
ফ্রি ওমরাহর সুযোগ, আবেদন করবেন যেভাবে

মনের প্রতিটি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা জরুরি নয়। প্রতিটি অনুভূতির অনুসরণ করাও প্রয়োজন নেই।
জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা বাইরে থেকে খুবই সামান্য মনে হলেও ভেতরে গভীর অনুভূতির জন্ম দেয়। কারও একটি মন্তব্য, যা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় ধরে মনে গেঁথে থাকে। কারও কথার সামান্য ভিন্ন সুর, যা আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। কিংবা কারও একটি বার্তা, যা প্রত্যাশার চেয়ে একটু শীতল মনে হয়। বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি, প্রকৃত অর্থে কোনো ক্ষতিও হয়নি। অথচ আমাদের ভেতরে কিছু একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আমরা বারবার সেই মুহূর্তটি মনে করি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলি এবং ধীরে ধীরে কষ্ট পাই, অভিমান করি কিংবা দূরত্ব তৈরি করি।
কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, এসব মুহূর্তে আমাদের অনুভূত কষ্ট সব সময় হৃদয়ের গভীর থেকে আসে না? কখনো কখনো কি এমন হতে পারে, আমাদের ভেতরের অহংবোধ নফস নীরবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে? অহংবোধ সব সময় প্রকাশ্য অহংকার কিংবা আত্মগর্বের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না। কখনো এটি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা, কখনো অযথা অতিরিক্ত চিন্তা, আবার কখনো উপেক্ষিত হওয়ার কিংবা যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার নীরব অনুভূতি হিসেবে প্রকাশ পায়।
পবিত্র কোরআনে মানবাত্মার প্রকৃতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজের প্রতি অধিক প্ররোচনা দেয়। (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৫৩)
আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষের নফসের এই প্রবণতার একটি অংশ হলো নিজেকে মানুষের কাছে দৃশ্যমান, সম্মানিত ও মূল্যবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষা। তবে সেটি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয়ে নিজের আত্মতৃপ্তির জন্য হয়, তাহলে তা আত্মার পরিশুদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই কেউ যখন সামান্য কিছু বলে, অথচ তা আমাদের গভীরভাবে আঘাত করে, তখন নিজেদের প্রশ্ন করা প্রয়োজন আমি কি সত্যিই কষ্ট পেয়েছি, নাকি আমার অহংবোধে আঘাত লেগেছে? অহংবোধ কখনো সরাসরি নিজের পরিচয় দেয় না। বরং এটি মনের ভেতর ফিসফিস করে বলে, আমার সঙ্গে আরও ভালো আচরণ করা উচিত ছিল এটা আমার প্রতি অন্যায় হয়েছে”, “সে এভাবে কথা বলল কেন? কিংবা “আমার সঙ্গে তার আরও ভালো ব্যবহার করা উচিত ছিল।
এভাবেই ছোট একটি ঘটনা ধীরে ধীরে আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু ইসলাম আমাদের আরও গভীর উপলব্ধির দিকে আহ্বান করে। এমন এক উপলব্ধি, যা মানুষের কাছ থেকে আমাদের মনোযোগ সরিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক সম্মানিত, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াবান।” (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১৩)
আমাদের প্রকৃত মর্যাদা মানুষ আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছে, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি, তার ওপর নির্ভর করে।
নবীজি সা.-এর আদর্শ রাসুলুল্লাহ সা. ছিলেন সৃষ্টিজগতের সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি। অথচ তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিনয়ী মানুষদের একজন।
একবার এক ব্যক্তি তার সামনে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে উপস্থিত হলে নবীজি সা. তাকে স্নেহভরে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন,
শান্ত হও! আমি কোনো বাদশাহ নই। আমি এমন এক নারীর সন্তান, যিনি শুকনো গোশত খেতেন। (ইবনে মাজাহতে বর্ণিত)
তাঁর মধ্যে ছিল না কোনো অহংবোধ, নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন কিংবা মানুষের চোখে নিজেকে বড় করে তোলার আকাঙ্ক্ষা।তাঁর শক্তি মানুষের ওপরে অবস্থান করার মধ্যে ছিল না; বরং আল্লাহর সামনে নিজেকে বিনীত রাখার মধ্যেই ছিল তাঁর প্রকৃত শক্তি।
শক্তির প্রকৃত সংজ্ঞা
আমরা প্রায়ই মনে করি, জবাব দেওয়া, নিজের অবস্থান রক্ষা করা কিংবা নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার মধ্যেই শক্তি নিহিত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিখিয়েছেন ভিন্ন এক শিক্ষা।
তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (সহিহ বুখারি)
শক্তি সব সময় প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্যে নয়। কখনো কখনো শক্তি হলো নিজেকে সংযত রাখা। অহংবোধ যখন কথা বলতে চায়, তখন নীরবতা বেছে নেওয়া। নিজের ভেতর যখন সবকিছু জবাব দেওয়ার জন্য তাড়িত করে, তখন নিজের প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা।
দৃষ্টিভঙ্গির নীরব পরিবর্তন
পরবর্তী সময়ে যখন কোনো সামান্য ঘটনায় আপনার মন কষ্ট পাবে, তখন একটু থামুন। নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন। এটি কি আমার মর্যাদার বিষয়, নাকি আমার অহংবোধের প্রতিক্রিয়া?
আল্লাহর কাছে কি বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হবে? কোন প্রতিক্রিয়াটি আমাকে তাঁর আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে? মনের প্রতিটি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা জরুরি নয়। প্রতিটি অনুভূতির অনুসরণ করাও প্রয়োজন নেই।
কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মধ্যেই জীবনের সবচেয়ে বড় আত্মিক উন্নতি ঘটে। এসব মুহূর্তের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা
হয়তো আল্লাহ আমাদের জীবনে এসব ছোটখাটো অস্বস্তি সৃষ্টি হতে দেন আমাদের ক্ষতি করার জন্য নয়; বরং আমাদের পরিশুদ্ধ করার জন্য।
আমাদের অহংবোধকে প্রকাশ করে দেওয়ার জন্য। হৃদয়কে কোমল করার জন্য। আমাদের বিনয় শেখানোর জন্য। প্রতিবার যখন আপনি অহংকারের পরিবর্তে ধৈর্য বেছে নেন, প্রতিবার যখন প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে ছেড়ে দিতে শেখেন, তখন আপনি আত্মিকভাবে উন্নত হচ্ছেন যদিও তা অন্য কেউ দেখতে না পায়।
প্রশ্নটি কেবল এতটুকু নয়, “আমার অহংবোধে এত সহজে আঘাত লাগে কেন? বরং আরও গভীর প্রশ্ন হলো, “আমি কি আমার হৃদয়কে এমনভাবে গড়ে তুলতে পারি, যেন আমার অহংবোধের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে?
কারণ শেষ পর্যন্ত, যে ব্যক্তি নিজের নফসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয়ী হয়, সেই ব্যক্তি নিজের ভেতরে প্রকৃত প্রশান্তি খুঁজে পায়। সূত্র: ইসলামিসিটি