
দেশের ৫৪টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কাজ করছে সরকার
আব্দুল্লাহ আল মামুন রুবেল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪
আর্থিক সংকট আর বাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে খুলনা অঞ্চলের লবণ মিল। ছবি: সময় সংবাদ
উৎপাদনে বাড়তি খরচ, আর্থিক সংকট আর বাজারের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে খুলনা অঞ্চলের লবণ মিল। একসময় চালু থাকা ৩২টি মিলের মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র নয়টি। সেগুলোতেও নিয়মিত উৎপাদন না হওয়ায় কমছে শ্রমিকের কাজ ও আয়।
শিল্পটি ঘুরে দাঁড়াতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিকায়নে সহায়তা চান উদ্যোক্তারা।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, অপরিশোধিত লবণ আমদানির সুযোগ মিললেও শুধু এ সুবিধায় দীর্ঘদিনের সংকট কাটবে না। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে পরিবহন, পরিশোধন ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ব্যয় কমাতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিতে উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা দিতে হবে।
খুলনার ভৈরব নদীর তীরে গড়ে ওঠা এসব কারখানায় ভোজ্য ও শিল্প লবণ উৎপাদিত হয়। নদীপথে তা পৌঁছায় দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাজারে। তবে বাড়তি ব্যয়ের চাপে সেই বাজার ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পুরবী সল্টের ম্যানেজার আখিল হোসেন জানান, কক্সবাজার থেকে কাঁচামাল আনতে বাড়তি পরিবহন খরচ বহন করতে হয়। এর সঙ্গে অনিয়মিত সরবরাহ ও পরিশোধনের ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সক্ষমতা থাকলেও নিয়মিত উৎপাদন চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। কারখানাগুলো আধুনিকায়নেও পিছিয়ে রয়েছে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদনে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর্থিক সংকটে থাকা স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠানের সেই সামর্থ্য নেই। পাশাপাশি গ্যাসের অভাবও একটি বাধা। ফলে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাজার হারাচ্ছে খুলনার মিলগুলো।
রমনা সল্টের স্বত্বাধিকারী সালাহ উদ্দিন আহমেদ কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও আনুষঙ্গিক ব্যয় কমানোর দাবি জানান।
তার মতে, সহজ শর্তে ঋণ এবং সাশ্রয়ী জ্বালানির ব্যবস্থা করা গেলে সংকট মোকাবিলায় সহায়তা পাবেন উদ্যোক্তারা।
পুরবী সল্টের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কামরুল ইসলামও আধুনিকায়নে বিনিয়োগের সংকটের কথা তুলে ধরেন। বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্থানীয় মিলগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
শিল্পের এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের সংসারে। কারখানায় গুদাম থেকে কাঁচা লবণ বহন, পরিশোধনের যন্ত্রে দেয়া এবং প্যাকেটজাত করার কাজ চললেও নেই আগের কর্মব্যস্ততা। একসময় যেখানে শতাধিক শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকজন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, মাসে ১৫ দিনও কাজ পাওয়া যায় না। কাজের সঙ্গে আয় কমে যাওয়ায় সংসারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চালু মিলগুলোও বন্ধ হয়ে গেলে জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে উদ্বেগ তাদের।
রাজাপুর সল্ট কারখানার শ্রমিক আবুল হাসান জানান, আগে এক সময়ে মাসের মধ্যে ২৫ দিন কাজ থাকতো, কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। এখন মাসের ১৫ দিনও কাজ মেলে না। কাজ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে; সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
একই মিলের আরেক শ্রমিক হারুনুর রশীদ বলেন, ভৈরব নদীর তীরে বেশ কয়েকটি লবণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে। আগে এসব মিলে তিন হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। কিছু মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকের সংখ্যা নেমে এসেছে কয়েক শ’তে। যেসব মিল চালু আছে, সেখানে নিয়মিত কাজ না থাকায় পরিবারের খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কারখানায় উৎপাদন বাড়লে কাজের সুযোগও বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।
একই মিলের আরেক শ্রমিক গফুর হাওলাদার বলেন, ‘আমরা তো আর কোনো কাজ জানি না। ৮-১০ বছর ধরে লবণ ফ্যাক্টরিতেই কাজ করছি। এখন যদি কাজ বন্ধ হয়ে যায়, আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।
খুলনা অঞ্চলের লবণ শিল্পের এসব সংকট স্বীকার করছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
সংস্থাটির খুলনার উপ-মহাব্যবস্থাপক গোলাম সাকসায়েন জানান, সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্যোক্তাদের সমস্যা সরকারের উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরা হবে। সহায়তা ও সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
গোলাম সাকসায়েন বলেন, ‘আমরা নিয়মিত উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা মাঝে মধ্যেই মতবিনিময় করি। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ঋণ বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাড়াতে আমরাও চেষ্টা করছি। এজন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের উদ্যোগ নেব। আশা করছি খুলনা অঞ্চলের লবণ শিল্প আবারও হারানো দিনের ঐতিহ্য ফিরে পাবে।’