
কমনওয়েলথ বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন কবির
প্রতিবেদক, ফরিদপুর
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৩৩

রাজুর ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। ছবি: সময় সংবাদ
পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে গত ৮ মে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ফরিদপুরের রাজু মাতবর (২৮) নামে এক যুবক। দেশটির একটি প্রতিষ্ঠানে মেকানিক্যাল শ্রমিক হিসেবে কাজ দেয়ার কথা থাকলেও পাঠানো হয় রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে। এরপর ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় তাকে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে রাজুর মৃত্যুর খবর।
রাজু ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার মাঝিকান্দা গ্রামের নান্নু মাতবরের ছেলে। যুদ্ধক্ষেত্রে তার মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়ে গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন রাতুল নামে বাংলাদেশি আরেক যুবক (রাশিয়ান যোদ্ধা)। এছাড়া তার সাথে যোগাযোগ করে মৃত্যুর বিষয়ে জানতে পারেন রাজুর ছোট ভাই রাজন মাতবর। এমন খবরের পর থেকে পরিবারে চলছে শোক আর আহাজারি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সকালে বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীর মৃত্যুর খবরে আড়াই বছরের ছেলে ও এক বছরের মেয়েকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী শারমিন আক্তার। তবে স্বামীর প্রকৃত অবস্থা জানতে চান শারমিন। তিনি স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানানোর পাশাপাশি এ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
এছাড়া ছেলের ছবি হাতে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা নান্নু মাতবর ও মা রাজিয়া বেগম। পাশাপাশি বাড়িতে ভিড় করছেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। মৃত্যুর খবর সত্য হলে রাজুর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন তারা।
রাজুর পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী কফাইবালিয়া গ্রামের প্রিন্স মাতবর ও তার ছোট ভাই রানার মাধ্যমে সাড়ে ১৪ লাখ টাকায় রাজুকে রাশিয়ায় পাঠানোর চুক্তি হয়। এর মধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়। বাকি ১০ লাখ টাকা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেয়ার কথা ছিল।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি পাননি রাজু। পরিবারের দাবি, তাকে ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এ জন্য প্রিন্স ও রানাকে দায়ী করছেন স্বজনরা।
রাজুর বাবা নান্নু মাতবর জানান, ভালো চাকরির আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর খবর পান। এখন ছেলের মৃত্যুর খবর শুনছেন। তিনি ছেলের প্রকৃত অবস্থা জানতে চান। একই সঙ্গে এ ঘটনার তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
এদিকে ফেসবুকে রাতুল নামের এক যুবকের প্রকাশ করা একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে রাজু মারা গেছেন বলে দাবি করেন রাতুল। ভিডিওতে রাজুর ছবি যুক্ত করে রাতুল বলেন- ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আমাদের আরেকটি ভাইকে হারিয়েছি, যার নাম রাজু মাতবর।’
ভিডিওতে রাতুল জানান, রাজু তার পরিচিত ছিল এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে চলে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল। এরপর ব্যস্ত থাকায় রাজুর সাথে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায় তার। এরমধ্যে রাজুর ছোট ভাই তাকে মেসেজ পাঠিয়ে জানায়, রাজু ১০ থেকে ১২ দিন ধরে নিখোঁজ।
রাতুল বলেন, ‘আমি রাজুর ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করি এবং জানতে পারি রাজু মারা গেছে।’
তবে রাজুর প্রকৃত অবস্থা জানতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোর হস্তক্ষেপ চেয়েছে পরিবার। এছাড়া রাজুর মৃত্যুর খবরের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। জীবিত আছেন, নাকি মারা গেছেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, রাজু বেঁচে থাকলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। আর মৃত্যুর খবর সত্য হলে মরদেহ দেশে ফেরানোর পাশাপাশি চাকরির প্রলোভনে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগের তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরদিকে রাজুর পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত প্রিন্স মাতবরের ছোট ভাই রানা। তার দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে রাজুকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। রাজু নিজেই রাশিয়ায় অবস্থানরত প্রিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে যান। তাকে প্রতারণা করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন রানা।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মোহাম্মদ আল ফাহাদ জানান, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। রাজুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।