
মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ: তিন স্টেশনে কয়েক ঘণ্টা বন্ধের পর চলাচল শুরু মেট্রোরেলে
আলপনা বেগম, নেত্রকোনা
প্রকাশ: রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:১৯

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁতে জামদানি শাড়ি বুনছেন কারিগররা। ছবি: সময় সংবাদ
নেত্রকোনার সীমান্ত এলাকায় হাতে বোনা জামদানি শাড়ি এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। হাজার ছাড়িয়ে লাখ টাকায়ও বিক্রি হয় এসব শাড়ি। তবে কারিগরদের বিনিয়োগ সুবিধা না থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীরাই দ্বিগুণ লাভে ব্যবসা করছেন।
কারিগররা বলছেন, পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বদলে যাবে এই অঞ্চলের অর্থনীতির চিত্র, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থানের। এই শিল্পকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের করতে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নেত্রকোনার সীমান্ত উপজেলা কলমাকান্দার প্রত্যন্ত গ্রাম বাতানিপাড়া। একদম পাহাড়ঘেঁষা রংছাতি ইউনিয়নের এই গ্রামকে তাঁতপল্লী বললেও এখন আর ভুল হবে না। গ্রামটির ঘরে ঘরে সবাই তাঁতশিল্পী। এই গ্রামের অনেকেই জীবিকা নির্বাহের জন্য একসময় নারায়ণগঞ্জের কারখানায় কাজ করতেন। কিন্তু তারা ফিরে এসে নিজ এলাকায় এখন একেকজন উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন।
গ্রামের বাসিন্দা আবুল বাশার ২০০৪ সালে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জে। সেখানে মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনে কাজ করে শিখে নিয়েছেন দামি পোশাক জামদানি শাড়ি তৈরির কাজ। কাজ শেখা শেষ হলে ২০১৪ সালে ফিরে আসেন নিজ গ্রামে। পিছিয়ে পড়া এই গ্রামে ২০১৫ সালে তিনি নিজেই শুরু করেন শাড়ির কাজ। বসতঘরের মাটি কেটে টেবিলের মতো করে তৈরি করে নেন মেশিন। শেখান আত্মীয়স্বজনসহ এলাকার ভাই-ভাতিজাদেরও।
এভাবেই ইসমাইল, মিনহাজসহ আরও অনেকে এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। যে গ্রামের ছেলেরা ৮-১০ বছর বয়স হলেই কাজের সন্ধানে চলে যেত, তারাই এখন নিজ এলাকায় এই কাজ করছেন। শ্রমিক খরচ বাঁচাতে কেউ কেউ স্বামী-স্ত্রী মিলেও কাজ করেন। যেমন ইসমাইল দম্পতি। স্ত্রী সোলেমা আক্তার ঘরের কাজ শেষে মাসব্যাপী কাজ করে একটি শাড়ি তৈরি করেন, যা বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত। কাজের ওপর নির্ভর করে এই দাম নির্ধারিত হয়।
বাতানিপাড়া তাঁতশিল্প যুব সংগঠনের সভাপতি আবুল বাশার জানান, গ্রামের ৫৪টি বাড়িতে রয়েছে তাঁতশিল্প। তাদের মধ্য থেকে এখন উদ্যোক্তা হয়েছেন ১২ জন। গ্রামে ঘুরলেই দেখা মিলবে কারও দোকানের পাশে বা কারও বসতঘরে রয়েছে বুনন ব্যবস্থা। অনেকে কাপড়ের ছাউনি দিয়ে কুঁড়েঘরকে কারখানায় রূপ দিয়েছেন। জরাজীর্ণ স্থানেই স্বামী-স্ত্রী মিলে কাজ করেন। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে অনেক সময় তাদের কাজ নষ্ট হয়ে যায়। তাই বর্ষায় কাজ করতে তাদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।
তৈরি করা এসব শাড়ি বিক্রি হয় সর্বনিম্ন ৪০ হাজার টাকায়। কিন্তু লাভের বড় অংশই চলে যায় কাঁচামাল সরবরাহ করা মহাজনদের হাতে। অথচ প্রত্যন্ত এই গ্রামের তৈরি শাড়িই যায় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে। কলকাতা ও লন্ডনে এর চাহিদা বেশি। কারিগরদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পুরো গ্রাম একটি কারখানায় পরিণত হবে। প্রতি মাসে কমপক্ষে একটি করে বছরে ১০ থেকে ১২টি শাড়ি তৈরি করতে পারেন একেকজন কারিগর।
এই শিল্পকে জাতীয় শিল্পে রূপ দিতে ইতোমধ্যে ১১টি ব্যাংকের প্রতিনিধিকে নিয়ে উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে কলমাকান্দায় মতবিনিময় করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। কীভাবে স্বল্প সুদে বিভিন্ন মেয়াদি ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে কাঁচামাল সরবরাহ করে একটি হাব তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
স্থানীয় প্রশাসন এই শিল্পের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করার কথা জানিয়েছে। কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এন এম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এটি একটি প্রত্যন্ত এলাকা। চলাচলের ভালো সড়ক নেই। আমরা গিয়ে পরিদর্শন করে এসেছি। বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে সড়কটি করা হবে। পাশাপাশি শেড করে দেয়া যায় কি না, সেটিও দেখা হচ্ছে। এছাড়া যেহেতু সীমান্ত এলাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকরা আসেন, সেখানেও প্রচারণার ব্যবস্থা থাকলে তারা শাড়িগুলো কিনে নিতে পারবেন।’
অন্যদিকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘আমার নিজ নির্বাচনী এলাকার এই শিল্প অনেক আগেই দুর্গাপুরে করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, যা এখন বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হওয়া এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করাসহ দুই উপজেলার তাঁতশিল্পীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জামদানিকে ব্র্যান্ডিং করে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই।’
তিনি আরও জানান, কলমাকান্দার বাতানিপাড়া গ্রামের তাঁতপল্লীর উদ্যোক্তাদের নিজেদের অর্থায়নে কাজ করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি চলমান রয়েছে।