
সিলেটে মুহূর্তেই উধাও ট্রেনের টিকিট, তদন্তে পিবিআই
আব্দুল্লাহ আল মামুন রুবেল, খুলনা
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৪

খুলনায় দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে অনেক শিশু। ছবি: সময় সংবাদ
১৪ বছরের কিশোর সজীব শেখ। খুলনার গ্রিন লাইন বস্তি এলাকায় বাবা-মায়ের সাথে তার বসবাস। যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে তার দিনের শুরু হয় ইজিবাইক নিয়ে। নগরীর একটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে সে। পরিবারের অভাব-অনটন আর সংসারের খরচ সামলাতে এক বছর আগে থেমে যায় পড়াশোনা। এখন ইজিবাইক চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে পরিবারকে সহায়তা করে সে।
সজীবের ভাষায়, ‘স্কুলে যেতে ইচ্ছা করে। বন্ধুদের যখন স্কুলে যেতে দেখি, তখন আরও বেশি খারাপ লাগে। কিন্তু সংসারের জন্য কাজ করতে হয়। সুযোগ পেলে আবার পড়াশোনা শুরু করব।’
একই অবস্থা নগরীর শেখপাড়া এলাকার একটি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করা কিশোর জোবায়েরের। একসময় নিয়মিত স্কুলে গেলেও পরিবারের আর্থিক সংকটে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি সে। এখন দিনের বড় একটা সময় কাটে গাড়ির যন্ত্রাংশ, তেল-কালি আর মেরামতের সরঞ্জামের মধ্যে। জোবায়ের জানায়, পরিবারের খরচে সহায়তা করতেই তাকে কাজে নামতে হয়েছে। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও কাজ আর স্কুল একসঙ্গে চালানো সম্ভব হয়নি তার।
সজীব কিংবা জোবায়েরের গল্প আলাদা হলেও স্কুল ছাড়ার পেছনের বাস্তবতা প্রায় একই; আর তা হলো পরিবারের আর্থিক সংকট। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দারিদ্র্যই একমাত্র কারণ নয়। অভিভাবকের নজরদারির ঘাটতি, পড়াশোনায় আগ্রহ হারানো, খারাপ সঙ্গ, শিশুশ্রম এবং বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবও শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার প্রায় ১২ শতাংশ। মাধ্যমিক পর্যায়ে জেলাভিত্তিক সরকারি কোনো তথ্য কোনো দফতরে পাওয়া যায়নি। তবে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। যেখানে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের হার বেশি।
এই সংকট বস্তি বা তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের বসবাস এলাকায় সবচেয়ে বেশি। তথ্য অনুযায়ী, বস্তি এলাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ২৬ শতাংশ পর্যন্ত।
খুলনা নগরীর গ্রিন লাইন বস্তি এলাকায় গিয়ে এমন আরও বেশ কয়েকজন ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাদেরই একজন পারভীন। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে সে। এরপর বাবা-মা তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেন। অল্প বয়সেই বিয়ে দেয়া হয় পারভীনকে। ফলে ইচ্ছা থাকলেও আর শ্রেণিকক্ষে ফেরা হয়নি তার।
পারভীন জানায়, সে স্কুল ছাড়তে চায়নি। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সহপাঠীদের কথা মনে পড়লে এখনও স্কুলজীবনের কথা মনে পড়ে তার। পারভীনের মতো অনেক কিশোরীর শিক্ষাজীবনে এভাবেই ছেদ টানছে বাল্যবিয়ে।
উপকূলীয় অঞ্চলে সংকটের ধরন আরও জটিল। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় অনেক পরিবারের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বসতভিটা হারিয়ে কোনো কোনো পরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে। দুর্যোগের পর যোগাযোগ সংকট, আয় কমে যাওয়া ও বাস্তুচ্যুতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের পড়াশোনায়। খুলনার তিন উপকূলীয় উপজেলা কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপে মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ২৪ শতাংশ পর্যন্ত।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঝরে পড়ার পরও শিক্ষায় ফেরার আগ্রহ রয়েছে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর। খুলনার ১০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ঝরে পড়া ৫২ শিক্ষার্থীকে নিয়ে করা গবেষণায় দেখা যায়, ৬১ দশমিক ৫৪ শতাংশ বা ৩২ জন আবার পড়াশোনা করতে চায়। তবে কাজসহ প্রতিকূল পারিবারিক ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে তারা আর বিদ্যালয়ে ফিরতে পারছে না।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ঝরে পড়াদের বড় একটি অংশ নিজেদের পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা ও অনুশোচনায় ভোগে। উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করা গেলে এদের একটি অংশকে আবারও শিক্ষার মূলধারায় ফেরানো সম্ভব।
গ্রিন লাইন বস্তিতে কথা হয় স্কুল থেকে ঝরে পড়া আরও দুই কিশোর-কিশোরীর সঙ্গে। তাদের একজন রাকিব ও অপরজন সুমাইয়া (ছদ্মনাম)। রাকিব জানায়, স্কুল ছাড়ার পর সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময় আর স্কুলের মাঠ। তার ভাষায়, ‘বন্ধুরা স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে। ওদের দেখলে আমারও যেতে ইচ্ছা করে। সুযোগ পেলে আবার স্কুলে ভর্তি হব।’
সুমাইয়ারও একই আকাঙ্ক্ষা। তার মনে পড়ে বই-খাতা, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক আর সহপাঠীদের কথা। সে বলে, ‘স্কুলের বই আর বন্ধুদের খুব মিস করি। আবার পড়ার সুযোগ পেলে আমি স্কুলে ফিরতে চাই।’
ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর শঙ্কা, দীর্ঘদিন শিক্ষার বাইরে থাকা শিশু-কিশোরদের একটি অংশ খারাপ সঙ্গসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক স্বপন গুহ বলেন, ‘ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেই শনাক্ত করতে হবে। বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়লে দ্রুত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কারণ খুঁজে বের করা এবং যারা ইতোমধ্যে স্কুল ছেড়েছে, তাদের আবার শিক্ষায় ফেরানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।’
তার মতে, একটি শিশু কেন স্কুল ছাড়ছে, সেটি আলাদাভাবে চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে কিংবা পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান একইভাবে করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগেই ঝরে পড়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব।
খুলনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ছায়েদুর রহমান বলেন, ‘মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি দীর্ঘ হওয়ার আগেই শিক্ষক ও অভিভাবকদের উদ্যোগী হতে হবে। কেন একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুলে আসছে না, তা শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া গেলে অনেককেই ঝরে পড়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব।’
খুলনায় বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন লক্ষাধিক। ফলে শুধু শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো নয়, শিক্ষা শেষ করা পর্যন্ত তাদের শ্রেণিকক্ষে ধরে রাখাই এখন শিক্ষা বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।