
সৌদির প্রতি মিশরের সামরিক সমর্থন ‘যুদ্ধ ঘোষণার শামিল’: হুতি

ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে রাশিয়া যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। জাতিসংঘের ইউক্রেন বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন (ইনডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব ইনকোয়ারি অন ইউক্রেন) এমন অভিযোগ করেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশ থেকে প্রতারণা ও জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে মানুষকে রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগেরও প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিশন।
ইনডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব ইনকোয়ারি অন ইউক্রেনের প্রতিবেদনটি চলতি মাসে ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার নানা অমানবিক কর্মকাণ্ডের তথ্যউপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহব্যবস্থাসহ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে বেসামরিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেসামরিক জনগণকে বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সেবা থেকে বঞ্চিত করে দুর্ভোগে ফেলার ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত ‘অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন।
২০২৫-২৬ সালের তীব্র শীতের সময় এসব হামলার প্রভাব এবং ২০২২ সালের শরৎকাল থেকে ধারাবাহিক হামলার সামগ্রিক পরিণতি খতিয়ে দেখে কমিশন। তাদের তথ্যমতে, শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে চালানো হামলার সংখ্যা, তীব্রতা ও ভৌগোলিক বিস্তার বছরের পর বছর বেড়েছে। এতে ইউক্রেনের জ্বালানি খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
গত শীতে ইউক্রেনের তাপমাত্রা মাইনাস ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গেলে লাখ লাখ মানুষকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ, গরম রাখার ব্যবস্থা, পানি ও গ্যাস ছাড়া থাকতে হয়েছে। ফলে তাদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। কমিশনের চেয়ারম্যান এরিক মোসে বলেন, শীত মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে হামলা আবারও তীব্র হয়েছে। এতে বেসামরিক মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় তীব্র ঠান্ডায় থাকা, মৌলিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার কারণে ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
কিয়েভের ৫৩ বছর বয়সি এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, রাতে ঘুমিয়ে পড়লে ঠান্ডায় আর জেগে উঠতে পারবেন না, এমন আশঙ্কায় তিনি রাতভর জেগে থাকার চেষ্টা করতেন। তার ভাষায়, ‘সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল ঘুমিয়ে পড়া এবং আর জেগে না ওঠা। ঠান্ডায় মারা যাওয়ার ভয়ে থাকা ছিল নির্যাতনের মতো।’
বয়স্ক ও চলাচলে অক্ষম ব্যক্তিরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফটে আটকে পড়ার আশঙ্কায় অনেকে বিমান হামলার সতর্কতা জারির পরও নিরাপদ স্থানে যেতে পারেননি। বিদ্যুৎ ও পানি ছাড়া, উত্তাপহীন ঘরে তাদের থাকতে হয়েছে। কেউ কেউ জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সেবা থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন।
কিয়েভের ৭৪ বছর বয়সি এক নারী বলেন, ‘আমি ঠান্ডায় ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় পড়ে ছিলাম। ওষুধ ছিল না, কিছুই ছিল না।’
শিশুদের নিয়ে থাকা পরিবারগুলোর পরিস্থিতিও ছিল কঠিন। জ্বালানি সংকটের সময় দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। বাড়িতে গরম রাখার ব্যবস্থা না থাকায় শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে, যা পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।
তদন্ত কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, যেসব রুশ কমান্ডার এসব হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা জানতেন যে বড় শহর ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় লক্ষ্যবস্তু করা তাপ সরবরাহব্যবস্থা বেসামরিক মানুষের জন্য অত্যাবশ্যকীয়, বিশেষ করে শীতকালে।
কমিশন আরও বলেছে, রুশ কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা চালানোর বিষয়ে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছে এবং হামলা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কমিশনের সিদ্ধান্ত, রুশ কর্তৃপক্ষ বেসামরিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলার যুদ্ধাপরাধ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সংগৃহীত প্রমাণ থেকে দেখা যায়, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলাগুলো পরিকল্পিতভাবে এবং রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে চালানো হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল বেসামরিক জনগণকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিনির্ভর অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সেবা থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা।
কমিশন এ ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তদন্তে ইউক্রেনের দিনিপ্রো, কিয়েভ, খারকিভ, খেরসন, মাইকোলাইভ, ওডেসা, পোলতাভা, জাপোরিঝঝিয়া ও জিতোমির অঞ্চলে শীতকালীন দুর্ভোগের শিকার ২৫৫ জনের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইউক্রেনের সরকারি কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক ও বেসরকারি সংস্থার তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক রাশিয়া ও ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তাদের অনেকে স্বেচ্ছায় যোগ দিলেও অন্যদের প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছে।
কমিশন জানিয়েছে, তাদের তদন্তে স্বেচ্ছায় ও জেনেশুনে দুই দেশের যেকোনো বাহিনীতে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নিয়োগের ঘটনাগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে কমিশন। এর মধ্যে ২৯টি দেশের নাগরিকদের প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ বাহিনীতে নিয়োগের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ছাড়াও দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে আজারবাইজান, বেলারুশ, বলিভিয়া, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, ঘানা, হন্ডুরাস, জর্ডান, কেনিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সোমালিয়া, শ্রীলঙ্কা, তাজিকিস্তান, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জিম্বাবুয়ে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীরা সবাই ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি পুরুষ। তাদের অধিকাংশই দরিদ্র, কম শিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সদস্য।
প্রতিবেদনে বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ বাহিনীতে নিয়োগের দুটি ধরন চিহ্নিত করেছে কমিশন।
প্রথম ক্ষেত্রে, বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, বিভিন্ন কারণে আগে থেকেই রাশিয়ায় অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকদের রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে।
কমিশন জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ ও ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে নিয়োগের সুস্পষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীতে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির কোনো ঘটনা তদন্তে পায়নি কমিশন। তবে প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কতজন নাগরিককে এভাবে নিয়োগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে সক্রিয় ব্যক্তি ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এ নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে। কমিশনের তথ্যমতে, নিয়োগকারীরা নিজেদের বৈধ ও সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিতেন। তারা নিয়োগপ্রত্যাশীদের ভিসা ও ভ্রমণের নথিপত্র তৈরি করে দিতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে রাশিয়ায়ও যেতেন।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই এসব ব্যক্তিকে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রুশ ভাষায় চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করা হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে নিয়োগ পাওয়া এক ব্যক্তির ৩৫ বছর বয়সি স্ত্রী কমিশনকে জানান, তার স্বামীর পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয় এবং চুক্তির বিভিন্ন স্থানে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। পুরো চুক্তিটি রুশ ভাষায় লেখা থাকায় তার স্বামী বিষয়টি বুঝতে পারেননি এবং প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েন।
তার ভাষায়, ‘তারা তার পাসপোর্ট নিয়ে নেয় এবং চুক্তির এখানে-ওখানে স্বাক্ষর করতে বলে। পুরো চুক্তিটি ছিল রুশ ভাষায়। তার ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল, কোনো বিকল্পও ছিল না।’
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বিদেশি নাগরিককে ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধে মোতায়েন করা হয়েছে এবং বিপজ্জনক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকে নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। অন্যরা আত্মসমর্পণ করেছেন কিংবা ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে আটক হয়ে যুদ্ধবন্দির মর্যাদা পেয়েছেন।
তদন্ত কমিশনের মতে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নিয়োগকারী ও রুশ কর্তৃপক্ষের মধ্যে উচ্চমাত্রার সমন্বয় ছিল। এ নিয়োগ কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন।
প্রতিবেদনে ইউক্রেনের রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল এবং রাশিয়ার ভূখণ্ডে জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনীয় বাহিনীর হামলার বিষয়টিও পর্যালোচনা করেছে কমিশন। তবে রাশিয়া তদন্তকারীদের প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় এবং তথ্য চেয়ে পাঠানো অনুরোধের জবাব না দেওয়ায় এসব হামলার প্রভাব নিয়ে আরও তদন্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে কমিশন।
কমিশন পুনর্ব্যক্ত করেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ। এ ধরনের হামলা বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা সব ব্যক্তিকে সেখান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন।