
দোহায় শুরু হচ্ছে বিশ্ব কুরআন সম্মেলন, থাকছেন বিশিষ্ট গবেষক ও কারিরা
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪৯

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল কেন্দ্রীয় মসজিদ
দক্ষিণ কোরিয়ায় ইসলাম ধর্মের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ইসলামের সুস্পষ্ট শিক্ষা, নৈতিক জীবনব্যবস্থা এবং মুসলিমদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ধর্মটি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হচ্ছেন দেশটির অনেক তরুণ। তাঁদের কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করে নতুন ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ে জীবন শুরু করছেন।
ইকনার বরাতে কোরিয়া টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠা প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে অনুমান করা হয়। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিশ ও ত্রিশের দশকের তরুণ। তবে এই সংখ্যার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে ‘ইউসুফ’ ছদ্মনামে পরিচিত ত্রিশোর্ধ্ব এক কোরীয় মুসলিমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ২০১৪ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় এবং তাঁদের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখার মাধ্যমে ইসলামের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ধর্মটি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
কোরীয় নওমুসলিমদের অনেকে ইসলামের একত্ববাদের শিক্ষা তাঁদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে বলে জানিয়েছেন। এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, সুস্পষ্ট ধর্মীয় মূলনীতি এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নৈতিক নির্দেশনা তাঁদের কাছে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
সিউলের ইতাওয়ন এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়মিত ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে জানতে আসেন আগ্রহী কোরীয়রা। সেখানে তাঁরা ইসলামের বিশ্বাস, ইবাদত ও জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। শিক্ষা গ্রহণের পর কেউ কেউ শাহাদাতাইন পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন।
কোরীয় মুসলিম নারী ‘আরিয়ম’ জানান, ইসলামে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মানের শিক্ষা তাঁর কাছে বিশেষভাবে অর্থবহ মনে হয়েছে। এই মূল্যবোধ কোরীয় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় পরিবারকে নিজের ধর্মীয় সিদ্ধান্ত বোঝানো তাঁর জন্য সহজ হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু তরুণ প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি ও প্রত্যাশার বাইরে ভিন্ন জীবনদর্শন খুঁজছেন। তাঁদের কেউ ইসলাম সম্পর্কে জানার মাধ্যমে নতুনভাবে জীবন, নৈতিকতা ও আত্মিক প্রশান্তি নিয়ে ভাবার সুযোগ পেয়েছেন।
ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের জীবনযাপন, আচরণ ও ধর্মীয় অনুশীলন কাছ থেকে দেখে কেউ কেউ ইসলাম সম্পর্কে আরও জানার আগ্রহ অনুভব করেছেন।
ইউসুফের অভিজ্ঞতাও এর একটি উদাহরণ। মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর সামনে নতুন ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জগৎ উন্মুক্ত হয়। তাঁর মতে, এই অভিজ্ঞতা তাঁকে পরিচিত সাংস্কৃতিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে নতুন কিছু জানার সুযোগ করে দেয়।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহ তৈরিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ভূমিকা রাখছে। কোরীয় মুসলিমদের কেউ কেউ নিজেদের ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, দৈনন্দিন জীবন ও মুসলিম সংস্কৃতি নিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন। এসব কনটেন্টের মাধ্যমে কোরীয় ও আন্তর্জাতিক দর্শকেরা মুসলিমদের জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
কোরীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব আয়ানা জিহে মুন কিশোর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। ছোটবেলায় ইরাক যুদ্ধের সময় ইসলাম সম্পর্কে জানার পর ধর্মটি নিয়ে তাঁর কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তিনি ইন্দোনেশিয়ায় বসবাসকারী কোরীয় মুসলিম ফ্যাশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি পান।
এ ছাড়া ইউটিউবার দাউদ কিম তাঁর ভিডিওতে ইসলাম গ্রহণের অভিজ্ঞতা ও মুসলিম হিসেবে জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতো পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন এমন অনেক মানুষ, যাঁদের কাছে আগে ধর্মটি ছিল অপরিচিত।
কোরীয় মুসলিম নারীদের কেউ কেউ হিজাবের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কোরীয় পোশাক হানবকের সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন ধরনের ফ্যাশনও তুলে ধরছেন। এর মাধ্যমে ইসলামি মূল্যবোধ ও কোরীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন দিককে একসঙ্গে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ইসলাম গ্রহণের পর মুসলিম সমাজে নতুন সম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা ও আপনজনের অনুভূতি খুঁজে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন কোরীয় নওমুসলিম। তাঁদের কেউ কেউ পরিচিতজনের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেলেও মুসলিমদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক থেকে মানসিক সমর্থন পেয়েছেন।
আরিয়ম জানান, সিউলের কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রথমবার যাওয়ার সময় তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি যেন অবশেষে নিজের ঘরে ফিরে এসেছেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে, ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি মুসলিম সমাজের আন্তরিকতা ও ভ্রাতৃত্ববোধও নতুন মুসলিমদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ইসলামের পরিচিতি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে মুসলিম বণিক, অভিবাসী ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে কোরীয় উপদ্বীপে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোরীয় যুদ্ধের সময় তুর্কি মুসলিম সেনাদের উপস্থিতি দেশটিতে ইসলাম পরিচিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে বিদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বর্তমানে স্থানীয় কোরীয়দের ইসলাম গ্রহণের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও বার্ষিক হিসাব সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ পরিসংখ্যান সীমিত। তবে কোরীয় নওমুসলিমদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মসজিদে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের সক্রিয় উপস্থিতি দেশটিতে ইসলাম সম্পর্কে জানার নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
ইসলামের একত্ববাদের শিক্ষা, নৈতিক জীবনব্যবস্থা, আত্মিক প্রশান্তির সন্ধান এবং মুসলিম সমাজের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক বিভিন্ন কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু মানুষ ইসলামকে নতুনভাবে জানছেন। তাদের এই অভিজ্ঞতা দেশটিতে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক আলোচনা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করছে।