
ইসরাইলের এবারের নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ
আবদুল আজিজ জুয়েল
প্রকাশ: রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:১৭

বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্সের রাজপথ। ছবি: সংগৃহীত
বিক্ষোভ, টিয়ার গ্যাসের তীব্র ধোঁয়া, জলকামান আর লাখ লাখ মানুষের স্লোগানে উত্তাল পুরো ফ্রান্স। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সংকট ও শিক্ষক ঘাটতি নিয়ে সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলন অক্টোবরে এসে এক অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। দৈনন্দিন কাজ, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ এবং জরুরি সেবা ফেলে রাজপথে নেমে এসেছেন লাখ লাখ ক্ষুব্ধ নাগরিক। স্কুলের ক্লাসরুম থেকে যে ক্ষোভের সূত্রপাত, তা শেষ পর্যন্ত দেশটিকে কোথায় নিয়ে যায়, সেটিও এখন এক বড় প্রশ্ন।
আবাসন সংকট, আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘদিনের সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখন প্যারিস ছাড়িয়ে মার্সেই, লিওঁ, বর্দো ও নিসের মতো বড় বড় শহরগুলোতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ সামাল দিতে সারা দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক সদস্য মোতায়েন করা হলেও সহিংসতা থামানো সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন।
এই আন্দোলনের গোড়াপত্তন হয়েছিল রাজধানী প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় শ্রমজীবী অধ্যুষিত শহরতলিতে। গত ১০ সেপ্টেম্বর প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতা এবং মৌলিক পরিকাঠামোর অভাবের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করে। ওই দিনই ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পরিসংখ্যানে প্রকাশ পায় যে, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে আগের শিক্ষাবর্ষে প্রায় ১৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন (১ কোটি ৫৪ লাখ) ঘণ্টার ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয়নি। এটি ফরাসি অভিভাবকদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভের জন্ম দেয়।
সিবিসি নিউজের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্রান্সে গত প্রায় এক দশক ধরে সরকারি শিক্ষা খাত চরম বাজেট ঘাটতি ও শিক্ষক সংকটে ভুগছে। প্যারিসের পঁতাঁ অঞ্চলের এক শিক্ষার্থী রূডি কুভিলিয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, গ্রীষ্মের দিনে ক্লাসরুমের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, আর এক একটি কক্ষে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসতে হয়, যা পড়াশোনার পরিবেশকে অসম্ভব করে তোলে।
শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ১৮ সেপ্টেম্বর রাজপথে নামে প্রধান প্রধান শিক্ষক ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। প্যারিস, বোর্দো এবং নঁত শহরে হাজার হাজার মানুষ ব্যানার নিয়ে শোভাযাত্রা করেন। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, ফরাসি সরকার জনকল্যাণমুখী খাতগুলো থেকে রাষ্ট্রীয় সমর্থন তুলে নিয়ে বহুজাতিক করপোরেশনগুলোকে সুবিধা দিচ্ছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের এই প্রতিবাদ থেকে প্রথমবারের মতো উঠে আসে একটি সমন্বিত আন্দোলন গড়ার ডাক। অক্টোবরের ২ তারিখে ফ্রান্সজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্লাসরুমে তালা ঝুলিয়ে রাজপথে নেমে আসে।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজপথে নেমে আসে দেশের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন এবং কর্মচারী ইউনিয়নগুলো। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন সরকার শান্তিপ্রিয় বিক্ষোভকারীদের দমনে কঠোর পুলিশি অ্যাকশনের পথ বেছে নেয়। সাম্প্রতিক এক বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস প্রয়োগের পর সাধারণ নাগরিক ও অভিভাবকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।
যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষা খাতের কিছু দাবি নিয়ে, রাতারাতি তা রূপান্তরিত হয় নাগরিক স্বাধীনতা, সম্মানজনক জীবনযাত্রা এবং সামগ্রিক সরকারি নীতির বিরুদ্ধে এক মহাসংগ্রামে। প্যারিস পার হয়ে এই অসন্তোষের ঢেউ আছড়ে পড়ে লিল, মন্তপেলিয়ে, নঁত, তুলুস, স্ট্রাতসবার্গ এবং বোর্দোর মতো ছোট-বড় প্রতিটি শহরে।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকার শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভকে শুরুতেই সঠিক গুরুত্ব না দিয়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের সমস্যা হিসেবে দেখার নীতি গ্রহণ করে এবং আন্দোনলন দমনের চেষ্টা চালায়, যা পরবর্তীতে আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়তে ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মতে, এই আন্দোলন আর কেবল শিক্ষা খাতের সংস্কারে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন ম্যাক্রোঁ সরকারের এক দশকের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সার্বিক ক্ষোভ প্রকাশে পরিণত হয়েছে। আন্দোলনকারীরা মূলত জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং শ্রমিকের অধিকার ও পেনশনের সুরক্ষার দাবি তুলে ধরেছেন। এছাড়া খাদ্যসামগ্রী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির নিরসন এবং সরকারি গণবিরোধী অর্থনৈতিক নীতিমালার পরিবর্তনের দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয় ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন 'জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার'-সহ বেশ কয়েকটি বড় বড় ট্রেড ইউনিয়ন, বামপন্থি রাজনৈতিক দল। রাজপথে কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মী কিংবা পেশাজীবীদের দেখা যাচ্ছে না, বরং সমাজ এবং অর্থনীতির প্রতিটি স্তরের মানুষ এই প্রতিবাদে হাত মিলিয়েছেন।
দ্য গার্ডিয়ান-এর বিশেষ প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের মুখে শোনা গেছে তাদের ভেতরের জমতে থাকা কষ্টের কথা। প্যারিসের মিছিলে অংশ নেওয়া ৪৩ বছর বয়সি ফরাসি নারী নাদেজ ফরাসি সমাজের বর্তমান সাধারণ মানসকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, 'গত সপ্তাহেও আমি এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নিয়েছিলাম, যেখানে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক টিয়ার ছোড়ে। চোখ জ্বালাপোড়া করছিল, শ্বাস নেওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু আমি দমে যাইনি। আজ আবার রাজপথে নেমেছি কেবল সেই সাহসী মানুষদের সমর্থনে, যারা নিজেদের মৌলিক অধিকার আদায়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন। ফ্রান্সে রাজপথে নেমে নিজের মত প্রকাশ করা আমাদের আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার। যদি আজ আমরা ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকি, তবে কাল আমাদের বাকস্বাধীনতা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।'
একইভাবে ৬০ বছর বয়সি সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা পিয়েরে রাজপথে নেমে এসেছেন তার আট বছরের নাতনির হাত ধরে নয়, বরং তার ভবিষ্যতের চিন্তায় আকুল হয়ে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে ফরাসি সাংবাদিকদের বলেন, 'আমি আমার জীবনের দীর্ঘ সময় পার করেছি। কিন্তু আমি চাই না আমার নাতনি একটা চরম অনিশ্চিত, অসংবেদনশীল এবং অন্ধকার সমাজের মধ্যে বড় হোক। বর্তমান সরকার সাধারণ মানুষের কোনো যুক্তিযুক্ত কথা শুনতে রাজি নয়। তারা ওপর থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। এই একনায়কতন্ত্রের মতো আচরণের জবাব দিতেই আমরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছি।'
মিছিলে হাজার হাজার নার্স, ডাক্তার, পরিবহন শ্রমিক, সরকারি চাকরিজীবী, স্কুল শিক্ষার্থী এবং পেনশনভোগী প্রবীণদের উপস্থিতি দেখা গেছে। আর এতেই বোঝা যায়, সংকটটি আর কোনো একক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বিক্ষোভ দমনে ফরাসি পুলিশের ভূমিকা এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম সমালোচনার মুখে পড়েছে। আন্দোলন দমন করতে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সারা দেশে রেকর্ড সংখ্যক পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি-র তথ্যমতে, বিক্ষোভের প্রধান দিনগুলোতে শুধু রাজধানী প্যারিসেই ১৫ হাজারের বেশি এবং সারা দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার সশস্ত্র নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়। ২৪ অক্টোবরের রাত নেমে আসার সাথে সাথে প্যারিস, লিওঁ, মার্সেই, নিস ও বোর্দোর রাজপথগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্যারিসের বিভিন্ন স্থানে তরুণদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয় এবং পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
লিওঁ শহরে প্রশাসন আগে থেকেই সমাবেশ নিষিদ্ধ করলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সহস্রাধিক বিক্ষোভকারী রাস্তা অবরোধ করায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। মার্সেই, নিস, ক্লেরমঁ-ফেরাঁ ও স্ট্রাতসবার্গেও প্রায় একই ধরনের সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
প্যারিসের প্লেস দে লা বাস্তিল এবং প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় পুলিশ ভারী ব্যারিকেড গড়ে তোলে যাতে সাধারণ মানুষ একত্রিত হতে না পারে। কিন্তু মানুষের ঢল যখন ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করে, তখনই শুরু হয় সংঘর্ষ। পুলিশ অনবরত সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান এবং ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
বিপরীত দিকে, ক্ষুব্ধ জনতার একাংশ পুলিশের দিকে পানির বোতল, ইটপাটকেল এবং আতশবাজি ছুঁড়ে মারছে। প্যারিসের অনেক বাণিজ্যিক এলাকায় রাস্তার পাশে থাকা ময়লা ফেলার পাত্র ও পরিত্যক্ত গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রাজপথ।
রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশজুড়ে এক হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে শত শত তরুণ ও শিক্ষার্থী রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে, পুলিশ অনেক ক্ষেত্রে 'অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ' করছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল' এক বিবৃতিতে ফরাসি সরকারকে সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, ক্ষোভ প্রকাশের অধিকারকে পুলিশি লাঠি দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা পরিস্থিতিকে কেবল আরও সহিংস করে তুলবে।
এই নজিরবিহীন জনরোষ সরাসরি আঘাত হেনেছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মেয়াদের শেষ দিকের রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর। ২০১৮-১৯ সালের ঐতিহাসিক 'ইয়েলো ভেস্ট' আন্দোলনের পর ম্যাক্রোঁ সরকার আর কখনোই এতটা ব্যাকফুটে পড়েনি।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট নিজে। মিছিলে মিছিলে ব্যানার দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা- 'ম্যাক্রোঁ, ক্ষমতা ছাড়', 'আমাদের রক্ত চুষে নেওয়া বন্ধ কর', কিংবা 'জনগণের সরকার চাই, শাসকের নয়'।
বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার। বামপন্থি প্রধান রাজনৈতিক দল ‘লা ফ্রান্স ইনসুমিজ’-এর নেতা জঁ-লুক মেলঁশঁ শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্যারিস মিছিলে সশরীরে অংশ নিয়ে সরকারের পতন দাবি করেছেন। অন্যদিকে, ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেন এই জনরোষকে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের হাতিয়ার করার চেষ্টা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ম্যাক্রোঁ তার দ্বিতীয় মেয়াদে যেভাবে একের পর এক সিদ্ধান্ত সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই বিশেষ ক্ষমতাবলে পাস করানোর চেষ্টা করেছেন, সাধারণ মানুষ সেটিকে নিজেদের ওপর স্বৈরাচারী আচরণ হিসেবে ধরে নিয়েছে। ফলে নীতিগত বিরোধ এখন ব্যক্তিগত ক্ষোভে রূপ নিয়েছে।
একদিকে বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো বিক্ষোভকারীদের সব দাবি সমর্থন করে পার্লামেন্টে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে উগ্র ডানপন্থি নেত্রী মারিন ল্য পেনের দল এই অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ফলে সরকার এখন ভেতরে-বাইরে উভয় দিক থেকেই এক ভীষণ রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি।
প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময় সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের 'শান্তি বজায় রাখার' এবং 'সহিংসতা পরিহার করার' আহ্বান জানালেও, আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে কেবল আশ্বাসে তারা ঘরে ফিরবেন না; দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে।
দিনের পর দিন চলা এই ধর্মঘট ও রাজপথের বিক্ষোভে ফ্রান্সের জাতীয় অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খেয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা, রেলওয়ে, এবং বিমান পরিষেবাগুলোর কর্মীরা আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করায় পুরো ফরাসি পরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।
রেল ও বিমান পরিষেবা সংকুচিত: ফ্রান্সের জাতীয় রেল সংস্থা জানিয়েছে, তাদের স্বাভাবিক বুলেট ট্রেন এবং আঞ্চলিক ট্রেন চলাচল অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্যারিসের শার্ল দ্য গোল এবং অরলি বিমানবন্দর থেকে শত শত ফ্লাইট বাতিল বা বিলম্বিত করা হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পুরো ইউরোপের আকাশপথে।
জ্বালানি ডিপো অবরোধ: একাধিক বড় বড় শোধনাগার এবং জ্বালানি ডিপোর সামনে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নেওয়ায় ফরাসি পেট্রোল পাম্পগুলোতে তীব্র তেল সংকট দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে দুষ্প্রাপ্য জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।
বাণিজ্যিক ও পর্যটন খাতে ক্ষতি: প্যারিস, যা বিশ্বের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র, সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য ও হোটেল শিল্পে বড় ধস নেমেছে। বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম, আইফেল টাওয়ার সহ প্রধান প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলো নিরাপত্তার স্বার্থে বেশ কয়েকবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট স্থগিত: ফ্রান্সে আয়োজিত হতে যাওয়া বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বাণিজ্যিক মেলা এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিরাপত্তা ইস্যুতে পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে আয়োজক সংস্থাগুলো।
ফ্রান্সের এই গণআন্দোলনের ঢেউ কেবল ফরাসি সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে এর প্রভাব দেখা গেছে। ইতালিতে ফ্রান্সে আন্দোলনের সমর্থনে এবং ইতালির নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে মিলান ও রোমে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।
রোমে বিক্ষোভকারীরা ঐতিহ্যবাহী কলসিয়ামে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি সামলাতে ইতালীয় পুলিশ প্রায় ৩৭১ জনকে সাময়িক আটক এবং বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে, যাদের মধ্যে অনেক নাবালকও ছিল।
আলবেনিয়া, স্পেইন ও বেলজিয়ামেও এর আঁচ পাওয়া গেছে। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দাঙ্গা পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরাতে জলকামান ব্যবহার করে। এছাড়াও স্পেনের মাদ্রিদ এবং বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে সংহতি সমাবেশ ও মূল্যস্ফীতিবিরোধী মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ফ্রান্সের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, রাজপথের গণবিক্ষোভ এই দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে ১৯৬৮ সালের বিখ্যাত মে বিপ্লব, সবক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের রাস্তায় নামাই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ফরাসি সামাজিক কাঠামোর জন্য এক নতুন ও অভূতপূর্ব পরীক্ষা হাজির করেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্রান্স এখন এক ঐতিহাসিক সামাজিক ও প্রশাসনিক মোড় বা দোরাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের সামনে এখন কেবল দুটি বিকল্প পথ খোলা রয়েছে। প্রথমটি হলো, অবিলম্বে সংঘাতের পথ ছেড়ে সংলাপের টেবিলে ফিরে আসা। ম্যাক্রোঁ সরকার যদি জনদাবীকে সম্মান জানিয়ে শিক্ষা খাতের প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁট পুনর্বিবেচনা করে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ‘সবুজ কর’ ও সার্বিক করনীতিতে কিছুটা শিথিলতা আনে এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর বলপ্রয়োগ বন্ধ করে, তবেই কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে। ইউরোপীয় নীতি-বিশ্লেষকদের মতে, ফরাসি সমাজকে শান্ত করতে হলে সরকারকে অবশ্যই কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার যে ঐতিহাসিক সামাজিক চুক্তি রয়েছে, তা পুনর্বহাল করতে হবে।
ফরাসি পত্রিকা লে মন্দে-র বরাতে আল জাজিরা জানায়, ক্রমাগত দমনপীড়ন সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দেবে, যা দেশে দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক অচলবস্থা তৈরি করতে পারে। এর ফলে ফ্রান্সে মূলধারার মধ্যপন্থি রাজনীতির প্রতি চরম অসন্তোষ তৈরি হবে এবং আগামী দিনগুলোতে কট্টর ডানপন্থি ও বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে।
বার্তা সংস্থা এএফপি-র এক বিশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ফ্রান্সের এই সংকট কেবল তাদের নিজস্ব সীমান্তের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ফ্রান্স যদি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অস্থিরতায় পড়ে, তবে পুরো ইউরোপীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় মারাত্মক ধাক্কা লাগবে।