
বিআরটি প্রকল্প বাতিল হলেও বদলাচ্ছে না অবকাঠামো, স্টেশনগুলো ভাঙার পরামর্শ
আব্দুল্লাহ আল মামুন রুবেল
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২১

খুলনায় এই সড়কে একইসঙ্গে নানা গতির যান চলাচল করছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। ছবি: সময় সংবাদ
খুলনার সড়ক-মহাসড়কে থামছেই না প্রাণহানি। দুর্ঘটনায় বেঁচে ফিরেও কেউ হারাচ্ছেন কর্মক্ষমতা, অনিশ্চয়তায় পড়ছে পরিবার। দ্রুতগতির বাস-ট্রাক আর বেহাল সড়কের সঙ্গে নিষিদ্ধ ও ধীরগতির যান চলাচলে বাড়ছে ঝুঁকি।
খুলনা বিভাগে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৪৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৩ জন। আহত হয়েছেন আরও ৫৯৪ জন। দুর্ঘটনায় বেঁচে ফিরেও আহতদের কেউ কেউ হারাচ্ছেন কর্মক্ষমতা। পরিবারের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয় মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে ঋণ ও অনুদানের ওপর। দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের সঙ্গে একই সড়কে ধীরগতির যান চলাচল, বেপরোয়া ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও বেহাল সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা–সাতক্ষীরা ও খুলনা–মোংলা মহাসড়কে ছোট যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের দাবি জানিয়েছেন যাত্রী ও চালকেরা।
সড়ক দুর্ঘটনা কীভাবে একটি পরিবারের জীবন বদলে দেয়, তার উদাহরণ বাসের সুপারভাইজার রাজু শেখ। আট মাস আগে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে কাজে ফিরতে পারেননি তিনি। খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার ভাড়া বাসায় দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে বিছানায় শুয়ে। ডান পায়ে কয়েক দফা অস্ত্রোপচারের পরও স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না রাজু। চলতে হয় ক্রাচে ভর দিয়ে। চিকিৎসায় এরই মধ্যে খরচ হয়েছে কয়েক লাখ টাকা। কিন্তু কবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
রাজু জানান, ছয় সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। দুর্ঘটনার পর আয় বন্ধ হয়ে গেছে। অনুদান ও ঋণের টাকায় চিকিৎসা চলছে। নিজের সুস্থতার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে তাকে। রাজুর মতো দুর্ঘটনায় আহতদের দীর্ঘ চিকিৎসা ও কর্মহীনতা সংকটে ফেলছে তাদের পরিবারকে। আবার কারও মৃত্যুতে পরিবার হারাচ্ছে উপার্জনের প্রধান অবলম্বন। দুর্ঘটনার ক্ষত তাই আহত ব্যক্তির শরীর ছাড়িয়ে প্রভাব ফেলছে স্বজনদের জীবনেও।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ৪৫৯টি দুর্ঘটনায় ৪৩৩ জন নিহত ও ৫৯৪ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা জেলায় ২৬টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২৮ জনের।
এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ইঞ্জিন চালিত ভ্যান, মাহেন্দ্রা, থ্রি-হুইলারসহ উচ্চ আদালত থেকে নিষিদ্ধ যানবাহনের অবাধ চলাচল। বিশেষ করে দুর্ঘটনাপ্রবণ খুলনা–সাতক্ষীরা ও খুলনা–মোংলা মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস-ট্রাকের পাশেই চলছে এসব ধীরগতির যান। গতির পার্থক্যের সঙ্গে বেপরোয়া ওভারটেকিং, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও সড়কের বেহাল দশায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। বিকল্প সড়ক না থাকায় বাধ্য হয়েই মহাসড়কে যান চালানোর কথা বলছেন চালকেরা।
দুর্ঘটনাপ্রবণ খুলনা–সাতক্ষীরা মহাসড়কে চলাচলকারী বাসচালক রায়হান মোল্লা বলেন, সড়কটির বিভিন্ন স্থানে ভাঙা। একটু দ্রুত চালালেই হঠাৎ ব্রেক করা যায় না। আর ইজিবাইক, সিএনজির কারণে তো চালানোই যায় না। হঠাৎ সামনে চলে আসে। এদেরকে কিছু বলাও যায় না, বলতে গেলে তারা মারমুখী আচরণ করে।
বাসের পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রাকও চলাচল করে এই মহাসড়কে। ট্রাকচালক শফিকুল বলেন, আমাদের গাড়িতে লোড বেশি থাকে, খানাখন্দে ভরা সড়কে মাঝে মধ্যেই বায়ে চাপতে হয়, ইজিবাইক মাহেন্দ্রার জন্য চাপতে পারি না। এতে সময়ও বেশি লাগে, দুর্ঘটনারও ভয় থাকে।
সাতক্ষীরা বাসের যাত্রী আব্দুল খালেক বলেন, তিন মাস আগে এমন একটা গাড়িতেই দুর্ঘটনার মধ্যে পড়তে যাচ্ছিলাম। কোনোমতে সে যাত্রায় বেচেঁছি। এখন এই রোডে চলতে গেলে জান হাতে নিয়ে চলতে হয়।
অন্যদিকে ছোট যানবাহনের চালকেরা বলছেন, বিকল্প সড়ক না থাকায় জীবিকার প্রয়োজনে মহাসড়কে উঠতে হচ্ছে তাদের। স্থানীয় যাত্রী পরিবহন করে সংসার চালালেও দ্রুতগতির বড় যানবাহনের পাশে চলাচলে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাদের। খুলনা–সাতক্ষীরা মহাসড়কে চলাচলকারী
ইজিবাইকচালক নুরুল ইসলাম বলেন, ভেতরের রোডে তো যাত্রী হয় না। এই রোডের মানুষদের তো বাসেও নেয় না। আমরা তো বাধ্য হয়েই চালাই। দুর্ঘটনার ভয় থাকে তাও চালাই। আমাদের জন্য এই রোডে সাইড লেন থাকলে আর দুর্ঘটনা ঘটতো না।
বিআরটিএ খুলনার পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, সড়ক বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসনসহ সব স্টেকহোল্ডারদের সাথে নিয়ে আমরা দুর্ঘটনা রোধে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। তবে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইন প্রয়োগকারীদের আরও কঠোর হতে হবে। স্বল্প লোকবলে আমাদেরও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবুও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমরা আরও নতুন কার্যক্রম হাতে নিচ্ছি।
হাইওয়ে পুলিশ খুলনার পুলিশ সুপার মো. জাকারিয়াও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কাজ করার কথা জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, খুলনা অঞ্চলের মহাসড়কগুলোতে কোনো ফিডার রোড নাই। আমরা বারবার এ সংক্রান্ত সভায় এই রোডে ফিডার রোডের দাবির কথা জানিয়েছি।
শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে এটি রোধ করা যাবে না। পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধিতেও সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।
সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে ১৯টি জাতীয় ও ১৮টি আঞ্চলিক মহাসড়ক রয়েছে।