
শ্রেণিকক্ষের আন্দোলন রাজপথে, ফ্রান্সে কি লেখা হবে নতুন কোনো ইতিহাস
মোস্তফা কামাল
প্রকাশ: সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:২৯

৬ অক্টোবর তেল আবিবে একটি নির্বাচনী বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন কয়েকজন ইসরাইলি। ছবি: সংগৃহীত
আগামীকাল ২৭ অক্টোবর ইসরাইলের নাগরিকরা পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামাস নেতৃত্ব্ধীন হামলা এবং এর পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দেশটিতে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। নানা কারণে এবারের নির্বাচনকে ইসরাইলের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন ইসরাইল সরকারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে। বহু বছর ধরে চলা একাধিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা এবং দেশের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটি।
ইসরাইলের নির্বাচনে কোনো দল ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেলে পার্লামেন্টে আসন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের মেয়াদ চার বছর।
পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে মূলত দুটি রাজনৈতিক জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। একটি হলো প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট। তার লিকুদ পার্টির সঙ্গে রয়েছে কয়েকটি কট্টর ডানপন্থি ও অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় দল। এর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে), শাস, ওতজমা ইয়েহুদিত এবং রিলিজিয়াস জায়োনিজম-জেহুত। শেষের দুটি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন যথাক্রমে কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচ।
অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী জোটে রয়েছে চারটি ইহুদি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি। এগুলো হলো সাবেক ইসরাইলি সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি, সাবেক উপসেনাপ্রধান ইয়ার গোলানের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্র্যাটস পার্টি, সাবেক অর্থমন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যানের নেতৃত্বাধীন ইসরাইল বেইতেনু এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন টুগেদার জোট। এতে আছেন পার্লামেন্টের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ।
শুক্রবার থেকে নতুন জনমত জরিপ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগে প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপগুলোতে দেখা গেছে, কোনো জোটই পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়ার অবস্থানে নেই।
ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান-এর এক জরিপে বলা হয়েছে, বিরোধী জোট ১২০ আসনের নেসেটে ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জোট পেতে পারে ৫০টি আসন। বাকি আসনগুলো যেতে পারে স্বতন্ত্র বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির প্রধান দুটি আরব-অধ্যুষিত রাজনৈতিক জোট—রাম বা ইউনাইটেড আরব লিস্ট এবং হাদাশ, বালাদ ও তাআল দলের সমন্বয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট।
তবে নেতানিয়াহু ও বিরোধী উভয় জোটই আপাতত আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই বিভক্ত অবস্থানের কারণে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে কঠিন দর-কষাকষি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে বাইরের দলের সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠনের চেষ্টা হতে পারে। সেটিও ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে ইসরাইল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা সংকটের মোকাবিলা করছে। দেশটির অভ্যন্তরে নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যর্থতা—এর মধ্যে ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার আগের ঘটনাগুলোর জন্য জবাবদিহিতার দাবি জোরালো হচ্ছে। পাশাপাশি, অতি-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে এবং নেতানিয়াহুর বিচার বিভাগীয় সংস্কারের বারবার প্রচেষ্টা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইসরাইলি-মার্কিন ভাষ্যকার ও ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইরাভ জোনজেইন আল জাজিরাকে বলেন, ইসরাইলের ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মতে, ইসরাইলি গণতন্ত্রকে রক্ষা করা এবং নেতানিয়াহুর শাসনামলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেগুলোকে পুনরুদ্ধার করার জন্য এই নির্বাচনই শেষ সুযোগ।
যুদ্ধক্লান্ত ইসরাইলি জনগণ বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক সংঘাতের বিষয়গুলো কীভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত তা নিয়ে এখন ভাবছে। অনেকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চাইছেন, পাশাপাশি গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং লেবাননের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার ধারণার প্রতি তারা অনীহা পোষণ করছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইলের এই নির্বাচন এমন এক সময়ে এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন দেশটিতে কট্টর-ডানপন্থি মনোভাব বাড়ছে এবং জাতীয় গতিপথ নিয়ে বিভাজন গভীর হচ্ছে।
ইসরাইলি সমাজবিজ্ঞানী ইহুদা শেনহাভ-শাহরাবানি আল জাজিরাকে বলেন, ‘বরাবরই ইসরাইলি সমাজের বিভিন্ন অংশে সহিংসতা ও ডানপন্থি বাগাড়ম্বরের প্রবণতা ছিল, তবে বর্তমান সরকারের আমলে সেই প্রবণতা আরও বহু বেড়েছে।’
এই নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে; তেল আবিবের অনেক মিত্র দেশ অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্তের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং আরও অনেক দেশ গাজা ও লেবাননে দেশটির অব্যাহত হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর ভাষণের শুরুতেই বিশ্বের বহু দেশের প্রতিনিধিরা কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান; তাদের অনেকে দুয়োধ্বনি দেন।
এবারের নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারে, ইসরাইলের পরবর্তী সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বর্তমান সম্পর্ক ও নীতি বজায় রাখবে, নাকি সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেবে।
ইসরাইলের দীর্ঘতম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গত ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এবং সব মিলিয়ে মোট ১৯ বছর ধরে দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে তিনি এখন নিজ দেশে ও বিদেশে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে মূল কারণ হলো ৭ অক্টোবরের হামলার আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত কথিত ব্যর্থতা, পাশাপাশি ২০১৯ সাল থেকে তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির অভিযোগ।
নির্বাচনে পরাজিত হলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে থাকা চলমান দুর্নীতি মামলার কাজ তরান্বিত হবে। শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।
নতুন সরকার ২০২৩ সালের অক্টোবরের হামলার ঘটনা তদন্তের জন্য সম্ভাব্য কমিশন গঠনের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে; একই সঙ্গে এটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে প্রায় ৭৩ লাখ ইসরাইলি নাগরিক ভোট দিতে পারবেন। এর মধ্যে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসরত প্রায় ৩০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনির এমন কোনো সরকারের ওপর কোনো ভূমিকা নেই।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটদানের হার ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তাদের অধিকাংশ ভোট ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলোর পক্ষে পড়তে পারে।
ভোটদানের হার ৬৫ শতাংশে পৌঁছালে এসব দল নেসেটে সর্বোচ্চ ১৫টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, প্রচারণায় যুক্ত ব্যক্তিরা ভোটদানের হার ৭০ শতাংশে নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এমনটি হলে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি দেখা যেতে পারে। এতে নির্বাচনী বাধা অতিক্রম করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং ছোট দলগুলোর পার্লামেন্টে প্রবেশের সুযোগ কমে আসবে।
গত মাসে, ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রাম’কে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার পক্ষে ভোট দিয়েছিল। তবে ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট দ্রুতই ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। ফলে আরব দলগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পায়। তবে ৭ অক্টোবরের হামলাকে ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করে লেখা একটি নিবন্ধের কারণে বালাদ পার্টির নেতা সামি আবু শেহাদেহকে নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে আদালত।
এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মূল দুটি জোট আপাতত তাদের সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে, কিন্তু তাদের ছাড়া কোনো জোটেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে।
নেতানিয়াহু একাধিকবার বিরোধী দলগুলোকে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য সহযোগী বলে কটাক্ষ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, বিরোধীদের নেতৃত্বে গঠিত সরকার আরব দলগুলোর সমর্থন চাইবে এবং একমাত্র তার লিকুদ পার্টিই এটি প্রতিরোধ করতে পারে।
ইসরাইলি নেসেট সদস্য আইমান ওদেহ-এর সাবেক সহযোগী জোসেফ মানসুর বলেন, আরব দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। এর ফলে কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন।
আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির জন্য লেখা এক নিবন্ধে মনসুর বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন যদি রাজনৈতিকভাবে বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং বিরোধীরা ৬১টি আসন পেতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাজনৈতিক অচলাবস্থাই হবে নেতানিয়াহুর সর্বশেষ জয়।’
সূত্র: আল জাজিরা