
মালেয়শিয়ার বাংলাদেশ থেকে কর্মী যাবে ডিসেম্বরে: শ্রমমন্ত্রী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩

নিহত তৌফিক হাসান। ছবি: সংগৃহীত
বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের তৌফিক হাসান। পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে চালাতেন পরিবারের ভরণপোষণ। কিন্তু গাজীপুরে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে দুই কারখানার সামনে সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে শ্রমিকদের মারধরের শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি তাকে।
গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছিলেন পোশাক শ্রমিকরা। এরই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে হঠাৎ বন্ধ ঘোষণা করা হয় তৌফিকের কর্মস্থল লায়লা স্টাইল গার্মেন্টস। পরে দুই সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে বাসার পথে রওনা হন তিনি।
জান গেছে, পথে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পাশাপাশি অবস্থিত নোমান টেরি টাওয়াল মিলস লিমিটেড ও একই মালিকানাধীন তালহা ফেব্রিক্স নামে দুটি কারখানার সামনে সংঘর্ষ বাধে। অভিযোগ রয়েছে, বাইরে থেকে লোকজন এনে কারখানা দুটি পাহারা দিয়ে চালু রাখা হয়েছিল। কারখানার সামনে পাহারার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তৌফিক ও তার এক সহকর্মী মোবাইল ফোনে সেই সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করতে গেলে তাদের ওপর চড়াও হন পাহারায় থাকা ব্যক্তিরা।
স্বজনদের অভিযোগ, একপর্যায়ে তৌফিককে ধরে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে তার মৃত্যু হয়।
তৌফিক স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে কাজ করছিলেন পোশাক কারখানায়। তার মৃত্যুর শোকে স্তব্ধ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দারা।
নিহতের বড় ভাই বলেন, সংঘর্ষের সময় কয়েকজনকে দৌড়ে সরে যেতে দেখে আমার ভাইও একপাশে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এসময় দুই যুবক মোবাইল ফোন হাতে দৌড়ে যাওয়ায় হামলাকারীরা হয়তো তৌফিককেও ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত মনে করেন। কোনোভাবেই ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত না থাকলেও তাকে ধরে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।
স্বজনরা জানান, পেছন দিক থেকে মিছিল আসতে দেখে দুজন দৌড়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এসময় তৌফিকও দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যান। এরপরই সেখানে থাকা লোকজন তার ওপর হামলা চালায়। হাসপাতালে যাওয়ার পর নোমান টেরি টাওয়াল মিলস লিমিটেডের কর্মীদের কাছ থেকে তারা জানতে পারেন, স্থানীয় কিছু যুবককে ভাড়া করে কারখানার সামনে রাখা হয়েছিল। তারাই তৌফিককে মারধর করেন।
এদিকে, ভূমিহীন পরিবারটির নেই মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠাঁই। ১২ মাস বয়সী শিশুসন্তানকে নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তৌফিকের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা তারা। নিহতের স্ত্রী সেতু মনি বলেন, ‘আমার একটা এতিম বাবু। ওকে নিয়ে আমি কোথায় যাব? আমাদের কোনো বাড়িঘর নেই। আমি কোথায় গিয়ে থাকব, কীভাবে চলব?’
প্রতিবেশীরা জানান, পরিবারটি অত্যন্ত অসহায়। তাদের নিজস্ব কোনো জায়গাজমি নেই। তৌফিকের পরিবার যাতে চলতে পারে, সে জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান তারা। পাশাপাশি এ ঘটনার বিচার দাবি করেন।
এদিকে নিহত তৌফিকের স্ত্রীকে নগদ এক লাখ টাকা দিয়ে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রীর মাধ্যমে সহযোগিতা করা হয়েছে। এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। পরিবারের যা কিছু প্রয়োজন, প্রাথমিকভাবে আমরা সহযোগিতা করেছি।’
বুধবার সকালে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয় তৌফিককে।