
সৌদির এআই হ্যাকাথনে চ্যাম্পিয়ন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েম
মুফতি আবদুল্লাহ তামিম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৬

প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি
ইসলামি অর্থনীতি ও অর্থায়নে অসামান্য পাণ্ডিত্য এবং দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানিত হয়েছেন প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম আল বারাকা সামিটে তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। ১৩ ও ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইসলামি অর্থনীতি, ব্যাংকিং, নীতিনির্ধারণ ও আর্থিক খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
ইসলামি অর্থনীতির নৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠন এবং বিশ্বব্যাপী এর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে আয়োজিত এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘নৈতিকতার বাস্তব প্রয়োগ: ভিত্তি পুনর্গঠন ও ইসলামি অর্থনীতির বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার’। সম্মেলনে ইসলামি অর্থব্যবস্থার মৌলিক আদর্শ, ন্যায়বিচার, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং সমাজের কল্যাণে সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়।
সম্মেলনে দেওয়া মূল প্রবন্ধে মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি ইসলামি অর্থব্যবস্থার মৌলিক নীতিমালা ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সমাজের বৃহত্তর কল্যাণ নিশ্চিত করার উপায় হিসেবে বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে দুটি বিষয়—উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার এবং সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টন।
ইসলামি অর্থনীতির মূল লক্ষ্য যে শুধু সুদমুক্ত লেনদেন প্রতিষ্ঠা নয়, বরং ন্যায়ভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা, তাঁর বক্তব্যে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই গুরুত্ব পায়। সম্মেলনের সামগ্রিক আলোচনাতেও ইসলামি অর্থায়নের নৈতিক আদর্শকে বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর করার বিষয়টি প্রাধান্য পায়।
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি: জীবন ও কর্ম
ইসলামি আইন, হাদিস ও অর্থনীতির আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ। তিনি পাকিস্তানের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামি স্কলার। ফিকহ, হাদিস, তাফসির, তাসাউফ ও ইসলামি অর্থনীতি বিষয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও শিক্ষাদান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত।
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি ১৯৪৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মুফতি মুহাম্মদ শফি ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি এবং উপমহাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি আলেম। পারিবারিকভাবে ইলমি পরিবেশে বেড়ে ওঠা তাকি উসমানি শৈশব থেকেই ইসলামি শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন।
তিনি পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থিত বিখ্যাত জামিয়া দারুল উলুম করাচি থেকে ইসলামি শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬১ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে ফতোয়া বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও লাভ করেন।
বিচার বিভাগ ও শরিয়াহ গবেষণায় অবদান
মুফতি তাকি উসমানি কেবল একজন ধর্মীয় শিক্ষক ও গবেষক নন; পাকিস্তানের বিচার বিভাগেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের ফেডারেল শরিয়াহ আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সাল থেকে ২০০২ সালের মে মাস পর্যন্ত দেশটির সুপ্রিম কোর্টের শরিয়াহ আপিল বেঞ্চের বিচারক ছিলেন। এ সময়ে ইসলামি আইন ও আধুনিক বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ হয়।
তিনি জেদ্দাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমির স্থায়ী সদস্য এবং প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ পরামর্শক ও তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডে কাজ করেছেন।
ইসলামি অর্থনীতিতে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি
মুফতি তাকি উসমানির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর একটি হলো আধুনিক ব্যাংকিং ও অর্থায়নব্যবস্থায় ইসলামি শরিয়াহর নীতিমালা প্রয়োগে গবেষণা ও দিকনির্দেশনা প্রদান। তিনি ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা সংক্রান্ত সংস্থা অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড অডিটিং অর্গানাইজেশন ফর ইসলামিক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনসের (এএওআইএফআই) আন্তর্জাতিক শরিয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এএওআইএফআই বাহরাইনভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য শরিয়াহ মানদণ্ড প্রণয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে।
পাকিস্তানের জামিয়া দারুল উলুম করাচিতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা ও উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি ইসলামি অর্থনীতির গবেষণা ও উন্নয়নে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর গবেষণা ও দিকনির্দেশনা ইসলামি ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, আর্থিক চুক্তি এবং সমকালীন ফিকহি সমস্যার আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সমৃদ্ধ গ্রন্থভান্ডার ও গবেষণাকর্ম
মুফতি তাকি উসমানি আরবি, উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় ৬০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। হাদিসের ব্যাখ্যা, ইসলামি আইন, ফতোয়া প্রদানের নীতিমালা, আধুনিক আর্থিক লেনদেন এবং ইসলামি ব্যাংকিং তাঁর লেখালেখির উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র। তাঁর রচনাবলি ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি সমকালীন অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থার শরিয়াহভিত্তিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
লন্ডনের পঞ্চম আল বারাকা সামিটে তাঁর সম্মাননা ইসলামি অর্থনীতি ও অর্থায়নে দীর্ঘদিনের গবেষণা, প্রজ্ঞা এবং নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্যে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ও সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর গুরুত্বারোপ আধুনিক অর্থব্যবস্থায় নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জনকল্যাণের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
তথ্যসূত্র: আল বারাকা সামিটের সরকারি ওয়েবসাইট, আনাদোলু এজেন্সি, মুফতি তাকি উসমানির সরকারি জীবনী এবং আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি।