্দাইলের তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আইনুল ইসলামের স্বাক্ষর ও সিল জাল করা হয়েছে।
পরবর্তীতে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা লিখিতভাবে জানান, তারা ওই নিয়োগ পরীক্ষায় উপস্থিত ছিলেন না এবং নথিতে থাকা স্বাক্ষর তাদের নয়। স্বাক্ষরসংক্রান্ত অসংগতির কারণে নিয়োগের ফাইলটি বিভিন্ন সময়ে প্রায় ছয়বার সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তৎকালীন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আইনুল ইসলামের দাফতরিক রেজিস্টারে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফলপত্রের স্বাক্ষরেও রয়েছে দৃশ্যমান অমিল।
জালিয়াতি করে নিয়োগ দেয়া শিক্ষকের মুখোমুখি হয় সময় সংবাদ। স্কুলে মাহমুদা আক্তারকে পেলেও, অনিয়মিত থাকেন কামরুন্নাহার সুধা। মাহমুদার দাবি, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই নিয়োগ হয়েছে তার। মাহমুদা আক্তার জানান, ২০১৫ সালে নিয়োগ পেলেও এখন পর্যন্ত তিনি এমপিওভুক্ত হতে পারেননি। তার দাবি, নিয়োগ পরীক্ষায় ডিজির প্রতিনিধি নাজির উদ্দিন আহাম্মদ, বিদ্যালয়ের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। তিনি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েই নিয়োগ পেয়েছেন।
তবে নিজের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করে মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘বিদ্যালয়ের সভাপতি আমার শ্বশুর এবং প্রধান শিক্ষক আমার ভাসুর। এখানে নিজেদের লোক বেশি হয়ে গেছে, মানুষের চোখে হয়তো বিষয়টি পড়েছে।’
এত বছরেও এমপিওভুক্ত না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানাতে পারেননি। বলেন, ‘চাকরির এমপিওভুক্তির জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
শুধু দুই শিক্ষক নিয়োগ নয়, বিদ্যালয়ের অফিসের ছয় কর্মচারীর সবাই প্রতিষ্ঠাতার আত্মীয়। এছাড়া প্রধান শিক্ষকের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থাকা ও সরকারি টিউশন ফি আত্মসাতের অভিযোগও শিক্ষকদের।
বিদ্যালয়ের গণিতের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ শরাফ উদ্দিন জানান, ২০০৩ সাল থেকে বিদ্যালয়ে চাকরি করলেও তিনি কখনো টিউশন ফির টাকা পাননি।
সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মোহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২২ সালে এনটিআরসিএর তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত তিনি কোনো টিউশন ফি পাননি। বিভিন্ন পরীক্ষার পর কখনও ৫০০ বা ১ হাজার টাকা দেয়া হলেও তা নিয়মিত টিউশন ফির অংশ নয়।
তিনি বলেন, টিউশন ফির অর্থ মূলত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য পাওয়ার কথা। কিন্তু তারা কেউ নিয়মিতভাবে তা পান না। বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানালে তিনি কমিটি না থাকার কথা বলে পরবর্তী সময়ে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রধান শিক্ষকের আগের চাকরি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকেও হাজিরা খাতায় একসঙ্গে একাধিক দিনের স্বাক্ষর করেছেন। একই সময়ে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এসকেএফ নামের একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেছেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষকের এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ২০১৯ সালে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার পর বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তিনি আবার বিদ্যালয়ে আসছেন। তবে তার বকেয়া বেতন এখনও পরিশোধ করা হয়নি। বকেয়া বেতন পেতে প্রধান শিক্ষক তার কাছে ছয় লাখ টাকা দাবি করেছেন। টাকা দিতে না পারায় বকেয়া বেতন আটকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতেন এবং এসকেএফের চাকরি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন জানিয়ে বলেন, চাকরি ছেড়ে বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন।
টিউশন ফি আত্মসাতের অভিযোগের জবাবে তিনি দাবি করেন, ২০১০ সালে বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত হওয়ার পর ২০১১ সাল থেকে টিউশন ফির অর্থ আসতে শুরু করে। ২০২৩ সালের আগ পর্যন্ত এ অর্থ বিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজে ব্যয় করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, সীমানাপ্রাচীর, মাঠ ভরাট, পুকুর খনন ও রাস্তা নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ অর্থ ব্যয় করেছেন। তবে ২০২৩ সালের পর নিয়মিত কমিটি না থাকায় টিউশন ফির টাকা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
জাল স্বাক্ষর নিয়ে স্ত্রী ও ভাইয়ের স্ত্রীর নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক বলেন বলেন, ‘এখানে কোনো জাল সাক্ষরের ঘটনা ঘটেনি। যারা এখন দাবি করছেন যে স্বাক্ষর দেন নি। তাদের কিছু চাহিদা ছিল তা পূরণ করতে না পারায় এখন এমনটা বলছেন হয়তো। আর নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠাতা (বাবা) সম্পন্ন করেছেন। এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।’
এদিকে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবদুল মালেকের বক্তব্যেও প্রধান শিক্ষকের অনিয়মিত উপস্থিতির বিষয়টি উঠে আসে। তিনি জানান, তার ছেলে সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন বিদ্যালয়ে আসতেন। বাকি সময়ে একজন মৌলভি শিক্ষক এবং পরে অন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালানো হতো। তবে এসকেএফে চাকরির বিষয়টি তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন।
আর নিয়োগ জালিয়াতির ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু সাক্ষর দিয়েছি। এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক বলতে পারবেন।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর বলছে, এরই মধ্যে তদন্তে নিয়োগ জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। ব্যবস্থা নিতে মহাপরিচালকের দফতরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহা. নাসির উদ্দীন জানান, নিয়োগের ফলাফল শিটে স্বাক্ষর জালের অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত বক্তব্য চাওয়া হয়। তারা স্বাক্ষর নিজেদের নয় বলে নিশ্চিত করেছেন। অর্থাৎ নিয়োগটি অবৈধ। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রতিবেদনটি মাউশির প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট জারি করা স্মারকের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক, ডিজির প্রতিনিধি ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিলের নিয়োগ পরীক্ষায় তাদের উপস্থিতি ও স্বাক্ষরের বিষয়ে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত বক্তব্য দিতে বলা হয়েছিল। জবাব পাওয়ার পর স্বাক্ষর জালের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় প্রতিবেদনটি অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত ঢাকা কার্যালয় থেকে আসবে।
২০১০ সালে এমপিওভুক্ত হওয়া বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৬ষ্ট থেকে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ৩২৮ জন।