
বিএনপির বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
মনির হোসেন বাদল, পটুয়াখালী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৪৭

পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে নেই কোনো বেড়িবাঁধ ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। ছবি: সময় সংবাদ
পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাস পেলেও নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ পান না স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক এলাকায় নেই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ, নেই কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র। ফলে দুর্যোগের সময় নদী ও সাগর পেরিয়ে মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার পথ হয়ে ওঠে অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমন পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে গাছ আঁকড়ে ধরা কিংবা উত্তাল পানির সঙ্গে লড়াই করা ছাড়া অনেকের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।
রাঙ্গাবালী উপজেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর কাশেমের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় এ সংকটের চিত্র স্পষ্ট। বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা চরটিতে সড়কপথে সরাসরি যাতায়াতের কোনো সুযোগ নেই। সেখানে নৌকা ও ট্রলারই যোগাযোগের একমাত্র ভরসা। অথচ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এখানকার বাসিন্দাদের সুরক্ষায় নেই কোনো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ কিংবা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র।
একই পরিস্থিতি দেখা যায় গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চর বাংলায়। নদী ও সাগরবেষ্টিত এসব জনপদে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকতে হয় মানুষকে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা দেখা দিলে নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে তৈরি হয় চরম অনিশ্চয়তা। দুর্যোগের সময় কোথায় যাবেন এবং কীভাবে পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেবেন, তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েন বাসিন্দারা।
চর কাশেম ও চর বাংলা ছাড়াও পটুয়াখালীতে রয়েছে চর আন্ডা, চর হেয়ার, চর বেষ্টিন, চর নজির, চর ইমারশন ও চর কারফর্মারের মতো বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এসব এলাকার অধিকাংশ স্থানে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। কোথাও নেই পাকা আশ্রয়কেন্দ্র, আবার কোথাও নদী ও সাগরের তীরবর্তী অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে বসতি।
নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা এসব মানুষের পক্ষে বড় কোনো দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় পর্যায়ে আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার জন্য নৌকা বা ট্রলারের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের সময় উত্তাল নদী পেরিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা আরও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। ফলে পূর্বাভাস পাওয়ার পরও অনেকে সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেন না। বাধ্য হয়ে অনেকেই গাছপালা আঁকড়ে ধরে কিংবা পানির স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হয় সবচেয়ে বেশি।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. তারিকুল ইসলাম সজিব বলেন, ‘উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে নিরাপদ আশ্রয়, টেকসই বেড়িবাঁধ, কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা ও দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি। বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে এসব সুবিধা না থাকলে সতর্কবার্তা পেলেও মানুষের পক্ষে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।’
জেলা দুর্যোগ ও ত্রাণ কর্মকর্তা এসএম দেলোয়ার হোসেন জানান, উপকূলীয় এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও উন্নয়নে প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব দ্বীপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের প্রস্তাবনা আগেই দেয়া আছে। পর্যায়ক্রমে সব দ্বীপে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
উপকূলের মানুষের দুর্যোগ আতঙ্কের পেছনে রয়েছে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের করুণ ইতিহাস। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে আনুমানিক তিন লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এছাড়া ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে প্রাণ হারান ৩ হাজার ৩৬৩ জন। ভয়াবহ এসব দুর্যোগের ক্ষত ও স্মৃতি আজও উপকূলের মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত প্রস্তুতি ও কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব। বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বেড়িবাঁধের সুরক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে দুর্যোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমবে। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসে পটুয়াখালীর বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা, দুর্যোগের পর ত্রাণের অপেক্ষায় থাকতে হবে না তাঁদের; বরং দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই নিশ্চিত হবে নিরাপদ আশ্রয় ও জীবন রক্ষার স্থায়ী ব্যবস্থা।